রেস-জুডিকাটা ও তামাদির প্রশ্নে সাক্ষ্য ছাড়া আরজি খারিজ বেআইনি | হাইকোর্ট

রেস-জুডিকাটা বা তামাদির প্রশ্নে বিচার ছাড়া সরাসরি আরজি খারিজ বেআইনি: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
সারসংক্ষেপ: ‘রেস-জুডিকাটা’ (Res-judicata) এবং তামাদি (Limitation) হলো আইন ও ঘটনার মিশ্র প্রশ্ন (Mixed question of law and fact)। শুধুমাত্র বিবাদীর আবেদনের ভিত্তিতে এবং বিচার্য বিষয় নির্ধারণ ও সাক্ষ্য গ্রহণ ছাড়া দেওয়ানী কার্যবিধির ৭ আদেশের ১১ বিধি অনুযায়ী আরজি খারিজ (Rejection of Plaint) করা আইনসম্মত নয়।
বিচারপতি: এস. এম. সাইফুল ইসলাম, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, কোনো মামলা রেস-জুডিকাটা বা তামাদি আইনে বারিত কি না, তা কেবল আরজি পড়েই সবসময় নির্ধারণ করা যায় না। এর জন্য বিচার্য বিষয় (Issues) গঠন এবং সাক্ষ্য গ্রহণের প্রয়োজন হয়। আরজিতে যদি মামলার কারণ (Cause of action) সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে, তবে সাক্ষ্য গ্রহণের সুযোগ না দিয়ে আরজি খারিজ করে দেওয়া ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা
মামলাটি বরিশালের বাকেরগঞ্জ এলাকার একটি নিলাম বিক্রি (Auction sale) বাতিলের ঘোষণার মামলা।
- বাদীর দাবি: বাদীপক্ষ নিবন্ধিত কবলা দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তির মালিক ও দখলদার। বিবাদীরা একটি অর্থজারী মামলার নিলাম বিক্রির সূত্র ধরে বাদীর মালিকানা অস্বীকার করায় বাদী ওই নিলাম বিক্রি বাতিল ঘোষণার জন্য মামলা দায়ের করেন।
- বিবাদীর দাবি: বিবাদীপক্ষ আদালতে উপস্থিত হয়ে দেওয়ানী কার্যবিধির ৭ আদেশের ১১ বিধির অধীনে আরজি খারিজের আবেদন করে। বিবাদীদের দাবি— বাদী ২০০৯ সালে একই জমির ওপর চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার একটি মামলা করে হেরে গিয়েছিলেন। তাই বর্তমান মামলাটি রেস-জুডিকাটা এবং তামাদি আইনে বারিত।
২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে
- বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০১৪): বাকেরগঞ্জের সিনিয়র সহকারী জজ আদালত বিবাদীর আবেদন মঞ্জুর করে। আদালত জানায় যে, আগের মামলা খারিজ হওয়ায় বর্তমান মামলা রেস-জুডিকাটা দ্বারা বারিত এবং আরজিতে মামলার কোনো কারণ নেই। ফলে বাদীর আরজি খারিজ করে দেওয়া হয়।
- আপিল আদালত (Appellate Court – ২০২০): বাদীপক্ষ আপিল করলে অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত বিচারিক আদালতের আরজি খারিজের সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়। আপিল আদালত জানায়, আগের মামলাটি ছিল ‘নিষেধাজ্ঞার’ আর বর্তমানটি হলো ‘নিলাম বাতিলের ঘোষণার’। তাই ইস্যু ভিন্ন হওয়ায় তা রেস-জুডিকাটায় পড়ে কি না তা বিচারের বিষয়। এরপর বিবাদীপক্ষ হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করে।
৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ
হাইকোর্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে আপিল আদালতের রায় সম্পূর্ণ সঠিক বলে মত দেন এবং আইনি বিষয়গুলো স্পষ্ট করেন:
- ভিন্নতর প্রতিকার ও রেস-জুডিকাটা (Section 11 of CPC): আগের মামলাটি ছিল ‘চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার’ আর বর্তমান মামলাটি হলো ‘নিলাম বিক্রির বিরুদ্ধে ঘোষণার’। দুটি মামলার বিষয়বস্তু এবং প্রার্থিত প্রতিকার প্রাথমিকভাবেই আলাদা। এটি রেস-জুডিকাটায় পড়বে কি না, তা সাক্ষ্য প্রমাণ ছাড়া শুধু আরজি পড়ে খারিজ করার সুযোগ নেই। ১৯ বিএলসি (এডি) ১২৯ মামলার নজির অনুযায়ী এটি বিচারের মাধ্যমে নির্ধারণযোগ্য।
- মামলার কারণ (Cause of Action): আরজিতে বাদী পরিষ্কারভাবে তার কেনা জমির মালিকানা এবং নিলাম বিক্রির কারণে তার স্বত্বে আঘাত আসার কথা বর্ণনা করেছেন। সুতরাং, আরজিতে মামলার কারণ নেই— বিচারিক আদালতের এমন কথা ভিত্তিহীন।
- তামাদি একটি মিশ্র প্রশ্ন (Mixed question of law and fact): মামলাটি তামাদি দোষে দুষ্ট কি না, সেটিও আইন এবং ঘটনার একটি মিশ্র প্রশ্ন, যা চূড়ান্ত বিচারের সময় সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে।
৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট বিবাদীপক্ষের রিভিশন আবেদনটি খারিজ (Discharged) করেছেন এবং নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:
- অতিরিক্ত জেলা জজ (আপিল আদালত) আদালতের দেওয়া ২০২০ সালের রায়টি বহাল (Affirmed) করা হলো।
- সিনিয়র সহকারী জজ (বিচারিক আদালত) আদালতের দেওয়া আরজি খারিজের আদেশটি বাতিল করে মূল মামলাটি (Title Suit No. 199 of 2012) পুনরায় বিচারিক আদালতে আইন অনুযায়ী চালানোর নির্দেশ বহাল রাখা হলো।
মামলার শিরোনাম: আপ্তার আলী খান বনাম আব্দুল রাজ্জাক হাওলাদার।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ১৫৬৮ / ২০২১
রায় প্রদানের তারিখ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
