স্ত্রীর দেনমোহর ও সন্তানের খোরপোষ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ | হাইকোর্ট

স্ত্রীর দেনমোহর ও সন্তানের খোরপোষ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

সারসংক্ষেপ: পারিবারিক আদালতে স্ত্রীর দেনমোহর (Dower) এবং সন্তানের খোরপোষের (Maintenance) ডিক্রি হওয়ার পর, স্বামীর আর্থিক অসচ্ছলতা প্রমাণিত হলে হাইকোর্ট ন্যায়বিচারের স্বার্থে ডিক্রিকৃত সম্পূর্ণ টাকা একত্রে দেওয়ার পরিবর্তে সুবিধাজনক কিস্তিতে (Installments) পরিশোধের নির্দেশ দিতে পারেন।

বিচারপতি: মো: রিয়াজ উদ্দিন খান, হাইকোর্ট বিভাগ

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, পারিবারিক আদালতের মামলায় স্বামীর দেনমোহর ও খোরপোষ দেওয়ার দায়বদ্ধতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে স্বামী যদি পেশায় দিনমজুর বা স্বল্প আয়ের মানুষ হন, তবে তাকে কিস্তিতে টাকা পরিশোধের মানবিক সুযোগ দেওয়া আদালতের জন্য আইনসম্মত।

১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা

মামলাটি পঞ্চগড় জেলার একটি দেনমোহর ও খোরপোষ আদায়ের পারিবারিক মামলা।

  • বাদীর দাবি: স্ত্রী এবং তার নাবালিকা কন্যা পারিবারিক আদালতে স্বামী (বিবাদীর) বিরুদ্ধে দেনমোহর এবং খোরপোষ আদায়ের মামলা করেন।
  • বিবাদীর দাবি: স্বামী বিবাদী আদালতে জানান যে তিনি স্ত্রীকে ইতিমধ্যে তালাক দিয়েছেন। তবে বিচারিক আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে স্ত্রী ও কন্যার পক্ষে দেনমোহর ও খোরপোষের ডিক্রি জারি করেন।

২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে

  • বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০২৪): পঞ্চগড় সদরের পারিবারিক আদালত স্বামী বিবাদীকে ৫ লক্ষ ৭২ হাজার ২০১ টাকা এবং নাবালিকা কন্যার জন্য মাসিক ৩,০০০ টাকা খোরপোষ দেওয়ার ডিক্রি প্রদান করেন।
  • আপিল আদালত (Appellate Court – ২০২৫): স্বামী জেলা জজ আদালতে আপিল করেন। কিন্তু শুনানির দিন তার আইনজীবী উপস্থিত না থাকায় আদালত আপিলটি খারিজ করে বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন। এরপর স্বামী হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন।

৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ

হাইকোর্টে রিভিশন শুনানিকালে স্বামী বিবাদীর আইনজীবী অত্যন্ত সততার সাথে স্বীকার করেন যে, স্ত্রী ও কন্যার দেনমোহর এবং খোরপোষ দেওয়ার আইনি দায়বদ্ধতা তিনি অস্বীকার করছেন না এবং তিনি নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আইনি তর্কও করবেন না। তবে তিনি আদালতের কাছে একটি মানবিক আবেদন রাখেন:

  • আর্থিক অক্ষমতা ও কিস্তির সুবিধা: আইনজীবী জানান, স্বামী একজন দিনমজুর এবং তার আয় খুবই সামান্য, অনেক সময় তিনি বাবার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। তাই এতগুলো টাকা একসাথে দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। তিনি কিস্তিতে পরিশোধের আবেদন করেন।
  • বাদীর সম্মতি: স্ত্রী পক্ষের আইনজীবীও মানবিক দিকটি বিবেচনা করে কিস্তিতে টাকা নিতে সম্মতি প্রকাশ করেন।

৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট স্বামী বিবাদীর (আবেদনকারী) আবেদনটি গ্রহণ করে নিচের মানবিক ও আইনি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:

  • স্বামীকে দেনমোহর ও বকেয়া খোরপোষ বাবদ ডিক্রিকৃত ৫,৭২,২০১ টাকা পরিশোধ করতে হবে। যেহেতু তিনি হাইকোর্টের নির্দেশে আগেই ৫০,০০০ টাকা জমা দিয়েছেন, তাই বাকি ৫,২২,২০১ টাকা আগামী ১ (এক) বছরের মধ্যে ৫টি কিস্তিতে পরিশোধ করবেন।
  • নাবালিকা কন্যার বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত তাকে প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা করে খোরপোষ চালিয়ে যেতে হবে।
  • কিস্তির টাকা বা খোরপোষ দিতে ব্যর্থ হলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে (অর্থাৎ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে)।

মামলার শিরোনাম: মো: রাকিব হাসান বনাম মোছা: সুমাইয়া আক্তার সুমি ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ২৩৭৮ / ২০২৫
রায় প্রদানের তারিখ: ২ মার্চ ২০২৬

Related Articles

Back to top button