ব্যাংক বন্ধকী জমি বিক্রি কি সম্পূর্ণ বাতিল? জানুন সুপ্রিম কোর্টের রায়

ব্যাংক বন্ধকী জমি বিক্রি কি সম্পূর্ণ বাতিল? জানুন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত

সারসংক্ষেপ: ‘ট্রান্সফার অফ প্রোপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২’ এর ৫৩ডি (Section 53D) ধারা অনুযায়ী বন্ধকী জমি হস্তান্তর করা বাতিল বা অকার্যকর (Void)। কিন্তু এই আইনটি ২০০৫ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। এর আগে কেনা বন্ধকী জমির ক্ষেত্রে ক্রেতা যদি ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করে জমি দায়মুক্ত (Redeem) করেন, তবে তিনি বৈধ মালিকানা লাভ করবেন।

বিচারপতি: এস. এম. সাইফুল ইসলাম, হাইকোর্ট বিভাগ

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, ২০০৫ সালের আইন সংশোধনের আগে বন্ধকী জমি বিক্রি করা শুরুতেই বাতিল (Void ab-initio) ছিল না, বরং তা ঋণদাতা বা ব্যাংকের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল ছিল (Voidable)। ব্যাংক যদি দলিল বাতিল না চেয়ে ক্রেতার কাছ থেকে ঋণের টাকা বুঝে নিয়ে সম্পত্তি দায়মুক্ত করে দেয়, তবে আইনের ৯১ এবং ৪৩ ধারা অনুযায়ী ক্রেতা সম্পত্তির বৈধ মালিক হবেন।

১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা

মামলাটি শেরপুর জেলার একটি ব্যাংক বন্ধকী জমি ক্রয় এবং এর মালিকানা সংক্রান্ত।

  • বাদীর দাবি: বাদীপক্ষ মূল মালিক (ফাতেমা বেগম) এবং তার ওয়ারিশদের কাছ থেকে বিভিন্ন রেজিস্ট্রিকৃত কবলা দলিলের মাধ্যমে জমি কিনে ভোগদখলে আছেন। কেনার সময় তারা জানতেন না যে জমিটি ব্যাংকে বন্ধক রাখা আছে। পরবর্তীতে ব্যাংক নিলামের হুমকি দিলে বাধ্য হয়ে বাদীপক্ষ ব্যাংকের সমস্ত পাওনা পরিশোধ করে জমি দায়মুক্ত করেন। এরপর তারা স্বত্ব ঘোষণার মামলা করেন।
  • বিবাদীর দাবি: বিবাদী (মূল মালিকের ছেলে) দাবি করেন যে, তার মা ১৯৮৪ সালে অগ্রণী ব্যাংকে জমিটি বন্ধক রেখেছিলেন। আইন অনুযায়ী বন্ধকী জমি বিক্রি করা যায় না, তাই বাদীদের কেনা দলিলগুলো শুরু থেকেই বাতিল (Void ab-initio) এবং বাদীরা কোনো মালিকানা পাবে না।

২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে

  • বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০০৫): শেরপুরের সিনিয়র সহকারী জজ আদালত বিবাদীর যুক্তির সাথে একমত পোষণ করে জানায় যে, জমিটি বিক্রির আগেই ব্যাংকে বন্ধক রাখা হয়েছিল। তাই বাদীরা এই জমি কিনে কোনো মালিকানা অর্জন করেনি। আদালত বাদীর মামলা খারিজ করে দেয়।
  • আপিল আদালত (Appellate Court – ২০০৮): বাদীপক্ষ আপিল করলে অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করে দেয়। আপিল আদালত দেখতে পায়, বিবাদীরা বন্ধকী জমি বিক্রি করে বাদীদের সাথে প্রতারণা করেছে। পরবর্তীতে বাদীরা বাধ্য হয়ে ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করেছে এবং ব্যাংক পাওনা বুঝে পেয়ে মামলা তুলে নিয়েছে। তাই বাদীরাই এই জমির প্রকৃত মালিক। এরপর বিবাদীপক্ষ হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করে।

৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ

হাইকোর্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে আপিল আদালতের রায় সম্পূর্ণ সঠিক বলে মত দেন এবং ট্রান্সফার অফ প্রোপার্টি অ্যাক্টের গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয়গুলো স্পষ্ট করেন:

  • আইনের ৫৩ডি ধারার প্রয়োগ: হাইকোর্ট জানান, বন্ধকী জমি হস্তান্তর করা বাতিল (Void)—এই বিধানটি ৫৩ডি ধারা হিসেবে ২০০৪ সালের সংশোধনী আইনের মাধ্যমে যুক্ত হয়, যা ২০০৫ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়। কিন্তু বাদীরা জমি কিনেছিলেন এর আগে। তৎকালীন ৫৩ ধারা অনুযায়ী এই বিক্রি ‘শুরুতেই বাতিল’ ছিল না, এটি ছিল ‘বাতিলযোগ্য’ (Voidable)।
  • ব্যাংকের ভূমিকা: ব্যাংক চাইলে বাদীর দলিল বাতিল চাইতে পারত। কিন্তু ব্যাংক তা না করে বাদীর কাছ থেকে ঋণের টাকা বুঝে নিয়ে একটি সনদ (Certificate) ইস্যু করে জমি দায়মুক্ত করে দিয়েছে।
  • মালিকানা অর্জন (Section 91 & 43): ট্রান্সফার অফ প্রোপার্টি অ্যাক্টের ৯১ ধারা অনুযায়ী কবলা ক্রেতা হিসেবে বাদীদের ওই জমি দায়মুক্ত করার অধিকার রয়েছে। এমনকি ৪৩ ধারা অনুযায়ী, দায়মুক্ত হওয়ার পর জমির মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্রেতার (বাদীর) অনুকূলে বর্তাবে। বিবাদীরা প্রতারণা করে এখন আর মালিকানা দাবি করতে পারে না।

৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট বিবাদীপক্ষের রিভিশন আবেদনটি খারিজ (Discharged) করেছেন এবং নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:

  • অতিরিক্ত জেলা জজ (আপিল আদালত) আদালতের দেওয়া ২০০৮ সালের বাদীর পক্ষে মালিকানা ঘোষণার রায়টি বহাল (Affirmed) করা হলো।
  • বিচারিক আদালতের মামলা খারিজের সিদ্ধান্ত বাতিল বলে গণ্য হবে এবং বাদীরা তাদের ক্রয়কৃত জমির বৈধ মালিক হিসেবে বহাল থাকবেন।

মামলার শিরোনাম: মো: ফজলুল হক লাভলু বনাম মো: রবিউল আলম ওরফে চান মিয়া ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ১৭৫২ / ২০০৮
রায় প্রদানের তারিখ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬

Related Articles

Back to top button