ভাড়াটিয়া হয়ে বাড়ির মালিকের মালিকানা অস্বীকার করা বেআইনি | হাইকোর্ট

সারসংক্ষেপ: সাক্ষ্য আইনের (Evidence Act) ১১৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি ভাড়াটিয়া (Tenant) হিসেবে কোনো সম্পত্তিতে প্রবেশ করেন, তবে ওই ভাড়ার মেয়াদ চলাকালীন তিনি কোনোভাবেই বাড়ির মালিকের (Landlord) মালিকানা বা স্বত্ব (Title) অস্বীকার করতে পারবেন না। একে ‘Tenant’s Estoppel’ বলা হয়। ভাড়াটিয়া যদি ওই সম্পত্তির মালিকানা নিজের বলে দাবি করতে চান, তবে তাকে আগে মালিকের কাছে সম্পত্তির দখল বুঝিয়ে দিতে হবে এবং এরপর আলাদা মামলা করতে হবে।
বিচারপতি: মো: লুৎফর রহমান, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, ভাড়াটিয়া উচ্ছেদের (Eviction) মামলায় সম্পত্তির মালিকানা বা স্বত্বের (Title) প্রশ্নটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। এই ধরনের মামলায় মূল বিবেচ্য বিষয় হলো— বাদী ও বিবাদীর মধ্যে বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া সম্পর্ক রয়েছে কি না এবং ভাড়াটিয়া চুক্তি ভঙ্গ বা ভাড়া খেলাপ (Defaulter) করেছেন কি না।
১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা
মামলাটি বগুড়া জেলার একটি দোকানের ভাড়াটিয়া উচ্ছেদ এবং খাস দখল পুনরুদ্ধারের মামলা।
- বাদীর দাবি: বাদীরা (বর্তমান মালিক) ১৯৯৬ সালে পূর্ববর্তী মালিক আব্দুল করিমের কাছ থেকে ১২টি দোকানসহ একটি মার্কেট কেনেন। বিবাদী আগে থেকেই ওই মার্কেটের একটি দোকানের ভাড়াটিয়া ছিলেন (১৯৮৯ সালের চুক্তি অনুযায়ী মাসিক ২০০ টাকা ভাড়ায়)। মার্কেট বিক্রির পর পূর্বের মালিক ভাড়াটিয়ার চুক্তিনামা ও রসিদ নতুন মালিকদের (বাদীদের) বুঝিয়ে দেন এবং ভাড়াটিয়াকে নতুন মালিকের কাছে ভাড়া দিতে বলেন। কিন্তু ভাড়াটিয়া ভাড়া না দেওয়ায় বাদীরা সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের ১০৬ ধারায় নোটিশ দিয়ে উচ্ছেদ মামলা করেন।
- বিবাদীর দাবি: বিবাদী (ভাড়াটিয়া) দাবি করেন যে, তিনি কোনো ভাড়াটিয়া নন। তিনি ওই দোকানটি ১৯৯৬ সালে সাফ কবলা দলিলে কিনেছেন এবং মালিক হিসেবে ব্যবসা করছেন। তার দাবি অনুযায়ী, আগের মালিক তাকে দখল দেওয়ার কথা বলে ৩০,০০০ টাকা নিলেও দখল দেননি এবং এই জমি নিয়ে একটি বাটোয়ারা মামলাও বিচারাধীন রয়েছে।
২. নিম্ন আদালত যা বলেছে
- বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০১১): বগুড়ার সিনিয়র সহকারী জজ ও স্মল কজ কোর্ট (S.C.C) সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে বাদীর পক্ষে মামলাটি ডিক্রি করে দেন। আদালত দেখতে পান যে, ভাড়াটিয়া চুক্তিনামায় এবং ভাড়ার রসিদে বিবাদীর যে স্বাক্ষর রয়েছে, তা তার লিখিত জবাব ও ওকালতনামার স্বাক্ষরের সাথে হুবহু মিলে যায়। অর্থাৎ, বিবাদী একজন ভাড়াটিয়া ছিলেন এবং তিনি ভাড়া খেলাপ করেছেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে বিবাদী হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন।
৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ
হাইকোর্ট নথিপত্র এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি পর্যালোচনা করে নিম্ন আদালতের রায় সঠিক বলে মত দেন এবং সাক্ষ্য আইনের ১১৬ ধারার আলোকে গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিক তুলে ধরেন:
- ভাড়াটিয়ার এস্টোপেল (Tenant’s Estoppel): হাইকোর্ট আপিল বিভাগের বিখ্যাত ৩৮ ডিএলআর (এডি) ৯৭ [Abdus Sattar Vs. Mohiuddin] মামলার নজির উল্লেখ করে জানান, ভাড়াটিয়া ও বাড়িওয়ালার সম্পর্ক একটি চুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। ভাড়াটিয়া হিসেবে একবার দখল নেওয়ার পর মালিকের স্বত্বে যতো ত্রুটিই থাকুক না কেন, ভাড়াটিয়া তা অস্বীকার করতে পারেন না।
- মালিকানা দাবি করার শর্ত: ৪৮ ডিএলআর (এডি) ২০৫ এবং ১১ এমএলআর (এডি) ৪১ মামলার নজির অনুযায়ী, উচ্ছেদ মামলায় ভাড়াটিয়া মালিকানা দাবি করতে পারে না। সে যদি নিজেকে মালিক দাবি করতে চায়, তবে তাকে আগে বাড়িওয়ালার কাছে সম্পত্তির দখল ফেরত (Surrender of possession) দিতে হবে এবং তারপর আলাদা স্বত্বের মামলা করতে হবে।
- স্বত্বের প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক: যেহেতু স্বাক্ষরের মিল এবং দালিলিক প্রমাণে স্পষ্ট যে বিবাদী একজন ভাড়াটিয়া ছিলেন এবং তিনি ভাড়া দেননি, তাই এখানে কে সম্পত্তির মূল মালিক সেই স্বত্বের প্রশ্নটি (Question of title) অপ্রাসঙ্গিক।
৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট বিবাদীপক্ষের (ভাড়াটিয়া) রিভিশন আবেদনটির ওপর নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:
- আবেদনকারীর রুলটি খারিজ (Discharged) করা হলো।
- বগুড়ার স্মল কজ আদালতের (S.C.C) দেওয়া ২০১১ সালের উচ্ছেদের ডিক্রিটি বহাল (Affirmed) রাখা হলো।
- ভাড়াটিয়াকে (আবেদনকারী) হাইকোর্টের এই আদেশের কপি পাওয়ার ৩০ (ত্রিশ) দিনের মধ্যে ওই দোকানের দখল বাড়িওয়ালার (বাদীর) কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো।
মামলার শিরোনাম: মো: মনসুর আলী প্রামাণিক বনাম মোছা: রেজিয়া বেগম ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ২৬৫৭ / ২০১১
রায় প্রদানের তারিখ: ১২ নভেম্বর ২০২৫
