দলিল দাখিলে ব্যর্থতায় অর্থঋণ মামলা খারিজ করা যায় না | হাইকোর্ট

দলিল দাখিলে ব্যর্থতায় দেওয়ানী কার্যবিধির ১১ আদেশের ২১ বিধিতে অর্থঋণ মামলা খারিজ করা যায় না: হাইকোর্ট

সারসংক্ষেপ: অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ একটি বিশেষ আইন এবং এর ৩ ও ৬ ধারা অনুযায়ী এটি দেওয়ানী কার্যবিধির (CPC) ওপর প্রাধান্য পায়। দেওয়ানী কার্যবিধির ১১ আদেশের ২১ বিধি অনুযায়ী শুধুমাত্র নির্দেশিত কোনো দলিল দাখিলে ব্যর্থ হওয়ার কারণে কোনো অর্থঋণ মামলা সরাসরি খারিজ (Dismiss) করে দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই।

বিচারপতি: মো. মজিবুর রহমান মিয়া এবং রেজাউল করিম, হাইকোর্ট বিভাগ

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, অর্থঋণ আইনের অধীনে দায়ের করা মামলায় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি বিবাদীর চাওয়া কোনো দলিল দাখিল করতে ব্যর্থও হয়, তবুও সেই কারণে মামলা খারিজ করা যাবে না। বিবাদী চাইলে জেরার (Cross-examination) সময় ওই দলিলের অভাব বা অসামঞ্জস্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন, কিন্তু রিট এখতিয়ারে এসে মামলা বাতিলের সুযোগ নেই।

১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা

মামলাটি ঢাকার ১ম অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন একটি ঋণখেলাপি মামলা।

  • বাদীর (ব্যাংকের) দাবি: ঋণগ্রহীতা (রিটকারী) ৪টি ট্রাক কেনার জন্য লিজ ফাইন্যান্স সুবিধার আওতায় ঋণ নিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে খেলাপি হয়ে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৬ হাজার টাকার বেশি দাঁড়ায়। ব্যাংক এই টাকা আদায়ে অর্থঋণ মামলা দায়ের করে।
  • বিবাদীর (ঋণগ্রহীতার) পদক্ষেপ: মামলা চলাকালে বিবাদী দেওয়ানী কার্যবিধির ১১ আদেশের ১৪ বিধিতে একটি আবেদন করেন, যেখানে তিনি ব্যাংকের কাছে ২ স্যাংশন লেটারের অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ক্লেমের তথ্য এবং একটি চুক্তিনামা দাখিলের নির্দেশ চান। আদালত প্রথমে এই নির্দেশ মঞ্জুর করেন। কিন্তু ব্যাংক ওই দলিলগুলো দাখিল না করায়, বিবাদী দেওয়ানী কার্যবিধির ১১ আদেশের ২১ বিধি অনুযায়ী পুরো মামলাটি খারিজের (Dismissal of Suit) আবেদন করেন।

২. নিম্ন আদালত যা বলেছে

  • অর্থঋণ আদালত (২০২৩): ঢাকার ১ম অর্থঋণ আদালত বিবাদীর মামলা খারিজের আবেদনটি নামঞ্জুর করেন এবং ব্যাংককে কিছু দলিল দাখিল থেকে অব্যাহতি দেন। অর্থঋণ আদালতের এই আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বিবাদী হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন।

৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ

হাইকোর্ট রিট পিটিশন এবং সংশ্লিষ্ট আইন পর্যালোচনা করে অর্থঋণ আদালতের আদেশ সঠিক বলে মত দেন এবং নিম্নোক্ত আইনি বিষয়গুলো স্পষ্ট করেন:

  • ১১ আদেশের ২১ বিধির ভুল প্রয়োগ: হাইকোর্ট দেওয়ানী কার্যবিধির ১১ আদেশের ২১ বিধি বিশ্লেষণ করে জানান, এই বিধিতে ‘ইন্টারোগেটরিজ (Interrogatories), ডিসকভারি (Discovery) বা ইন্সপেকশন (Inspection)’-এর নির্দেশ অমান্য করলে মামলা খারিজের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শুধুমাত্র ১৪ বিধির অধীনে কোনো ‘দলিল দাখিলে’ (Production of document) ব্যর্থ হলে মামলা খারিজ করার কোনো সুস্পষ্ট বিধান এই বিধিতে নেই।
  • অর্থঋণ আইনের প্রাধান্য (Overriding Effect): অর্থঋণ আদালত আইনের ৩ এবং ৬ ধারা অনুযায়ী এই আইনের প্রাধান্য রয়েছে। আইনের ৮(৩) ধারায় মামলা দায়েরের সময় কী কী দলিল দিতে হবে তা বলা আছে। কিন্তু ব্যাংক যদি পরবর্তীতে বিবাদীর চাওয়া কোনো দলিল দিতে ব্যর্থ হয়, তবে মামলা খারিজ হয়ে যাবে— এমন কোনো বিধান পুরো অর্থঋণ আইনে নেই। যেহেতু বিশেষ আইনে মামলা খারিজের কথা বলা নেই, তাই দেওয়ানী কার্যবিধি ব্যবহার করে মামলা খারিজ করা যাবে না।
  • জেরার সুযোগ ও রিট এখতিয়ার: ব্যাংক যে অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্ট দিয়েছে তা সঠিক কি না বা অন্য কোনো দলিল ব্যাংক গোপন করছে কি না— এগুলো হলো ‘ঘটনাগত বিরোধ’ (Disputed question of fact)। হাইকোর্ট ৫৭ ডিএলআর (এডি) ৫৮ মামলার নজির টেনে বলেন, রিট এখতিয়ারে এই ধরনের বিরোধ মীমাংসা করা যায় না। বিবাদীর সুযোগ রয়েছে সাক্ষ্যগ্রহণের সময় ব্যাংকের সাক্ষীকে জেরা করে তার অবস্থান প্রমাণ করার।

৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট রিটকারী বিবাদীর আবেদনটির ওপর নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:

  • আবেদনকারীর জারি করা রুলটি খারিজ (Discharged) করা হলো।
  • ঢাকার ১ম অর্থঋণ আদালতের দেওয়া মামলা খারিজ না করার আদেশটি বহাল রাখা হলো। হাইকোর্টের দেওয়া স্থগিতাদেশ (Stay order) প্রত্যাহার করা হলো, ফলে নিম্ন আদালতে মূল অর্থঋণ মামলাটি চলতে আর কোনো বাধা রইল না।

মামলার শিরোনাম: নুরুল আজিম সোহেল বনাম বিচারক, অর্থঋণ আদালত নং ১, ঢাকা ও অন্যান্য।
রিট পিটিশন নং: ৫১০৬ / ২০২৩
রায় প্রদানের তারিখ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬

Related Articles

Back to top button