মেয়েরা কি বসতভিটার সম্পত্তি পায় না? বাটোয়ারা আইনের ৪ ধারা, আইনি ব্যাখ্যা ও যুগান্তকারী নজির

ভূমিকা: সমাজে প্রচলিত একটি ভ্রান্ত ধারণা
বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরতলীতে পারিবারিক সম্পত্তির বণ্টন বা বাটোয়ারা নিয়ে আলোচনা উঠলেই একটি কথা প্রায়শই শোনা যায়— “মেয়েরা বসতভিটার সম্পত্তি পায় না, তারা কেবল আবাদি জমির ভাগ পাবে।” এই একটি মাত্র ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে যুগ যুগ ধরে অসংখ্য নারী তাদের পৈতৃক বসতবাড়ির ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কখনও ভাইদের দ্বারা, কখনও বা সমাজের প্রভাবশালীদের ভুল সালিশের মাধ্যমে এই ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সত্যিই কি আইনে এমন কোনো কথা বলা আছে? বাংলাদেশের প্রচলিত আইন, বিশেষ করে উত্তরাধিকার আইন এবং সম্পত্তি হস্তান্তর আইন কি নারীদের বসতভিটার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে?
এর এক কথায় উত্তর হলো— না, মোটেও না। আইনত একজন নারী তার পিতার সম্পত্তির অন্যান্য অংশের মতো বসতভিটার জমিতেও সমান (উত্তরাধিকারের হিস্যা অনুযায়ী) অধিকার রাখেন। তাহলে এই বিভ্রান্তির উৎপত্তি কোথায়? এর উৎপত্তি মূলত বাটোয়ারা আইন, ১৮৯৩ (The Partition Act, 1893) এর ৪ ধারা (Section 4)-এর একটি ভুল ও আংশিক ব্যাখ্যার ওপর। এই আর্টিকেলে আমরা অত্যন্ত সহজ, সাবলীল এবং বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব বসতভিটার সম্পত্তিতে মেয়েদের অধিকার কতটুকু, বাটোয়ারা আইনের ৪ ধারা আসলে কী বলে, এবং মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন যুগান্তকারী রায়ে (যেমন- ৩৪ ডিএলআর ২৪৫) বিষয়টিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
উত্তরাধিকার আইন এবং নারীদের সম্পত্তির প্রাথমিক অধিকার
বসতভিটার আইনের জটিলতায় প্রবেশের আগে আমাদের বুঝতে হবে সম্পত্তির মূল মালিকানা বা Title কীভাবে অর্জিত হয়। বাংলাদেশে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন (ফারায়েজ) অনুযায়ী, একজন ব্যক্তির মৃত্যুর সাথে সাথেই তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির ওপর তার বৈধ ওয়ারিশদের অধিকার সৃষ্টি হয়। এখানে আবাদি জমি (Agricultural land), বাণিজ্যিক প্লট (Commercial plot) কিংবা বসতভিটা (Homestead/Dwelling house)-এর মধ্যে আইনে কোনো পার্থক্য করা হয়নি।
মৃত ব্যক্তির যদি পুত্র ও কন্যা উভয়ই থাকে, তবে কুরআনের বিধান অনুযায়ী “এক পুত্রের অংশ দুই কন্যার অংশের সমান” (২:১ অনুপাত) হিসেবে সম্পত্তি বণ্টিত হয়। অর্থাৎ, পিতা যদি ১০ শতক বসতভিটা রেখে মারা যান এবং তার ১ ছেলে ও ১ মেয়ে থাকে, তবে ছেলে পাবে ৬.৬৬ শতক এবং মেয়ে পাবে ৩.৩৩ শতক। এই মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হয়। এর জন্য কোনো আলাদা ঘোষণার প্রয়োজন নেই। সুতরাং, আইনত কন্যারা বসতভিটার মালিকানা অবশ্যই পায়। কিন্তু সমস্যাটি তৈরি হয় যখন এই যৌথ মালিকানার সম্পত্তিটি বাস্তবে ভাগ-বাটোয়ারা (Physical Partition) করার সময় আসে এবং অবিভক্ত পরিবারের বাইরের কোনো ব্যক্তি (Stranger) সেখানে প্রবেশ করতে চায়।
বসতভিটা বা ‘Homestead Property’ বলতে আইনি ভাষায় কী বোঝায়?
বাটোয়ারা আইনের ৪ ধারার প্রয়োগ বুঝতে হলে প্রথমে ‘বসতবাড়ি’ বা ‘Family Dwelling House’-এর আইনি সংজ্ঞা বুঝতে হবে। Land Reforms Ordinance, 1984 এবং বিভিন্ন দেওয়ানি মামলার নজির অনুযায়ী, বসতভিটা কেবল শোবার ঘর নয়। একটি বাসগৃহ, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, আঙিনা, চলাচলের রাস্তা, এবং বসতবাড়ির সাথে সরাসরি সংযুক্ত পুকুর বা বাগান— এই সবকিছুর সমন্বয়ে একটি ‘Dwelling House’ গঠিত হয়।
আইনের দৃষ্টিতে বসতভিটা অত্যন্ত আবেগপূর্ণ এবং সংবেদনশীল একটি সম্পত্তি। এটি কেবল ইট-পাথরের কাঠামো নয়; এর সাথে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের সম্মান (Dignity), গোপনীয়তা (Privacy) এবং শান্তিতে বসবাসের অধিকার। বিশেষ করে গ্রামীণ ও রক্ষণশীল সমাজে বাড়ির ভেতরের আঙিনায় নারীদের অবাধ বিচরণ থাকে। সেখানে যদি পরিবারের বাইরের কোনো অচেনা মানুষ এসে বসবাস শুরু করে, তবে সেই পরিবারের শান্তি ও পর্দা চরমভাবে বিঘ্নিত হয়। এই সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই বাটোয়ারা আইনের ৪ ধারার জন্ম।
বাটোয়ারা আইন, ১৮৯৩ এর ৪ ধারা: মূল আলোচনা
The Partition Act, 1893 এর Section 4-এ বলা হয়েছে: “Where a share of a dwelling-house belonging to an undivided family has been transferred to a person who is not a member of such family and such transferee sues for partition, the court shall, if any member of the family being a shareholder shall undertake to buy the share of such transferee, make a valuation of such share in such manner as it thinks fit and direct the sale of such share to such shareholder…”
সহজ বাংলায় এই ধারার সারমর্ম হলো:
- সম্পত্তিটি অবশ্যই একটি ‘অবিভক্ত পরিবারের বসতবাড়ি’ (Dwelling-house belonging to an undivided family) হতে হবে।
- ওই বসতবাড়ির কোনো এক অংশীদার তার অংশ পরিবারের বাইরের কোনো অপরিচিত ব্যক্তির (Stranger/Third party) কাছে বিক্রি বা হস্তান্তর করেছে।
- সেই অপরিচিত ক্রেতা (Transferee) আদালতে বাটোয়ারা বা সম্পত্তি ভাগের মামলা (Partition Suit) দায়ের করেছে।
- এমতাবস্থায়, ওই বসতবাড়িতে বসবাসরত অবিভক্ত পরিবারের অন্য কোনো অংশীদার (Shareholder) যদি আদালতে আবেদন করেন যে, তিনি ওই বাইরের লোকের কেনা অংশটি আদালতের নির্ধারিত মূল্যে কিনে নিতে ইচ্ছুক (Right of Pre-emption/অগ্রক্রয়াধিকার), তবে আদালত বাইরের ক্রেতাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে পরিবারের সদস্যকেই ওই অংশ কিনে নেওয়ার সুযোগ দেবেন।
এই আইনের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো— বাইরের কোনো অপরিচিত লোককে পরিবারের পবিত্র অন্দরে প্রবেশ করতে না দেওয়া। এটি কারো সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার আইন নয়, বরং বসতবাড়ির অখণ্ডতা রক্ষার আইন।
‘অবিভক্ত পরিবারের সদস্য’ (Member of Undivided Family) বলতে কী বোঝায়?
৪ ধারার সুবিধা পেতে হলে সবচেয়ে বড় শর্ত হলো আবেদনকারীকে অবশ্যই ‘অবিভক্ত পরিবারের সদস্য’ হতে হবে। হিন্দু আইনে জয়েন্ট ফ্যামিলির সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা থাকলেও মুসলিম আইনে তা নেই। তবে আইনি নজির অনুযায়ী, ‘অবিভক্ত পরিবার’ বলতে এমন একটি পরিবারকে বোঝায়, যারা রক্তের সম্পর্কে আবদ্ধ এবং একটি নির্দিষ্ট বসতবাড়িতে অবিভক্ত অবস্থায় একত্রে বসবাস করেন বা বসবাসের ইচ্ছা (Intention to reside/Animus revertendi) পোষণ করেন।
এখানেই আসে বিবাহিত কন্যাদের প্রসঙ্গটি।
আমাদের সমাজের সাধারণ রীতি অনুযায়ী, একজন কন্যা বিবাহের পর তার পৈতৃক গৃহ ত্যাগ করে স্বামীর গৃহে চলে যান এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে সংসার গড়ে তোলেন (Domicile by marriage)। যখন তিনি স্বামীর বাড়িতে স্থায়ী হন, তখন সাধারণ আইনি অনুমিতি (Prima facie presumption) হলো— তিনি তার পিতার ‘অবিভক্ত পরিবারের’ দৈনন্দিন বসবাসকারী সদস্য আর নেই। তিনি এখন তার স্বামীর পরিবারের সদস্য। এই একটি মাত্র কারণ বা যুক্তিতেই একজন বিবাহিত কন্যা বাটোয়ারা আইনের ৪ ধারার বিশেষ সুবিধাটি হারান।
যুগান্তকারী আইনি নজির: আব্দুল গনি বনাম আসিফাদৌল্লা (৩৪ ডিএলআর ২৪৫)
বিবাহিত কন্যাদের বসতভিটার বাটোয়ারা সংক্রান্ত সবচেয়ে আলোচিত এবং রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত মামলাটি হলো Abdul Gani vs. Asifadoullah। এই মামলার রায়টি ১৯৮০ সালের ৪ জুন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের মাননীয় বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুল খালেক প্রদান করেন, যা 34 DLR (HD) 245 এবং BLR 1980 (HD) 56 তে রিপোর্ট করা হয়েছে। এই মামলাটি পরিষ্কারভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরে আইনের প্রয়োগ কীভাবে ঘটে।
মামলার ঘটনা (Facts of the Case)
বিবাদিত বসতবাড়িটির মূল মালিক ছিলেন বিজন বিবি। তার মৃত্যুর পর তার এক ছেলে মোচাদ আলী এবং এক মেয়ে আবজান বিবি উত্তরাধিকার হিসেবে সম্পত্তি লাভ করেন। পরবর্তীতে মোচাদ আলীর ওয়ারিশরা (বিবাদীরা) তাদের অংশের একটি বড় ভাগ (২/৩ অংশ) ফজর আলী নামের পরিবারের বাইরের একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেন।
অন্যদিকে, মেয়ে আবজান বিবির মৃত্যুর পর তার ছেলে আব্দুল মালেক এবং পরবর্তীতে তার নাতি আব্দুল গনি (এই মামলার বাদী) ১/৩ অংশের মালিক হন। যখন বাইরের লোক ফজর আলী (এবং পরবর্তীতে তার কাছ থেকে কেনা ব্যক্তিরা) বসতবাড়িতে দখল নিতে চায়, তখন বাদী আব্দুল গনি বাটোয়ারা আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী আদালতে আবেদন করেন। বাদীর দাবি ছিল— “যেহেতু আমি উত্তরাধিকার সূত্রে এই বাড়ির ১/৩ অংশের মালিক, তাই বাইরের লোক এই বাড়িতে ঢুকতে পারবে না। ৪ ধারা অনুযায়ী আমি তাদের কেনা অংশটি টাকা দিয়ে কিনে নেব।”
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত
নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে হাইকোর্ট পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে বাদীর এই দাবি খারিজ হয়ে যায়। হাইকোর্ট তার রায়ের ৮ নম্বর অনুচ্ছেদে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন কেন বাদী ৪ ধারার সুবিধা পাবেন না।
আদালত বলেন, “There is no dispute that plaintiff is owner to the extent of 1/3rd share in the disputed homestead… But the main question is whether the plaintiff is a member of the family of Bijon Bibi or Mochad Ali.” (বাদীর ১/৩ অংশের মালিকানা নিয়ে কোনো বিবাদ নেই। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো বাদী কি বিজন বিবি বা মোচাদ আলীর পরিবারের সদস্য?)
বিচারপতি নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখেন যে, বিজন বিবির কন্যা আবজান বিবি বিবাহের পর তার স্বামীর বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। তার পুত্র এবং নাতি (বাদী) কেউই বিজন বিবির বসতবাড়িতে অবিভক্ত পরিবারের সদস্য হিসেবে বসবাস করতেন না। যেহেতু আবজান বিবি বিবাহের মাধ্যমে পিতৃগৃহের পরিবারের বসবাস ছেড়েছেন, সেহেতু তিনি এবং তার ওয়ারিশরা আইনত পিতৃগৃহের “অবিভক্ত পরিবারের” সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন না। আর যেহেতু তারা ওই পরিবারের সদস্য নন, তাই তারা বহিরাগতদের বসতবাড়িতে প্রবেশে বাধা দেওয়ার জন্য ৪ ধারার ‘অগ্রক্রয়াধিকার’ (Pre-emption) প্রয়োগ করতে পারবেন না।
ঐতিহাসিক রায়ের আলোকে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নজির
আব্দুল গনি মামলার রায়ে হাইকোর্ট আরও কিছু পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত নজিরের (Precedents) উল্লেখ করেছেন, যা এই আইনি নীতিটিকে আরও মজবুত করেছে।
- খোন্দকার বেলায়েত হোসেন বনাম আয়েশা সিদ্দিকা (১৩ ডিএলআর ২৩০ / 13 D.L.R. 230): এই মামলায় সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় যে, বাটোয়ারা আইনের ৪ ধারার সুবিধা পেতে হলে দাবিদারকে শুধু মালিক হলেই চলবে না, তাকে অবশ্যই ওই অবিভক্ত পরিবারের একজন আবাসিক সদস্য হতে হবে।
- চৌধুরী মোহাম্মদ ইসমাইল খান বনাম মোসাম্মাত আমিরজান (১৯৫ আই.সি. ৫০৪ / 195 I.C. 504): এই ঐতিহাসিক রায়ে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, “A female member of an undivided family who marries and goes to live in her husband’s house prima facie gives up her intention of continuing to reside in her old house and so she is prima facie no longer a member of the family…” অর্থাৎ, একটি অবিভক্ত পরিবারের কোনো নারী সদস্য যখন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তার স্বামীর বাড়িতে বসবাস করতে চলে যান, তখন প্রাথমিকভাবে ধরে নেওয়া হয় যে, তিনি তার পুরোনো পৈতৃক বাড়িতে বসবাসের ইচ্ছা ত্যাগ করেছেন। ফলে তিনি আর সেই পরিবারের সদস্য থাকেন না এবং বাটোয়ারা আইনের ৪ ধারার সুবিধা পাওয়ার অযোগ্য হয়ে যান।
মালিকানা (Title/Ownership) বনাম অগ্রাধিকার (Right of Pre-emption): বিভ্রান্তি দূরীকরণ
এতক্ষণ আমরা যা আলোচনা করলাম, তার ভিত্তিতে সাধারণ মানুষ যে ভুলটি করেন তা হলো— তারা ‘মালিকানা হারানো’ এবং ‘৪ ধারার সুবিধা হারানো’-কে এক করে ফেলেন। এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা আইনি বিষয়।
মালিকানা (Ownership): আপনি উত্তরাধিকার সূত্রে যা পেয়েছেন, তা আপনার নিজস্ব সম্পত্তি। বিবাহিত কন্যা হিসেবে আপনি বসতভিটার নির্দিষ্ট অংশের নিরঙ্কুশ মালিক। এই মালিকানা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। আপনি চাইলে আপনার অংশ বিক্রি করতে পারবেন, দান করতে পারবেন, হেবা করতে পারবেন অথবা ভাইদের বিরুদ্ধে বাটোয়ারা মামলা করে নিজের অংশ সীমানা দিয়ে আলাদা (Physical partition/Saham) করে নিতে পারবেন।
৪ ধারার সুবিধা বা অগ্রাধিকার (Pre-emption): এটি হলো একটি বিশেষ আইনি ক্ষমতা, যা দিয়ে আপনি অন্য কাউকে (বহিরাগতকে) সম্পত্তি কেনা থেকে আটকে নিজে সেই সম্পত্তি কিনে নিতে পারেন। যেহেতু আপনি বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে স্থায়ী, তাই পৈতৃক বাড়িতে বাইরের লোক ঢুকলে আপনার ব্যক্তিগত প্রাইভেসিতে বা প্রতিদিনের জীবনযাত্রায় কোনো ব্যাঘাত ঘটে না। তাই আইন আপনাকে এই বিশেষ ‘আটকানোর ক্ষমতা’ বা ৪ ধারার সুবিধাটি দেয় না।
উদাহরণস্বরূপ: রহিম সাহেবের ১ ছেলে (করিম) ও ১ মেয়ে (ফাতেমা) আছে। ফাতেমার বিয়ে হয়ে গেছে অন্য গ্রামে। রহিম সাহেব মারা যাওয়ার পর, ফাতেমা তার বসতভিটার অংশের মালিক। এখন করিম যদি তার অংশ বাইরের লোক জব্বার মিয়ার কাছে বিক্রি করে দেয়, তবে জব্বার মিয়া এসে বসতবাড়িতে ভাগ বসাতে চাইলে, ফাতেমা আদালতে গিয়ে বলতে পারবে না যে “আমি জব্বার মিয়াকে ঢুকতে দেব না, আমি করিমের অংশ কিনে নেব।” কারণ ফাতেমা ওই বাড়ির আবাসিক সদস্য নয়।
বিপরীতক্রমে, ফাতেমা যদি তার অংশ জব্বার মিয়ার কাছে বিক্রি করে দেয় এবং জব্বার মিয়া বাটোয়ারা মামলা করে বাড়িতে ঢুকতে চায়, তখন করিম (যেহেতু সে অবিভক্ত পরিবারের সদস্য হিসেবে ওই বাড়িতেই বসবাস করছে) ৪ ধারা প্রয়োগ করে জব্বার মিয়াকে হটিয়ে দিয়ে ফাতেমার বিক্রি করা অংশ নিজেই কিনে নিতে পারবে। এটাই আইনের মূল নির্যাস।
বিশেষ পরিস্থিতি: যদি বিবাহিত কন্যা ফিরে আসেন?
আইন সবসময় অন্ধভাবে চলে না, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে। যদি এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে কন্যা বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও স্বামীর বাড়িতে স্থায়ী হননি, বরং স্বামীসহ পিতার বাড়িতেই একত্রে বসবাস করছেন (ঘরজামাই হিসেবে)। অথবা কোনো দুর্ভাগ্যজনক কারণে বিধবা হয়ে বা বিবাহ বিচ্ছেদের শিকার হয়ে মেয়েটি স্থায়ীভাবে পিতার বাড়িতে ফিরে এসেছেন এবং ভাইদের সাথে একই অবিভক্ত পরিবারের সদস্য হিসেবে বসবাস শুরু করেছেন।
এই ধরনের পরিস্থিতিতে, মেয়েটি আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারবেন যে তার ‘Animus revertendi’ (ফিরে আসার ও বসবাসের ইচ্ছা) বিদ্যমান এবং তিনি পুনরায় পিতৃগৃহের অবিভক্ত পরিবারের একজন অবিচ্ছেদ্য অংশ। পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ (Evidence of residence, utility bills, ration cards, local witness) দেখাতে পারলে আদালত তাকেও ৪ ধারার সুবিধা প্রদান করতে পারেন। কারণ আইনের উদ্দেশ্য পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষা দেওয়া, তা লিঙ্গভেদে নয়, বরং বাসস্থানের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে।
সমাজে এই ভুল ব্যাখ্যার নেতিবাচক প্রভাব ও আইনজীবীদের ভূমিকা
এই আইনি জটিলতার সুযোগ নিয়ে অনেক অসাধু ব্যক্তি বা অনেক সময় ভাইয়েরা বোনদের সম্পত্তি থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত করার পাঁয়তারা করেন। গ্রাম্য সালিশে মাতব্বররা ৩৪ ডিএলআর ২৪৫ এর ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে রায় দেন যে, “যেহেতু মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, হাইকোর্টের রায় আছে মেয়েরা আর বসতভিটা পাবে না। তাই মেয়েদের টাকা দিয়ে বিদায় করে দাও, কিংবা তারা শুধু আবাদি জমির ভাগ পাবে।” এটি একটি চরম মিথ্যাচার এবং প্রতারণা।
একজন সচেতন নাগরিক এবং আইনজীবীর দায়িত্ব হলো এই বিষয়গুলো পরিষ্কার করা। বাটোয়ারা মামলা (Partition Suit) ড্রাফট করার সময় আইনজীবীদের অত্যন্ত সতর্ক হতে হয়। কে কোন দাগে কতটুকু পজেশনে (Possession) আছে, কে পরিবারের সদস্য আর কে সদস্য নয়, বসতভিটার চরিত্রটি কেমন— এই বিষয়গুলো আরজিতে (Plaint) এবং লিখিত জবাবে (Written Statement) সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হয়। অন্যথায় মামলার রায় এক পক্ষের জন্য চরম ক্ষতিকর হতে পারে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
- প্রশ্ন ১: বাবার বসতভিটায় বিবাহিত মেয়ের কি কোনো অধিকার নেই?
উত্তর: অবশ্যই আছে। মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী বাবার সম্পত্তিতে (তা বসতভিটা হোক বা আবাদি জমি) বিবাহিত ও অবিবাহিত সব মেয়েরই সুনির্দিষ্ট আইনি অধিকার ও মালিকানা রয়েছে। - প্রশ্ন ২: ভাইয়েরা যদি বসতভিটার অংশ বোনকে না দিতে চায়, তবে বোনের করণীয় কী?
উত্তর: বোন সরাসরি দেওয়ানি আদালতে ‘বাটোয়ারা বা বণ্টন মামলা’ (Partition Suit) দায়ের করতে পারবেন। আদালত আমিন কমিশনের মাধ্যমে সম্পত্তির পরিমাপ করে বোনের প্রাপ্য অংশ (সাহাম) আলাদা করে বুঝিয়ে দেবেন। - প্রশ্ন ৩: অবিবাহিত কন্যারা কি ৪ ধারার সুবিধা পাবে?
উত্তর: হ্যাঁ। অবিবাহিত কন্যারা যেহেতু পিতার বাড়িতেই বসবাস করেন এবং অবিভক্ত পরিবারের সদস্য, তাই তারা বাটোয়ারা আইনের ৪ ধারার সম্পূর্ণ সুবিধা পাবেন। বহিরাগত কেউ সম্পত্তিতে প্রবেশ করতে চাইলে তারা তা প্রিয়েম্পট (Pre-empt) করতে পারবেন। - প্রশ্ন ৪: বাটোয়ারা আইনের ৪ ধারা কি মেয়েদের প্রতি বৈষম্যমূলক?
উত্তর: আপাতদৃষ্টিতে মনে হলেও আসলে তা নয়। আইন এখানে নারী-পুরুষের মধ্যে পার্থক্য করেনি, পার্থক্য করেছে ‘বাসিন্দার’ (Resident) আর ‘অ-বাসিন্দার’ (Non-resident) মধ্যে। একজন পুরুষ (ভাই) যদি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্য কোথাও স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন, তবে কিছু ক্ষেত্রে তিনিও ৪ ধারার অধিকার হারাতে পারেন। আইনের মূল ফোকাস হলো ‘Undivided Family’ বা বসবাসরত যৌথ পরিবারের প্রাইভেসি রক্ষা করা।
উপসংহার
পরিশেষে, “মেয়েরা বসতভিটার সম্পত্তি পায় না” এটি একটি চরম আইনি ভ্রান্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। বাংলাদেশের আইন অনুসারে নারীরা তাদের পিতার রেখে যাওয়া বসতভিটার নিরঙ্কুশ ও বৈধ উত্তরাধিকারী। বাটোয়ারা আইনের ৪ ধারা এবং আব্দুল গনি বনাম আসিফাদৌল্লা (৩৪ ডিএলআর ২৪৫) মামলাটি মূলত বসতভিটায় বহিরাগতদের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং বসবাসকারী সদস্যদের গোপনীয়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রণীত হয়েছে; উত্তরাধিকার খর্ব করার জন্য নয়।
সম্পত্তি বণ্টন একটি অত্যন্ত কারিগরি ও জটিল আইনি প্রক্রিয়া। বিশেষ করে বসতভিটার বাটোয়ারা নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলে আবেগতাড়িত না হয়ে বা গ্রাম্য ভুল সালিশের ওপর নির্ভর না করে অভিজ্ঞ দেওয়ানি আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত। সঠিক আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমেই কেবল নিজের অধিকার সুনিশ্চিত করা এবং পারিবারিক শান্তি বজায় রাখা সম্ভব।
