অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশে মেরিটের বিচার না হলে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ | সুপ্রিম কোর্ট

অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশে মেরিটের বিচার না হলে আপিল আদালতের মনগড়া পর্যবেক্ষণ বেআইনি: সুপ্রিম কোর্ট
সারসংক্ষেপ: বিচারিক আদালত যদি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার (Temporary Injunction) আবেদনটি গুণাগুণে (Merit) বিচার না করেই শুধু শুনানিতে অনুপস্থিতি বা সময় চাওয়ার কারণে খারিজ করে দেয়, তবে আপিল আদালত সেই আদেশের ওপর ভিত্তি করে স্বত্ব বা দখলের বিষয়ে মনগড়া পর্যবেক্ষণ দিতে পারে না। উভয় পক্ষের পাল্টা দাবির ক্ষেত্রে হাইকোর্ট ন্যায়বিচারের স্বার্থে কেবল ‘দখলের’ (Possession) ওপর স্থিতাবস্থা (Status-quo) বজায় রাখার নির্দেশ দিতে পারে।
বিচারপতি: মো: রিয়াজ উদ্দিন খান, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, বিচারিক আদালত কোনো আদেশের মেরিট বা মূল বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা না করলে, আপিল আদালতের সে বিষয়ে মন্তব্য করাটা ‘বিচারিক মনের প্রয়োগহীনতা’ (Non-application of judicial mind)। জমির স্বত্ব ও দখলের জটিল প্রশ্নগুলো বিচারিক আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমেই চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা
মামলাটি শরীয়তপুর জেলার ১৩ শতাংশ জমির স্বত্ব ঘোষণা ও অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার (Temporary Injunction) মামলা।
- বাদীর দাবি: আর.এস (RS) খতিয়ান মূলে তারা জমির মালিক। বিবাদীরা যেন জমিতে নতুন কোনো বিল্ডিং বা স্থাপনা করতে না পারে, জমির প্রকৃতির পরিবর্তন করতে না পারে এবং তাদের দখলচ্যুত করতে না পারে— সেজন্য তারা অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেন।
- বিবাদীর দাবি: বিবাদীদের দাবি, আর.এস রেকর্ড ভুল। তাদের নামে সর্বশেষ বি.আর.এস (BRS) খতিয়ান রয়েছে এবং তারা ১৯৭৪ সাল থেকে বাউন্ডারি ওয়াল ও ঘর তুলে শান্তিতে ভোগদখলে আছেন।
২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে
- বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০২২): শরীয়তপুরের সিনিয়র সহকারী জজ আদালত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদনের ওপর গুণাগুণ (Merit) বিচার করেনি। শুনানির দিন বাদীপক্ষ সময়ের আবেদন করলে আদালত তা নামঞ্জুর করে এবং আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে দেয়।
- আপিল আদালত (Appellate Court – ২০২৩): জেলা জজ আদালত বিচারিক আদালতের রায়টি বহাল রেখে বাদীর আপিল খারিজ করে। তবে আদালত তার রায়ে মনগড়া পর্যবেক্ষণ দেয় যে, বাদী তার স্বত্ব প্রমাণ করতে পারেনি, জমি বিবাদীদের রেকর্ডে আছে এবং বিবাদীদের ব্যালেন্স অফ কনভেনিয়েন্স (Balance of convenience) বেশি। এরপর বাদীপক্ষ হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন।
৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ
হাইকোর্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে আপিল আদালতের রায়ে সুস্পষ্ট আইনি ত্রুটি খুঁজে পান:
- আপিল আদালতের বিচারিক ভুল: হাইকোর্ট জানান, বিচারিক আদালত নিষেধাজ্ঞার আবেদনটি মেরিটে বিচারই করেনি, শুধু শুনানি না হওয়ায় খারিজ করেছিল। কিন্তু আপিল আদালত এটি খেয়াল না করেই স্বত্ব, দখল ও ব্যালেন্স অফ কনভেনিয়েন্স নিয়ে মন্তব্য করেছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
- পরস্পরবিরোধী দাবি ও সাক্ষ্য গ্রহণ: বাদী ও বিবাদী উভয়েই একে অপরের রেকর্ড অব রাইটসকে (RS বনাম BRS) ভুল দাবি করেছে। তাছাড়া জমিতে কেবল বাউন্ডারি ওয়াল আছে নাকি বিল্ডিংয়ের কাজ চলছে, এ নিয়েও পরস্পরবিরোধী তথ্য রয়েছে। স্বত্ব ও দখলের এই বিষয়গুলো বিচারিক আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণের আগে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট উভয় পক্ষের ন্যায়বিচারের স্বার্থে নিচের নির্দেশ দিয়ে রুলটি নিষ্পত্তি (Disposed of) করেছেন:
- হাইকোর্ট জমির অবস্থার (Position) ওপর থেকে স্থিতাবস্থা তুলে নিয়েছেন। তবে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জমির দখলের (Possession) ওপর স্থিতাবস্থা (Status-quo) বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। (অর্থাৎ বিবাদীরা জমিতে থাকলেও তারা বাদীকে উচ্ছেদ করতে পারবে না)।
- বিচারিক আদালতকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোনো ধরনের অপ্রয়োজনীয় মুলতবি (Adjournment) ছাড়াই যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে মূল মামলাটি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করা হয়।
মামলার শিরোনাম: আওরঙ্গজেব পালোয়ান ও অন্যান্য বনাম সিরাজ পালোয়ান ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ২৯৬৫ / ২০২৩
রায় প্রদানের তারিখ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬
