নির্ধারিত সময়ে চার্জশিট না দিলেও বাটোয়ারা মামলায় বিবাদীর ‘সাহাম’ পাওয়ার অধিকার ক্ষুণ্ণ হয় না: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

আপিল আদালত অতিরিক্ত প্রমাণ গ্রহণ করার পর রায়ে তা উল্লেখ না করা বিচারিক ভুল; বিবাদীর ক্রয়সূত্রে মালিকানা ও দখল থাকলে তিনি বাটোয়ারা ডিক্রিতে পৃথক অংশ (সাহাম) পাওয়ার অধিকারী।
বিচারপতি মো: জিয়াউল হক, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, বাটোয়ারা মামলায় (Partition Suit) কোনো পক্ষ যদি ক্রয়সূত্রে মালিকানা এবং দখল প্রমাণ করতে সক্ষম হয়, তবে আদালত তাকে অবশ্যই পৃথক সাহাম (Shaham) প্রদান করবে। বেঞ্চ উল্লেখ করেছে যে, আপিল আদালত অতিরিক্ত প্রমাণ (Additional Evidence) হিসেবে দলিলপত্র গ্রহণ করার পরেও যদি চূড়ান্ত রায়ে তার প্রতিফলন না ঘটায়, তবে তা ‘বিচারিক মনের প্রয়োগহীনতা’ (Non-application of judicial mind) হিসেবে গণ্য হবে।
হাইকোর্ট আরও স্পষ্ট করেছে যে, নামজারি বা খাজনা প্রদানের রসিদ (Rent Receipt) জমির দখল এবং মালিকানার একটি সহায়ক প্রমাণ (Co-lateral evidence of title), যা বাটোয়ারা ডিক্রি দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালত অগ্রাহ্য করতে পারে না।
মামলার প্রেক্ষাপট ও ঘটনা
মামলাটি বগুড়া জেলার ধুনট থানার ৩.০২ একর জমি নিয়ে দায়ের করা একটি বাটোয়ারা মামলা (Partition Suit No. 276/1984) থেকে উদ্ভূত। মূল বাদিরা উত্তরাধিকার ও ক্রয়সূত্রে মালিকানা দাবি করে মামলাটি করেন।
মামলার ১২৮-১৩০ নম্বর বিবাদীগণ (আবেদনকারী) দাবি করেন যে, তারা ১৯৫৯ এবং ১৯৭৭ সালের দুটি কবলা দলিলের মাধ্যমে ওই জমির নির্দিষ্ট অংশ (৩০ শতাংশ) ক্রয় করেছেন এবং সেখানে ঘরবাড়ি তুলে বসবাস করছেন। নিম্ন আদালত (সহকারী জজ) বাদিদের পক্ষে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অংশের ডিক্রি দিলেও বিবাদীদের কেনা জমির অংশটি সাহাম হিসেবে দেয়নি।
পরবর্তীতে আপিল চলাকালীন অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতে বিবাদীপক্ষ তাদের মালিকানার মূল দলিল এবং খাজনা রসিদ দাখিল করেন (Exhibit-Tha series)। আদালত এসব প্রমাণ গ্রহণ করলেও চূড়ান্ত রায়ে তাদের নামে কোনো সাহাম বরাদ্দ করেনি। এর প্রতিকার চেয়ে বিবাদীপক্ষ হাইকোর্টে এই দেওয়ানী রিভিশন মামলাটি দায়ের করেন।
আইনি যুক্তি ও আদালতের পর্যবেক্ষণ
আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী যুক্তি দেন যে, বিবাদীগণ বৈধ খরিদা সূত্রে মালিক এবং অন্য কোনো পক্ষ এই মালিকানার বিষয়ে আপত্তি তোলেনি। তা সত্ত্বেও আপিল আদালত নথিপত্র পর্যালোচনা না করেই তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করেছে।
শুনানিকালে অপর পক্ষের (বাদি) আইনজীবীও উদারতা দেখিয়ে স্বীকার করেন যে, বিবাদীগণ প্রকৃতপক্ষে ওই জমিতে দখলে আছেন এবং তাদের ৩০ শতাংশ জমি বুঝিয়ে দিতে বাদিদের কোনো আপত্তি নেই।
বিচারপতি মো: জিয়াউল হক তার পর্যবেক্ষণে বলেন:
“আপিল আদালত অতিরিক্ত সাক্ষ্য এবং দলিলপত্র গ্রহণ করার পরেও রায়ে সেগুলোর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে নীরব থেকেছেন। এটি বিচারিক ভুল। আবেদনকারীরা ৩০ শতাংশ জমিতে তাদের স্বত্ব প্রমাণ করতে পেরেছেন এবং নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করছেন যা তাদের দখল প্রমাণ করে।”
আদালত এই ক্ষেত্রে ৩৫ ডিএলআর (এসসি) ২১৬ মামলার নজির টেনে বলেন, খাজনা রসিদ মালিকানার একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক প্রমাণ।
হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট বিভাগ নিম্ন আদালতের রায় সংশোধন করে আবেদনকারীদের (১২৮-১৩০ নং বিবাদী) পক্ষে রুলটি অ্যাবসলিউট (Absolute) ঘোষণা করেন। আদালতের প্রধান নির্দেশনাসমূহ হলো:
- আবেদনকারীগণ (দেবাশীষ সাহা ও অন্যান্য) ক্রয়সূত্রে দাবি করা ৩০ শতাংশ জমির পৃথক সাহাম পাবেন।
- নিম্ন আদালতকে একজন অ্যাডভোকেট কমিশনার নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যিনি সরেজমিনে জমি মেপে স্কেচ ম্যাপের মাধ্যমে আবেদনকারীদের অংশটি চিহ্নিত করে দেবেন।
- অ্যাডভোকেট কমিশনারকে ২ মাসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দিতে হবে এবং পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে পুরো বাটোয়ারা প্রক্রিয়াটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর (Execution) করতে হবে।
মামলার শিরোনাম: দেবাশীষ সাহা ও অন্যান্য বনাম খাতেমন বিবি (মৃত) ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ২৩২৮ / ২০০৯
আইনজীবীগণ: * আবেদনকারী পক্ষে: অ্যাডভোকেট একরামুল হক এবং এ.জেড.এম মোর্শেদ আল মামুন।
- বিপক্ষ পক্ষে: অ্যাডভোকেট মো: বেলাল হোসেন।
এই রায়টি বাটোয়ারা মামলার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত যে, ক্রয়সূত্রে মালিকানা এবং দখল যথাযথভাবে প্রমাণিত হলে আদালত কোনোভাবেই পক্ষগণকে তাদের অংশ থেকে বঞ্চিত করতে পারে না।

