লেটার অব ক্রেডিট (L/C)-এর অর্থ পরিশোধে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাখ্যান: ব্যাংক ব্যবস্থার স্বাতন্ত্র্য ও সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়
📌 সংক্ষিপ্ত আইনি সারসংক্ষেপ (Legal Summary)
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক রায়ে ঘোষণা করেছেন যে, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য পরিচালনায় প্রত্যয়ী পত্র বা লেটার অব ক্রেডিট (Letter of Credit – L/C) ইস্যুকারী ব্যাংক ও নিগোশিয়েটিং ব্যাংকের মধ্যকার সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র চুক্তি (Autonomous & Independent Contract)। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রতিষ্ঠিত নজির (৫৫ ডিএলআর ২০০৩ পৃ. ৫৭) অনুযায়ী মূল বিক্রয় চুক্তি (Sales Contract) বা বায়িং হাউজের সাথে ক্রেতার অন্তর্নিহিত বিরোধ থেকে এলসি-র বাধ্যবাধকতা সম্পূর্ণ পৃথক। কোনো বায়ার বা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান যদি অভিযোগ তোলে যে বায়িং হাউজ প্রতারণামূলক বিক্রয় চুক্তি দাখিল করেছিল, তবুও যেক্ষেত্রে কাঁচামাল সরবরাহকারীগণ (Suppliers) এলসি-র শর্তানুযায়ী সঠিক সময়ে ফেব্রিক্স ও এক্সেসরিজ সরবরাহ করেছেন এবং ব্যাংক শাখায় বৈধ ও খাঁটি বিল বা নথি দাখিল করেছেন, সেক্ষেত্রে এলসি-র অর্থ পরিশোধে কোনো দেওয়ানী আদালত কর্তৃক অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা (Temporary Injunction) জারি করা আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আদালত দ্ব্যর্থহীনভাবে জানিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং সুনাম ও বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন সুরক্ষিত রাখতে এলসি পরিশোধে বাধা দেওয়া যাবে না। হাইকোর্ট ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালতের নিষেধাজ্ঞা খারিজের আদেশ বহাল রেখে এসকিউ ব্রিচিনা লিমিটেডের প্রথম বিবিধ আপিল সরাসরি খারিজ করেছেন।
১. বাণিজ্যিক বিরোধের পটভূমি ও এলসি খোলার প্রেক্ষাপট (Background & Facts)
আলোচ্য বাণিজ্যিক বিরোধটির সূচনা ঢাকা জেলার ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ২০২৬ সালে দায়েরকৃত ২২ নম্বর স্বত্ব মোকদ্দমা (Title Suit No. 22 of 2026) থেকে। মোকদ্দমাটি দায়ের করেছিল দেশের খ্যাতিমান তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এসকিউ ব্রিচিনা লিমিটেড (SQ Birichina Limited – বাদী-আপিলকারী) মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি (গুলশান শাখা), একটি বায়িং হাউজ এবং দেশী-বিদেশী কাঁচামাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের বিরুদ্ধে সাতটি লেটার অব ক্রেডিটের (L/C) অধীনে অর্থ পরিশোধ চিরতরে বন্ধ ঘোষণা ও নিষেধাজ্ঞার প্রার্থনায়।
বাদিনী প্রতিষ্ঠানের আরজির ভাষ্য মতে, ২ নং বিবাদী একটি স্থানীয় বায়িং হাউজ বিগত ২০ জুলাই ২০২৫ তারিখে ৯ নং বিবাদী বিদেশী বায়ারের নামযুক্ত একটি বড় মাপের সেলস কন্ট্রাক্ট (বিক্রয় চুক্তি) বাদিনীর নিকট উপস্থাপন করে। উক্ত সেলস কন্ট্রাক্টের ভিত্তিতে পুরুষদের হুডি (Men’s Hoody) প্রস্তুত ও রপ্তানির উদ্দেশ্যে বাদিনী সরল বিশ্বাসে চুক্তি স্বাক্ষর করে। পরবর্তীতে বায়িং হাউজের নির্দেশনায় এবং ৩ হতে ৭ নম্বর বিবাদী সরবরাহকারীগণের প্রোফরমা ইনভয়েসের (Proforma Invoice) ভিত্তিতে বাদিনী মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি, গুলশান শাখা হতে মোট ৭টি লেটার অব ক্রেডিট ইস্যু করায় (যার মধ্যে ১টি আন্তর্জাতিক এলসি এবং ৬টি ব্যাক-টু-ব্যাক দেশীয় এলসি)।
৩-৭ নম্বর বিবাদী সরবরাহকারীগণ এলসি-র শর্ত মোতাবেক ফেব্রিক্স ও গার্মেন্টস এক্সেসরিজ সরবরাহ করেন। বাদিনী প্রতিষ্ঠান সেই মালামাল গ্রহণ করে পোশাক তৈরি সম্পন্ন করে। কিন্তু শিপমেন্ট পূর্ববর্তী পরিদর্শনে ৮ নং বিবাদী ইন্সপেকশন এজেন্সি উদ্দেশ্যমূলকভাবে খারাপ রিপোর্ট প্রদান করে মালামাল বাতিল করে এবং বায়িং হাউজ আত্মগোপন করে। পরবর্তীতে বিদেশী বায়ারের ঢাকা লিয়াজোঁ অফিস হতে এক চিঠিতে বাদিনীকে জানানো হয় যে উক্ত বায়ার এমন কোনো সেলস কন্ট্রাক্ট সরাসরি ইস্যু করেনি! এর ফলে বাদিনী প্রতিষ্ঠান বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে দাবি করে যে বায়িং হাউজ ও কাঁচামাল সরবরাহকারীগণ যোগসাজশে প্রতারণা করেছে। ফলে মার্কেন্টাইল ব্যাংক যেন উক্ত সাতটি এলসি-র কোনো অর্থ নিগোশিয়েটিং ব্যাংকে ছাড় না করে, সেজন্য দেওয়ানী কার্যবিধির ৩৯ আদেশের ১ ও ২ বিধি এবং ১৫১ ধারামতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন দাখিল করা হয়।
২. পক্ষগণের বিপরীতমুখী দাবি ও প্রতিদ্বন্দ্বী বক্তব্য (Pleadings of the Parties)
বিচারিক আদালতে পোশাক প্রস্তুতকারক বাদিনী এবং ব্যাংক ও সরবরাহকারী বিবাদীগণের মধ্যে তীব্র আইনি দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়।
🏛️ পোশাক প্রস্তুতকারক-বাদীর বক্তব্য ও যুক্তি
- বিশাল প্রতারণার শিকার: বাদিনী প্রতিষ্ঠান বায়িং হাউজের সাজানো জাল সেলস কন্ট্রাক্ট ও ভুয়া ইন্সপেকশন রিপোর্টের শিকার হয়েছে।
- প্রতারণা চুক্তি নষ্ট করে (Fraud vitiates all): আইনি নজির অনুযায়ী জালিয়াতির মাধ্যমে উৎপন্ন কোনো লেনদেনের ভিত্তিতে এলসি-র টাকা দাবি করা যায় না।
- কাঁচামাল সরবরাহকারীদের যোগসাজশ: বায়িং হাউজের নির্দেশিত সরবরাহকারীদের অতিরিক্ত দামে এলসি খোলা হয়েছিল, যা তাদের যোগসাজশের প্রমাণ।
- বৈদেশিক মুদ্রা অপচয় রোধ: বিদেশী সরবরাহকারীর এলসি আটকে না দিলে দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অন্যায়ভাবে বিদেশে পাচার হয়ে যাবে।
- অপূরণীয় ক্ষতি: মালামাল রপ্তানি না হওয়ায় বাদিনী প্রতিষ্ঠান অর্থ তুলতে পারছে না, এমতাবস্থায় ব্যাংকের অর্থ ছাড় হলে প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হবে।
🛡️ ব্যাংক ও কাঁচামাল সরবরাহকারীদের জবাব
- এলসি-র পূর্ণ স্বাতন্ত্র্য (Autonomy of L/C): সুপ্রিম কোর্টের নজির (৫৫ ডিএলআর ৫৭) অনুযায়ী এলসি হলো ব্যাংকের স্বাধীন বাধ্যবাধকতা; মূল চুক্তির বিরোধ এখানে অচল।
- সঠিক মালামাল সরবরাহ: সরবরাহকারীগণ এলসি মোতাবেক শতভাগ সঠিক কাঁচামাল দিয়েছেন যা বাদিনী বিনা আপত্তিতে গ্রহণ করে পোশাক তৈরি করেছে।
- বিল ও দলিলে কোনো জালিয়াতি নেই: নিগোশিয়েটিং ব্যাংকে দাখিলকৃত বিল অব লেডিং বা ইনভয়েসে কোনো জালিয়াতি বা ত্রুটি বাদিনী দেখাতে পারেনি।
- আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সুনাম: এলসি-র অর্থ পরিশোধে নিষেধাজ্ঞা দিলে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং অঙ্গনে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস হবে।
- বাদীর নিজস্ব অসতর্কতা: বিদেশী বায়ারের এলসি নিশ্চিত না করে কেবল সেলস কন্ট্রাক্টের ওপর ভর করে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা বাদীর নিজস্ব ঝুঁকি ও অবহেলা।
৩. বিচারিক আদালতের কার্যক্রম ও আদেশ (Trial Court Proceedings)
ঢাকার ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত বিগত ১১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ২ নম্বর আদেশে বাদিপক্ষের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দরখাস্ত সরাসরি নামঞ্জুর করেন। বিচারিক আদালত পর্যবেক্ষণ করেন যে, ব্যাংকিং আইন ও ইউনিফর্ম কাস্টমস অ্যান্ড প্র্যাকটিস ফর ডকুমেন্টারি ক্রেডিট (UCP 600) অনুযায়ী লেটার অব ক্রেডিট একটি আন্তর্জাতিক স্বাধীন প্রতিশ্রুতি। কাঁচামাল সরবরাহকারীগণ কোনো জাল নথি দিয়ে টাকা দাবি করছেন মর্মে কোনো প্রমাণ নেই। তাছাড়া বাদিনী কাঁচামাল গ্রহণ করে নিজের কারখানায় ব্যবহার করেছেন। সুতরাং ব্যাংকের অর্থ ছাড়ে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কোনো আইনগত উপাদান নেই। উক্ত আদেশে সংক্ষুব্ধ হয়ে এসকিউ ব্রিচিনা লিমিটেড সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ১ম বিবিধ আপিল নং ৬০/২০২৬ দায়ের করে।
৪. মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে পর্যালোচিত আইনি প্রশ্নসমূহ (Core Legal Issues)
হাইকোর্ট বিভাগের ডিভিশন বেঞ্চের শুনানিতে নিম্নলিখিত অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বাণিজ্যিক ও ব্যাংকিং আইনি প্রশ্নসমূহ পর্যালোচিত হয়:
- লেটার অব ক্রেডিটের স্বাতন্ত্র্য তত্ত্ব (Doctrine of Autonomy of L/C): মূল বায়ার ও রপ্তানিকারকের অভ্যন্তরীণ সেলস কন্ট্রাক্টে প্রতারণা সংঘটিত হলে তার অজুহাতে কি কাঁচামাল সরবরাহকারীগণের অনুকূলে ইস্যুকৃত স্বাধীন এলসি-র পেমেন্ট আটকে দেওয়া আইনসংগত?
- এলসি-তে জালিয়াতির ব্যতিক্রমের পরিধি (Fraud Exception in L/C): কোন ধরনের জালিয়াতি ঘটলে আদালত এলসি পরিশোধে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে—মূল বিক্রয় চুক্তির প্রতারণা, নাকি ব্যাংকে উপস্থাপিত এলসি নথিপত্রের জালিয়াতি?
- কাঁচামাল গ্রহণ ও ব্যবহারের পর পেমেন্ট আটকানোর যৌক্তিকতা: যেক্ষেত্রে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান সরবরাহকৃত কাঁচামাল কোনো আপত্তি ছাড়া গ্রহণ করে পোশাক উৎপাদন সম্পন্ন করেছে, সেক্ষেত্রে এলসি-র বিপরীতে ব্যাংকের পেমেন্ট বন্ধ করার কোনো সাম্যভিত্তিক অধিকার থাকে কি না?
৫. আদালতে বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দের বক্তব্য ও আইনি তর্ক (Submissions & Citations)
আপিলকারী পক্ষে বিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জনাব মুহম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান খান, কাজী এরশাদুল আলম এবং জনাব শাহরিয়ার শহীদ সাদ শুনানি করেন। বিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী যুক্তি দেখান যে, বাদিনী এক বিশাল ষড়যন্ত্র ও প্রতারণার শিকার হয়েছে। বায়িং হাউজ বিদেশী বায়ারের ভুয়া সেলস কন্ট্রাক্ট তৈরি করে বাদিনীকে বাধ্য করেছে এলসি খুলতে এবং ইন্সপেকশন এজেন্সিকে দিয়ে মালামাল আটকে দিয়েছে। এই প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশী কোম্পানি ও স্থানীয় সরবরাহকারীরা অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। তিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নজির Hindustan Steel Works Construction Ltd. Vs. Tarapore and Co. (1996) 5 SCC 34 এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের Abdur Rashid Vs. Mobaswar Ahmed (8 BLC (AD) 11) উদ্ধৃত করে বলেন, মারাত্মক প্রতারণা (Established Fraud) প্রমাণিত হলে আদালত ব্যাংক গ্যারান্টি বা এলসি-তে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে।
বিপরীতে ৩ নং বিবাদী সরবরাহকারী পক্ষে বিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জনাব এ.কে.এম বদরুদ্দোজা, জনাব ইব্রাহিম হোসেন এবং মিস রাবেয়া আফরোজ এবং ব্যাংক পক্ষে জনাব চৌধুরী মকিমুদ্দিন খান জাহান আলী ও জনাব সঞ্জয় কুমার কুণ্ডু অত্যন্ত জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন। বিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক নজির Zyta Garments Ltd. Vs. Union Bank Ltd. and another (55 DLR (AD) 57) উপস্থাপন করে বলেন, আপিল বিভাগ চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করেছেন যে—“A Letter of Credit is an independent agreement between two Banks and neither the seller nor the buyer has any privity to that agreement.”
বিজ্ঞ কৌঁসুলি স্পষ্ট করেন যে, বাদিনীর অভিযোগ হলো বায়িং হাউজের সেলস কন্ট্রাক্ট নিয়ে। কিন্তু সরবরাহকারীগণ যে কাপড় ও সামগ্রী দিয়েছেন, তা নিয়ে বাদিনীর কোনো অভিযোগ নেই। ব্যাংকে দাখিলকৃত বিল অব লেডিং বা চালান শতভাগ আসল। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বায়ার বা তার এজেন্ট নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা মিল থেকে কাঁচামাল কেনার শর্ত দিতেই পারে। এতে কোনো অপরাধ নেই। বাদিনী কোনো এক্সপোর্ট এলসি হাতে না পেয়ে অগ্রিম কাঁচামালের এলসি খুলে চরম অপরিণামদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। এর দায় ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর চাপিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশের সম্মান নষ্ট করা যাবে না।
৬. সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যবেক্ষণ ও আইনগত অনুসিদ্ধান্ত (Judicial Analysis & Ratio)
মাননীয় বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান এবং মাননীয় বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদী সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং নজির ও দেশের আইন বিশদভাবে পর্যালোচনা করে সুদূরপ্রসারী নীতি ঘোষণা করেন:
(এক) এলসি-র স্বাতন্ত্র্য ও ব্যাংকের নিরপেক্ষ বাধ্যবাধকতা (Autonomy of Credit):
আপিল বিভাগ কর্তৃক ৫৫ ডিএলআর ৫৭-এ প্রদত্ত সিদ্ধান্ত বর্তমান মোকদ্দমায় অক্ষরে অক্ষরে প্রযোজ্য। লেটার অব ক্রেডিট কোনো সাধারণ চুক্তি নয়; এটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি অলঙ্ঘনীয় স্বাধীন অঙ্গীকার। এলসি ইস্যুকারী ব্যাংক এবং নিগোশিয়েটিং ব্যাংক কেবলমাত্র নথিপত্র (Documents) যাচাই করার দায়িত্বে নিয়োজিত, কোনো বাণিজ্যিক পণ্যের গুণমান বা ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যক্তিগত ঝগড়া দেখার দায়িত্বে নয়। মূল চুক্তিতে যাই ঘটুক না কেন, এলসি নথিপত্র যথাযথ থাকলে ব্যাংক অর্থ পরিশোধ করতে আইনত বাধ্য।
(দুই) জালিয়াতির অভিযোগের সংকীর্ণ ক্ষেত্র (Strict Scope of Fraud Exception):
আদালত উল্লেখ করেন যে, এলসি-র ক্ষেত্রে জালিয়াতির ব্যতিক্রম তখনই প্রযোজ্য হয় যখন ব্যাংকে উপস্থাপিত নথিপত্রই জাল (যেমন ভুয়া বিল অব লেডিং বা ভুয়া শিপমেন্ট) এবং তা ব্যাংক ও সুবিধাভোগীর সরাসরি জ্ঞাতসারে ঘটে। কিন্তু বর্তমান মামলায় কাঁচামাল সরবরাহকারীগণ কোনো জাল নথি ব্যাংকে দেননি। তারা প্রকৃত কাঁচামাল কারখানায় পাঠিয়েছেন এবং বাদিনী তা গ্রহণ করে হুডি তৈরি করেছে। বাদিনীর সেলস কন্ট্রাক্ট জাল হওয়ার দায় কোনোভাবেই নির্দোষ কাঁচামাল সরবরাহকারীদের ওপর চাপানো যায় না।
(তিন) বাদীর নিজস্ব অসাবধানতা ও বাণিজ্যের ঝুঁকি:
আপিলকারী প্রতিষ্ঠান বিদেশী ক্রেতার নিকট থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট ও সুরক্ষিত মাস্টার এলসি (Export L/C) গ্রহণ না করেই নিছক বায়িং হাউজের সেলস কন্ট্রাক্টের ওপর ভর করে কাঁচামালের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খুলেছে। এই বাণিজ্যিক অসাবধানতার ঝুঁকি ব্যবসায়ীকে নিজেই বহন করতে হবে। দেওয়ানী আদালতের মাধ্যমে এলসি পেমেন্ট বন্ধ করে দিলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হবে।
৭. হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত রায় ও সিদ্ধান্ত (Final Decision)
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সার্বিক পর্যালোচনায় ঢাকার ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতের আদেশে কোনো ভুল খুঁজে পাননি এবং নিম্নোক্ত চূড়ান্ত আদেশ ঘোষণা করেন:
- আপিল ও রুল খারিজ: ১ম বিবিধ আপিল নং ৬০/২০২৬ সরাসরি খারিজ (Dismissed) করা হলো এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট দেওয়ানী রুল নং ০৭ (এফএম)/২০২৬ খারিজ (Discharged) করা হলো।
- বিচারিক আদালতের আদেশ বহাল: ঢাকার ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত কর্তৃক স্বত্ব মোকদ্দমা নং ২২/২০২৬-এ বিগত ১১.০১.২০২৬ তারিখে প্রদত্ত ২ নম্বর আদেশ (নিষেধাজ্ঞা নামঞ্জুরের আদেশ) সম্পূর্ণ বহাল রাখা হলো।
- স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার: হাইকোর্ট কর্তৃক পূর্বে প্রদত্ত অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার আদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার ও সমাপ্ত ঘোষণা করা হলো।
- ব্যাংক পেমেন্টের পথ উন্মুক্ত: মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি বিধি মোতাবেক নিগোশিয়েটিং ব্যাংক ও সরবরাহকারীদের বৈধ দাবির বিপরীতে এলসি-র অর্থ পরিশোধ কার্যধারা পরিচালনা করতে পারবে।
- নথি অবিলম্বে প্রেরণের নির্দেশ: অধস্তন আদালতের নথিপত্র রায়ের অনুলিপিসহ অনতিবিলম্বে সংশ্লিষ্ট আদালতে ফেরত পাঠানোর আদেশ দেওয়া হলো।
৮. মামলার রেফারেন্স ও বিচারিক তথ্যাদি (Case Summary Table)
আইনি গবেষক ও বিজ্ঞ ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের সুবিধার্থে এই ঐতিহাসিক রায়ের সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও বিচারিক রেফারেন্স নিচে সন্নিবেশিত হলো:
| বিষয়বস্তু | মামলার বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| উচ্চ আদালত ও বেঞ্চ | বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (দেওয়ানী আপিল এখতিয়ার) মাননীয় বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান এবং মাননীয় বিচারপতি তামান্না রহমান খালিদী |
| মামলা নম্বর ও শ্রেণি | ১ম বিবিধ আপিল নং ৬০ / ২০২৬ (First Misc. Appeal No. 60 of 2026 with Civil Rule 07(FM)/2026) |
| পক্ষগণের নাম | এসকিউ ব্রিচিনা লিমিটেড (বাদী-আপিলকারী) বনাম মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি, গুলশান শাখা এবং অন্যান্য (বিবাদী-রেসপনডেন্ট) |
| বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দ | আপিলকারী পক্ষে: জনাব মুহম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান খান, জ্যেষ্ঠ অ্যাডভোকেট, জনাব কাজী এরশাদুল আলম এবং জনাব শাহরিয়ার শহীদ সাদ ব্যাংক পক্ষে (১ নং রেসপনডেন্ট): জনাব চৌধুরী মকিমুদ্দিন খান জাহান আলী এবং জনাব মো: মামুনুর রশিদ সরবরাহকারী পক্ষে (৩ নং রেসপনডেন্ট): জনাব এ.কে.এম বদরুদ্দোজা, জ্যেষ্ঠ অ্যাডভোকেট, জনাব ইব্রাহিম হোসেন, মিস রাবেয়া আফরোজ অন্যান্য সরবরাহকারী পক্ষে (৫-৬ নং): জনাব সঞ্জয় কুমার কুণ্ডু, জনাব দেলোয়ার হোসেন, জনাব চন্দন চন্দ্র সরকার |
| উৎস ও বিচারিক আদালত | ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত, ঢাকা (স্বত্ব মোকদ্দমা নং ২২/২০২৬, আদেশ নং ০২ তারিখ: ১১.০১.২০২৬) |
| শুনানি ও রায় ঘোষণার তারিখ | শুনানি: ২৪ ও ৩১ আগস্ট এবং ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ চূড়ান্ত রায়: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ |
| মূল আইনি আলোচ্য ধারা ও নজির | Uniform Customs and Practice for Documentary Credits (UCP 600), Autonomy of Letter of Credit, Code of Civil Procedure (Order XXXIX Rules 1-2, Section 151) নজির: 55 DLR (AD) 57 (Zyta Garments Ltd. Vs. Union Bank Ltd.) |
| অফিসিয়াল রায় ও পোর্টাল লিংক |
📥 অফিসিয়াল জাজমেন্ট PDF ডাউনলোড 🌐 সুপ্রিম কোর্ট পোর্টাল |

