জাল দাখিলা ও অস্পষ্ট সীমানায় জমির স্বত্ব ঘোষণার মামলা খারিজ: হাইকোর্ট

জাল দাখিলা ও অস্পষ্ট সীমানায় জমির স্বত্ব ঘোষণার মামলা খারিজ: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

সারসংক্ষেপ: বাদীর দাখিলকৃত খাজনার রসিদ (দাখিলা) জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি প্রমাণিত হলে এবং আর্জিতে জমির সুনির্দিষ্ট সীমানা চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হলে স্বত্ব ঘোষণার মামলা খারিজযোগ্য। এছাড়া, নিম্ন আদালতের যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্তকে সুস্পষ্ট কারণ ছাড়া বাতিল করা আপিল আদালতের জন্য দেওয়ানী কার্যবিধির ৪১ আদেশের ৩১ বিধির লঙ্ঘন।

বিচারপতি: মো: আলী রেজা, হাইকোর্ট বিভাগ

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, স্বত্ব ঘোষণার মামলায় বাদীকে অবশ্যই তার নিজের প্রমাণের ভিত্তিতে মালিকানা দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে হবে (Evidence Act, Section 101)। জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা খাজনার রসিদ এবং জমির অস্পষ্ট বিবরণ দিয়ে ডিক্রি পাওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই। একইসঙ্গে আদালত জানিয়েছেন, সরকার বা বিবাদীর নামে থাকা নিবন্ধিত দলিল (Registered Deeds) সুনির্দিষ্টভাবে বাতিলের আবেদন না করে শুধু স্বত্ব ঘোষণার মামলা টেকসই হয় না।

১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা

মামলাটি লক্ষ্মীপুর জেলার নদীভাঙন এবং পুনরায় জেগে ওঠা (Alluvion and Diluvion) জমির মালিকানা সংক্রান্ত একটি স্বত্ব ঘোষণার মামলা (Title Suit)।

  • বাদীর দাবি: মূল মালিক ‘মনগাজী’-এর কাছ থেকে তার ছেলে মৌখিক দানপত্র এবং সিএস খতিয়ানের ভিত্তিতে জমির মালিক হয়। পরবর্তীতে জমিটি নদীগর্ভে বিলীন হলেও পুনরায় জেগে ওঠে এবং তারা সেখানে বসতবাড়ি করে ভোগদখলে আছেন।
  • বিবাদীর (সরকার ও অন্যান্য) দাবি: জমিটি ২০ বছরেরও বেশি সময় নদীর গর্ভে থাকায় তা সরকারের ১নং খাস খতিয়ানভুক্ত হয়। পরবর্তীতে সরকার (১নং বিবাদী) ওই জমি স্থানীয়দের কাছে ইজারা (Registered Kabuliyats) দিয়েছে। বাদীর কোনো মালিকানা বা দখল নেই।

২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে

  • বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০০০): বিচারিক আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে দেখতে পায় যে, বাদীর দাখিল করা খাজনার রসিদগুলো ভুয়া এবং জমির সীমানা অস্পষ্ট। তাই আদালত বাদীর মামলাটি খারিজ করে দেয়।
  • আপিল আদালত (Appellate Court – ২০০৯): আপিল আদালত বিচারিক আদালতের দেওয়া যুক্তিসঙ্গত ফাইন্ডিংসগুলো যথাযথভাবে খণ্ডন না করেই বাদীর পক্ষে রায় দিয়ে দেয় (মামলা ডিক্রি করে)। ফলে বিবাদীপক্ষ হাইকোর্টে রিভিশন মামলা দায়ের করে।

৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি ত্রুটি

হাইকোর্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে আপিল আদালতের রায়ে এবং বাদীর দাবিতে বড় ধরনের আইনি ত্রুটি ও জালিয়াতি খুঁজে পান:

  • দাখিলা বা খাজনার রসিদ জালিয়াতি: বাদীপক্ষ আদালতে ২৭ বছরের খাজনা দেওয়ার ৬টি রসিদ দাখিল করে। হাইকোর্ট অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন, ২৭ বছর ধরে লেখা সবগুলো রসিদ একই কালি, একই কলম এবং হুবহু একই হাতের লেখায় তৈরি, যা পুরোপুরি অসম্ভব। তাছাড়া, ১৩৫৬ বঙ্গাব্দে ‘এডুকেশন সেস’ (Education Cess) চালু হলেও রসিদগুলোতে এর কোনো ঘর বা উল্লেখ ছিল না। হাইকোর্ট স্পষ্ট জানান, এগুলো আদালতের সাথে প্রতারণা করে তৈরি করা জালিয়াতির দলিল।
  • অস্পষ্ট জমির বিবরণ (Order 7 Rule 3 of CPC): দেওয়ানী কার্যবিধির ৭ আদেশের ৩ বিধি অনুযায়ী আর্জিতে জমির সুস্পষ্ট বিবরণ থাকতে হবে। কিন্তু এই মামলায় দাবি করা জমির পরিমাণ ও সীমানা চরম অস্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর ছিল।
  • বিবাদীর দলিল চ্যালেঞ্জ না করা: সরকার অন্য বিবাদীদের যে ইজারা দলিল দিয়েছে, বাদী তা আর্জি সংশোধন করে বাতিল চায়নি। এটি বাদীর স্বত্ব দাবির পথে একটি বড় আইনি বাধা।
  • আপিল আদালতের ব্যর্থতা (Order 41 Rule 31 of CPC): আপিল আদালত নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তগুলো বাতিল করার ক্ষেত্রে আইনি যুক্তি বা স্বাধীন বিশ্লেষণ দেখায়নি, যা ৪১ আদেশের ৩১ বিধির লঙ্ঘন।

৪. উচ্চ আদালত কী সিদ্ধান্ত নিল?

হাইকোর্ট বিবাদীদের রিভিশন আবেদনগুলো অ্যাবসলিউট (Absolute) বা মঞ্জুর করেছেন এবং নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:

  • অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের দেওয়া ২০০৯ সালের আপিলের রায়টি বাতিল (Set aside) করা হলো।
  • সাবঅর্ডিনেট জজ (বিচারিক আদালত) আদালতের দেওয়া ২০০০ সালের মামলা খারিজের মূল রায়টি বহাল (Affirmed) করা হলো। অর্থাৎ বাদীর স্বত্ব ঘোষণার মামলাটি চূড়ান্তভাবে খারিজ।

মামলার শিরোনাম: মো: শাহজাহান ও অন্যান্য বনাম নূর নবী ও অন্যান্য (এবং বাংলাদেশ সরকার বনাম মো: শাহজাহান ও অন্যান্য)।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ২৮৩৬ / ২০০৯ এবং ৪১৯৫ / ২০০৯
রায় প্রদানের তারিখ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬

Related Articles

Back to top button