আরজিতে উল্লেখ না থাকলে শুধু বিবাদীর আবেদনে ‘রেস-জুডিকাটা’র অজুহাতে আরজি খারিজ বেআইনি | হাইকোর্ট

আরজিতে উল্লেখ না থাকলে শুধু বিবাদীর আবেদনে ‘রেস-জুডিকাটা’র অজুহাতে আরজি খারিজ বেআইনি: হাইকোর্ট
সারসংক্ষেপ: দেওয়ানী কার্যবিধির ৭ আদেশের ১১ বিধি অনুযায়ী আরজি খারিজ (Rejection of Plaint) করতে হলে মামলাটি যে আইনে বারিত (Barred by law), তা খোদ আরজির বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হতে হবে। আরজিতে কোনো পূর্ববর্তী মামলার উল্লেখ না থাকলে, শুধুমাত্র বিবাদীর আবেদনের ভিত্তিতে ‘রেস-জুডিকাটা’ (Res-Judicata) বা দোবারা দোষের অজুহাতে সাক্ষ্য গ্রহণ ছাড়া আরজি খারিজ করা বেআইনি।
বিচারপতি: মো: আলী রেজা, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, ‘রেস-জুডিকাটা’ (Res-judicata) বা দোবারা দোষ সবসময় নিছক আইনের প্রশ্ন নয়; এটি প্রমাণের জন্য বিচার্য বিষয় (Issues) গঠন এবং সাক্ষ্য গ্রহণের প্রয়োজন হয়। বিবাদীর লিখিত জবাব বা আরজি খারিজের আবেদনের ওপর ভিত্তি করে তড়িঘড়ি করে মূল মামলা খারিজ করে দেওয়া ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা
মামলাটি নওগাঁ জেলার একটি বাটোয়ারা বা লিজ সংক্রান্ত মামলা।
- বাদীর দাবি: বাদী উত্তরাধিকার এবং দুটি নিবন্ধিত কবলা দলিলের (১৯৬০ ও ১৯৬৬ সালের) মাধ্যমে সম্পত্তির মালিকানা দাবি করে বাটোয়ারার জন্য মামলা দায়ের করেন।
- বিবাদীর পদক্ষেপ: বিবাদীপক্ষ আদালতে উপস্থিত হয়ে দেওয়ানী কার্যবিধির ১১ ধারা এবং ৭ আদেশের ১১ বিধির অধীনে আরজি খারিজের আবেদন করে। তাদের দাবি, বাদীর বাবা ‘সোবহান’ ১৯৮৪ সালে একই দাবিতে একটি মামলা (Title Suit 521 of 1984) করে হেরে গিয়েছিলেন, তাই একই বিষয়ে তার মেয়ে (বর্তমান বাদী) নতুন করে মামলা করতে পারেন না (যা রেস-জুডিকাটা দ্বারা বারিত)।
২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে
- বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০১৩): বিচারিক আদালত বিবাদীর আবেদন মঞ্জুর করে এবং ১৯৮৪ সালের মামলার রায়ের ওপর ভিত্তি করে বর্তমান বাদীর আরজি খারিজ করে দেয়। আদালত বলে যে, বাদী তার দলিলের মূল কপি প্রমাণ করতে পারেনি।
- আপিল আদালত (Appellate Court – ২০২৩): আপিল আদালতও বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে এবং একমত হয় যে মামলাটি রেস-জুডিকাটা দ্বারা বারিত। এরপর বাদীপক্ষ হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করে।
৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ
হাইকোর্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে নিম্ন আদালতগুলোর সিদ্ধান্তে মারাত্মক আইনি ত্রুটি খুঁজে পান:
- আরজি খারিজের শর্ত (Order 7 Rule 11 of CPC): আইন অনুযায়ী আরজি তখনই খারিজ হবে যখন আরজির বক্তব্য পড়েই মনে হবে মামলাটি আইনে চলার অযোগ্য। কিন্তু এই মামলার আরজিতে ১৯৮৪ সালের কোনো পূর্ববর্তী মামলার কথাই উল্লেখ ছিল না। হাইকোর্ট বলেন, বিবাদীর আবেদনের ওপর ভিত্তি করে আরজি খারিজের সুযোগ নেই।
- রেস-জুডিকাটা প্রমাণের নিয়ম (Section 11 of CPC): পূর্বের কোনো মামলার কারণে বর্তমান মামলা বাতিল হবে কি না, তা নির্ধারণ করতে হলে আদালতকে অবশ্যই বিচার্য বিষয় (Issues) গঠন করতে হবে এবং সাক্ষ্য নিতে হবে। সাক্ষ্য গ্রহণ ছাড়া শুধু বিবাদীর দেওয়া আগের মামলার সার্টিফায়েড কপির ওপর ভিত্তি করে মামলা খারিজ করা বেআইনি।
- প্রমাণের সুযোগ না দেওয়া: বিচারিক আদালত রায়ে বলেছিল যে বাদী তার দলিল প্রমাণ করতে পারেনি। হাইকোর্ট বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, যেখানে বিচার কার্যক্রম বা সাক্ষ্য গ্রহণই শুরু হয়নি, সেখানে বাদীকে দলিল প্রমাণের সুযোগই দেওয়া হয়নি। সুযোগ না দিয়ে প্রমাণ করতে ব্যর্থ বলাটা অগ্রহণযোগ্য।
৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট বাদীপক্ষের রিভিশন আবেদনটি অ্যাবসলিউট (Absolute) বা মঞ্জুর করেছেন এবং নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:
- নিম্ন আদালত ও আপিল আদালতের দেওয়া আরজি খারিজের রায়গুলো বাতিল (Set aside) করা হলো।
- বিচারিক আদালতকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ২০১২ সালের মূল বাটোয়ারা মামলাটি (Title Suit 75 of 2012) আইন অনুযায়ী পুনরায় চালু করে বিচারকাজ সম্পন্ন করতে।
মামলার শিরোনাম: মো: এরশাদ আলী ও অন্যান্য বনাম মো: আব্দুল মজিদ প্রামাণিক ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ২৫৬৭ / ২০২৩
রায় প্রদানের তারিখ: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
