আপিল পর্যায়ে আরজি সংশোধন ও খাস দখলের প্রার্থনা | সুপ্রিম কোর্ট

আপিল পর্যায়ে আরজি সংশোধন করে খাস দখল চাওয়া বেআইনি নয়: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
সারসংক্ষেপ: দেওয়ানী কার্যবিধির ৬ আদেশের ১৭ বিধি (Order VI, Rule 17 of CPC) অনুযায়ী মামলা নিষ্পত্তির প্রকৃত বিরোধ প্রমাণের জন্য যেকোনো পর্যায়ে আরজি সংশোধন করা যায়। স্বত্ব ঘোষণার মামলায় আপিল পর্যায়ে এসে আরজিতে ‘খাস দখলের’ (Recovery of Khas Possession) প্রার্থনা যুক্ত করলে তা মামলার মূল প্রকৃতি ও ধরন পরিবর্তন করে না, যদি মামলার মূল ভিত্তি (Foundation) একই থাকে।
বিচারপতি: মো: রিয়াজ উদ্দিন খান, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, আইনজীবীর অসতর্কতার কারণে আরজিতে কোনো প্রতিকার চাইতে ভুল হলে এবং পরবর্তীতে তা সংশোধনের আবেদন করা হলে আদালত তা মঞ্জুর করতে পারেন। আরজি সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য হলো পক্ষগণের মধ্যকার প্রকৃত বিরোধের মীমাংসা করা এবং বহুবিধ মামলা (Multiplicity of proceedings) এড়ানো।
১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা
মামলাটি নাটোর জেলার একটি দলিল বাতিল এবং স্বত্ব ঘোষণার মামলা।
- বাদীর দাবি: ২০০৭ সালে বাদী একটি মামলা দায়ের করেন এই মর্মে যে, বিবাদীদের সাথে তার জমি বিনিময়ের (এওয়াজ) কথা থাকলেও বিবাদীরা প্রতারণা করে সাফ কবলা দলিল রেজিস্ট্রি করে নিয়েছে। মামলা চলাকালীন ২০১৪ সালে বিবাদীরা বাদীকে জমি থেকে বেদখল করে দেয়। বাদী আরজিতে বেদখল হওয়ার কথা উল্লেখ করলেও, আইনজীবীর ভুলে ‘খাস দখল পুনরুদ্ধারের’ (Recovery of Khas Possession) নির্দিষ্ট প্রার্থনাটি আরজিতে যুক্ত করা হয়নি।
২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে
- বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০১৭): নাটোর সদরের সিনিয়র সহকারী জজ আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে বাদীর মামলাটি খারিজ করে দেয়।
- আপিল আদালত (Appellate Court – ২০২৩): বাদী জেলা জজ আদালতে আপিল করেন। আপিল চলাকালীন ২০২২ সালে বাদী তার আইনজীবীর ভুল বুঝতে পেরে দেওয়ানী কার্যবিধির ৬ আদেশের ১৭ বিধি অনুযায়ী আরজি সংশোধনের (খাস দখলের প্রার্থনা এবং একটি দাগ নম্বর সংশোধনের) আবেদন করেন। কিন্তু দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালত এই আবেদনটি নামঞ্জুর করেন। আদালতের যুক্তি ছিল— এত বছর পর আপিল পর্যায়ে এসে আরজি সংশোধন করলে মামলার প্রকৃতি ও ধরন (Nature and character) বদলে যাবে। এরপর বাদী হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন।
৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ
হাইকোর্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে আপিল আদালতের রায়ে সুস্পষ্ট আইনি ত্রুটি খুঁজে পান এবং নিম্নোক্ত আইনি বিষয়গুলো স্পষ্ট করেন:
- মামলার প্রকৃতি পরিবর্তন হয় না: হাইকোর্ট ১৯৯৮ বিএলডি (এডি) ১২১ মামলার নজির উল্লেখ করে জানান, স্বত্ব ঘোষণা এবং খাস দখলের মামলা মূলত একই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যেহেতু মূল আরজিতে বাদী বেদখল হওয়ার কথা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছিলেন, তাই নতুন করে ‘খাস দখল’ এর প্রার্থনা যুক্ত করলে মামলার মৌলিক চরিত্র বদলে যায় না।
- আরজি সংশোধনের উদ্দেশ্য: ৬ আদেশের ১৭ বিধির উদ্দেশ্য হলো পক্ষগুলোর মধ্যকার প্রকৃত বিরোধের মীমাংসা করা। বিচারিক প্রক্রিয়ার যেকোনো পর্যায়েই এই সংশোধন করা যেতে পারে। আদালত চাইলে বিলম্বের জন্য জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ (Cost) আরোপ করতে পারত, কিন্তু আবেদনটি সরাসরি বাতিল করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হয়েছে।
৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট বাদীপক্ষের (আবেদনকারী) রিভিশন আবেদনটি অ্যাবসলিউট (Absolute) বা মঞ্জুর করেছেন এবং নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:
- যুগ্ম জেলা জজ (আপিল আদালত) আদালতের দেওয়া ২০২৩ সালের আরজি সংশোধনের আবেদন নামঞ্জুরের আদেশটি বাতিল (Set aside) করা হলো।
- বাদীর ২০২২ সালের আরজি সংশোধনের আবেদনটি মঞ্জুর (Allowed) করা হলো।
- আপিল আদালতকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আরজি সংশোধনের আলোকে প্রয়োজনে উভয় পক্ষকে নতুন করে সাক্ষ্য ও প্রমাণ দাখিলের সুযোগ দিয়ে আগামী ৬ (ছয়) মাসের মধ্যে মূল আপিলটি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে।
মামলার শিরোনাম: মোছা: শাহিদা বেওয়া বনাম মো: আব্দুল কুদ্দুস বেপারী ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ৩৭৭৪ / ২০২৩
রায় প্রদানের তারিখ: ২ মার্চ ২০২৬

