নাবালকের সম্পত্তি হস্তান্তরে মায়ের অভিভাবকত্ব ও আদালতের অনুমতি | হাইকোর্ট

নাবালকের মঙ্গলের জন্য মা আদালতের অনুমতি নিয়ে সম্পত্তি বিক্রি করতে পারেন: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

সারসংক্ষেপ: নাবালক সন্তানের অভিভাবক হিসেবে মা তার সন্তানের ভরণপোষণ ও শিক্ষার উন্নতির জন্য পারিবারিক আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে নাবালকের সম্পত্তি হস্তান্তর (বিক্রি) করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে নাবালকের চাচারা সম্পত্তি শরিকানা বা একান্নভুক্ত দাবি করে বাধা দিতে পারেন না, কারণ পৃথিবীতে মা-ই সন্তানের সবচেয়ে কাছের মানুষ ও সর্বোচ্চ শুভাকাঙ্ক্ষী।

বিচারপতি: মো: রিয়াজ উদ্দিন খান, হাইকোর্ট বিভাগ

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, নাবালকের সম্পত্তি বিক্রির অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালত যদি বিক্রিত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখা এবং খরচের হিসাব দাখিলের নির্দেশ দিয়ে নাবালকের স্বার্থ সুরক্ষিত করেন, তবে সেই আদেশে অন্য কোনো শরিকের (যেমন- চাচাদের) অধিকার ক্ষুণ্ণ হয় না।

১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা

মামলাটি কুমিল্লা জেলার এক নাবালকের সম্পত্তি বিক্রির অনুমতি সংক্রান্ত (Miscellaneous Permission Suit)।

  • মায়ের (বাদীর) আবেদন: স্বামী মারা যাওয়ার পর মা (মোমেনা বেগম) পারিবারিক আদালতের মাধ্যমে তার নাবালক ছেলের (জয় সোলায়মান ভূঁইয়া) এবং তার সম্পত্তির আইনি অভিভাবক নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে ছেলের ভরণপোষণ ও পড়াশোনার খরচের জন্য তিনি ছেলের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ৫৩ শতক জমির মধ্য থেকে ২৩ শতক জমি বিক্রির অনুমতি চেয়ে পারিবারিক আদালতে মামলা করেন।
  • চাচাদের (বিবাদীর) দাবি: নাবালকের চাচারা (আপিলকারী) দাবি করেন যে, সম্পত্তিটি এজমালি (অবিভক্ত) এবং মা ও নাবালক ছেলে তাদের সাথেই বসবাস করে। তারা নাবালকের ভরণপোষণ করছেন, তাই জমি বিক্রির কোনো প্রয়োজন নেই।

২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে

  • বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০১০): কুমিল্লার সদর পারিবারিক আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে মাকে ২৩ শতক জমি বিক্রির অনুমতি দেন। তবে শর্ত দেওয়া হয় যে, বিক্রির টাকা যেকোনো তফসিলি ব্যাংকে জমা রাখতে হবে এবং খরচের হিসাব সময়ে সময়ে আদালতে দাখিল করতে হবে।
  • আপিল আদালত (Appellate Court – ২০১৫): বিচারিক আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে চাচারা আপিল করলে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত তা খারিজ করে দেন। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, পৃথিবীতে মা-ই সন্তানের সবচেয়ে কাছের এবং মঙ্গলকামী। সন্তানের কল্যাণে বিচারিক আদালতের অনুমতি প্রদান সম্পূর্ণ সঠিক ছিল। এরপর চাচারা হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন।

৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ

২০২০ সালে হাইকোর্টে শুনানিকালে কোনো পক্ষই উপস্থিত ছিল না। তবে হাইকোর্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে আপিল আদালতের রায় সঠিক বলে মত দেন এবং নিম্নোক্ত বিষয়গুলো উল্লেখ করেন:

  • মায়ের অধিকার ও সন্তানের মঙ্গল: হাইকোর্ট আপিল আদালতের সাথে একমত পোষণ করেন যে, মা সন্তানের সবচেয়ে কাছের মানুষ। নাবালকের ভরণপোষণ ও পড়াশোনার জন্য সম্পত্তি বিক্রির ক্ষেত্রে বিচারিক আদালত সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
  • নাবালকের স্বার্থ সুরক্ষা: বিচারিক আদালত সম্পত্তি বিক্রির অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি বিক্রিত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখা এবং খরচের হিসাব আদালতে দাখিলের নির্দেশ দিয়ে নাবালকের স্বার্থ শতভাগ সুরক্ষিত করেছেন।
  • চাচাদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়নি: যেহেতু নাবালকের নিজের জমির অংশটুকু বিক্রি হচ্ছে এবং টাকা তার কল্যাণেই ব্যয় হবে, তাই সম্পত্তিটি এজমালি হলেও এতে চাচাদের কোনো ব্যক্তিগত বা আইনি অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়নি।

৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট চাচাদের (আবেদনকারী) রিভিশন আবেদনটি খারিজ (Discharged) করেছেন এবং নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:

  • অতিরিক্ত জেলা জজ (আপিল আদালত) এবং বিচারিক আদালতের দেওয়া নাবালকের জমি বিক্রির অনুমতির আদেশ বহাল (Affirmed) রাখা হলো।

মামলার শিরোনাম: মো: আব্দুর রউফ ভূঁইয়া ও অন্যান্য বনাম মোমেনা বেগম ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ১৮৪৪ / ২০১৫
রায় প্রদানের তারিখ: ৭ অক্টোবর ২০২০

Related Articles

Back to top button