মূল দলিল দাখিল ও আরজি সংশোধনের জন্য বাটোয়ারা মামলা রিমান্ড | হাইকোর্ট

নতুন দলিল ও আরজি সংশোধনের সুযোগ দিয়ে বাটোয়ারা মামলা রিমান্ড: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
সারসংক্ষেপ: বাটোয়ারা (Partition) মামলায় পক্ষগণের সঠিক হিস্যা (Shares) নির্ধারণ করা আদালতের জন্য অত্যাবশ্যক। যদি হাইকোর্টে রিভিশন পর্যায়ে এসে মামলার কোনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মূল দলিল (Original Deed) পাওয়া যায় এবং আরজি সংশোধনের যুক্তিসঙ্গত প্রয়োজন হয়, তবে ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালত দেওয়ানী কার্যবিধির ৪১ আদেশের ২৩ ও ২৫ বিধি অনুযায়ী মামলাটি পুনরায় বিচারের জন্য বিচারিক আদালতে ফেরত (Remand) পাঠাতে পারেন। খতিয়ানে নাম না থাকা মালিকানা বাতিলের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
বিচারপতি: মো: আলী রেজা, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, ত্রুটিপূর্ণভাবে আরজি মুসাবিদা (Drafting) করার কারণে বাটোয়ারা মামলায় কোনো পক্ষকে তার মৌলিক অধিকার বা প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। এছাড়া, ‘রেকর্ড অব রাইটস’ বা খতিয়ান জমির মালিকানা তৈরি করে না, এটি কেবল মালিকানার একটি অনুমান মাত্র, যা ভুলও হতে পারে।
১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা
মামলাটি খুলনার ১৫.১৮ একর জমির মধ্যে ৩.৫৫ একর জমির বাটোয়ারা বা ভাগ-বণ্টন নিয়ে দায়ের করা একটি মামলা।
- বাদীর দাবি: জমির মূল মালিক ছিলেন কোরবান খান। তার ছেলে দগু খান পিতার জীবদ্দশাতেই মারা যান। কোরবান খান ১৯১৫ সালে তার মৃত ছেলের চার সন্তানকে (নাতিদের) একটি নিবন্ধিত দানপত্র (Gift Deed) করে দেন। পরে কোরবান খানের আরেক ছেলেও মারা গেলে ১৯২৫ সালে অপর এক দানপত্রের মাধ্যমে তাদেরও জমি দেওয়া হয়। বাদিরা এই দানপত্রের ভিত্তিতে জমির মালিকানা ও বাটোয়ারা দাবি করেন।
- বিবাদীর দাবি: মুসলিম আইন অনুযায়ী পিতার আগে সন্তান মারা গেলে মৃত সন্তানের ওয়ারিশরা সম্পত্তি পায় না। ১৯১৫ সালের কথিত দানপত্রটি ভুয়া এবং এর কারণেই ১৯২৭ সালে চূড়ান্ত হওয়া সি.এস (C.S.) রেকর্ডে ওই নাতিদের নাম ওঠেনি।
২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে
- বিচারিক আদালত (Trial Court – ১৯৯২): সহকারী জজ আদালত বাদীর মামলা খারিজ করে দেয়। আদালত জানায়, বাদী ১৯১৫ সালের দলিলের কেবল সার্টিফায়েড কপি দেখিয়েছে, কিন্তু মূল দলিল আদালতে দাখিল করতে পারেনি বা এর কোনো ব্যাখ্যাও দেয়নি। তাছাড়া সিএস রেকর্ডেও ওই দানপত্রের কোনো প্রতিফলন নেই।
- আপিল আদালত (Appellate Court – ১৯৯৫): আপিল আদালতও বিচারিক আদালতের রায় বহাল রেখে বাদীর আপিল খারিজ করে দেয়। এরপর বাদীপক্ষ হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করে।
৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ
হাইকোর্টে শুনানি চলাকালে বাদীপক্ষ ১৯১৫ সালের মূল (Original) দানপত্র দলিলটি উপস্থাপন করে এবং দেওয়ানী কার্যবিধি অনুযায়ী অতিরিক্ত সাক্ষ্য গ্রহণ ও আরজি সংশোধনের আবেদন করে। হাইকোর্ট সার্বিক পর্যালোচনায় নিম্নোক্ত বিষয়গুলো স্পষ্ট করেন:
- খতিয়ানের ভুল ও মালিকানা: হাইকোর্ট জানান, সিএস বা আরএস রেকর্ডে নাম না থাকা মানেই দলিলটি ভুয়া নয়। খতিয়ান মালিকানা তৈরি করে না। ১৯২৫ সালের যে দলিলটি খাঁটি প্রমাণিত হয়েছে, সিএস রেকর্ডে সেটিরও উল্লেখ নেই। অর্থাৎ, সিএস রেকর্ডটি আংশিক ভুল ছিল।
- মূল দলিল ও আরজি সংশোধন: যেহেতু বাদীপক্ষ হাইকোর্টে এসে মূল দলিলটি দেখাতে পেরেছে এবং তাদের আরজি সংশোধনের আবেদনটি বাটোয়ারা মামলার হিস্যা নির্ধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই কোনো সাক্ষ্য গ্রহণ ছাড়া এ পর্যায়ে এসে হাইকোর্টের পক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।
- রিমান্ডের যৌক্তিকতা: যদিও কথায় কথায় মামলা রিমান্ড বা ফেরত পাঠানো ঠিক নয়, তবে বাটোয়ারা মামলায় যেখানে হিস্যা নির্ধারণ এবং নতুন দলিলের বৈধতা যাচাই করা অপরিহার্য, সেখানে ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলা রিমান্ডে পাঠানোই আইনসম্মত।
৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট বাদীপক্ষের রিভিশন আবেদনটির ওপর নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:
- নিম্ন আদালত ও আপিল আদালতের দেওয়া মামলা খারিজের রায় দুটি বাতিল (Set aside) করা হলো।
- মামলাটি পুনরায় নতুন করে বিচারের জন্য বিচারিক আদালতে রিমান্ডে (Remand) পাঠানো হলো।
- বিচারিক আদালতকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, উভয় পক্ষকে আরজি সংশোধন ও নতুন সাক্ষ্য (মূল দলিল) উপস্থাপনের সমান সুযোগ দিয়ে আইন অনুযায়ী হিস্যা নির্ধারণ করে আগামী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলাটি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে।
মামলার শিরোনাম: ছালেহা বেগম (মৃত) ও তার ওয়ারিশগণ বনাম মাজেদ খান (মৃত) ও তার ওয়ারিশগণ।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ১০৯৮ / ২০০৩
রায় প্রদানের তারিখ: ৩ মার্চ ২০২৬
