হত্যা মামলায় এজাহার বর্ণনায় অস্পষ্টতা ও কালক্ষেপণের যৌক্তিক ব্যাখ্যা না থাকলে অনুমাননির্ভর সাক্ষ্যে সাজা বাতিল: হাইকোর্টের রায়
⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় কোনো অভিযুক্তকে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় খুনের দায়ে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য-প্রমাণ অবশ্যই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হতে হবে (Proof beyond all reasonable doubt)। এজাহার (FIR) দায়ের করার ক্ষেত্রে যদি দীর্ঘ ৪৮ ঘণ্টার অস্বাভাবিক কালক্ষেপণ ঘটে এবং এই বিলম্বের কোনো যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা লিপিবদ্ধ না থাকে, তবে তা এজাহারে চক্রান্তমূলক পরামর্শ ও নিরপরাধ ব্যক্তিকে জড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ তৈরি করে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যে যদি আঘাতের ধরন ও সময়ের ক্ষেত্রে চরম বৈপরীত্য থাকে এবং স্বাধীন নিরপেক্ষ সাক্ষীরা রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য সমর্থন না করে, তবে একক অনুমান ও ধারণার ওপর ভিত্তি করে দেওয়া সাজা টেকে না। আসামিকে সন্দেহের সুবিধা (Benefit of Doubt) দিয়ে খালাস প্রদান ন্যায়বিচারের অপরিহার্য দাবি।
সিরাজগঞ্জ জেলার কামারখন্দ উপজেলায় একটি স্থানীয় নির্বাচনী বিরোধ ও মেঠোপথের সীমানা নিয়ে বিরোধের জেরে নিহত ব্যক্তির ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলার অভিযোগ আনা হয়। ঘটনার পরপরই আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কিন্তু ঘটনার দুই দিন পর থানায় এজাহার দায়ের করা হয়। এজাহারে নিহতের চাচাতো ভাই মোট ৯ জন ব্যক্তিকে আসামি করেন, যার মধ্যে আপিলকারী মোঃ কামাল হোসেনকে ১ নম্বর প্রধান আসামি করা হয়।
অতিরিক্ত দায়রা জজ ১ম আদালত সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে কামাল হোসেনকে ৩০২ ধারায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করেন। উক্ত সাজার বিরুদ্ধে দণ্ডিত আসামি হাইকোর্ট বিভাগে ফৌজদারি আপিল দায়ের করেন।
👤 দণ্ডিত আপিলকারীর যুক্তি
- হাসপাতাল ও থানা মাত্র ২ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে হলেও এজাহার দায়ের করতে দুই দিন সময় নেওয়া হয়েছে।
- মেডিকেল রিপোর্টের পোস্টমর্টেমে উল্লিখিত জখমের সাথে এজাহার ও সাক্ষীর বর্ণিত অস্ত্রের মিল নেই।
- ঘটনাস্থলের আশপাশের কোনো নিরপেক্ষ দোকানদার বা প্রতিবেশীকে সাক্ষী করা হয়নি।
👥 রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি
- বাদীপক্ষ শোকাহত থাকায় এজাহার দিতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।
- প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীগণ আদালতে দৃঢ়তার সাথে মূল আসামির আঘাত হানার কথা জানিয়েছেন।
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সুপ্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত 51 DLR (AD) 211 এবং 42 DLR (AD) 200 উল্লেখ করে রায় প্রদান করেন:
আদালত আপিল মঞ্জুর করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ বাতিল করেন এবং আসামিকে বেকসুর খালাস প্রদান করেন।

