অমুসলিম ক্রেতার বিরুদ্ধে মুসলিম আইনের অগ্রক্রয় (Pre-emption) চলে না: হাইকোর্ট

অমুসলিম ক্রেতার বিরুদ্ধে মুসলিম আইনের অগ্রক্রয় (Pre-emption) অচল: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
সারসংক্ষেপ: মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (Muslim Personal Law) অনুযায়ী ‘সংলগ্ন ভূমির মালিক’ (Shafi-e-Jar) হিসেবে অগ্রক্রয় বা প্রি-এমপশনের দাবি শুধুমাত্র তখনই করা যাবে যখন বিক্রেতা এবং ক্রেতা উভয়ই মুসলিম হবেন। যদি জমির ক্রেতা হিন্দু বা অমুসলিম হন, তবে তার ওপর মুসলিম ব্যক্তিগত আইন প্রয়োগ করে তার খরিদ করা সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া যায় না। এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির অধিকারের পরিপন্থী।
বিচারপতি: মো: রিয়াজ উদ্দিন খান, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, মুসলিম আইন একটি ব্যক্তিগত আইন (Personal Law)। কোনো অমুসলিম বা হিন্দু ক্রেতা যেহেতু দৈনন্দিন জীবনে মুসলিম আইন পালন করেন না, তাই তার অর্জিত সম্পত্তির অধিকার এই আইনের মাধ্যমে খর্ব করা যায় না। অগ্রক্রয়প্রার্থী চাইলে রাষ্ট্রীয় সংবিধিবদ্ধ আইন (যেমন: SAT Act-এর ৯৬ ধারা) ব্যবহার করতে পারেন, কিন্তু অমুসলিমের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আইন প্রয়োগের সুযোগ নেই।
১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা
মামলাটি রাজশাহী জেলার ০.০৬১৩ একর জমি নিয়ে দায়ের করা একটি মুসলিম আইনের অগ্রক্রয় (Pre-emption) মামলা।
- বাদীর দাবি: বাদী (মুসলিম) নিজেকে সংলগ্ন ভূমির মালিক (Shafi-e-Jar) দাবি করে মুসলিম আইনে অগ্রক্রয় মামলা করেন। বিক্রেতা মুসলিম হলেও জমির ৭ জন ক্রেতার মধ্যে ৫ জনই ছিলেন হিন্দু।
- বিবাদীর দাবি: বিবাদীপক্ষ (ক্রেতাগণ) দাবি করেন যে, যেহেতু তারা হিন্দু, তাই তাদের বিরুদ্ধে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন প্রয়োগ করে অগ্রক্রয় মামলা চলতে পারে না। তারা দেওয়ানী কার্যবিধির ৭ আদেশের ১১ বিধি অনুযায়ী আরজি খারিজের আবেদন করেন।
২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে
- বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০২২): রাজশাহীর সিনিয়র সহকারী জজ আদালত আরজি খারিজ করে দেন। আদালত জানায়, হিন্দু ক্রেতাদের বিরুদ্ধে মুসলিম আইনের অগ্রক্রয় রক্ষণীয় নয়।
- আপিল আদালত (Appellate Court – ২০২৪): অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন এবং জানান যে, ৭৩ ডিএলআর ৩৯৫ মামলার নজির অনুযায়ী এই মামলা চলতে পারে না। এরপর বাদীপক্ষ হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন।
৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিক
হাইকোর্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে নিম্নোক্ত বৈপ্লবিক পর্যবেক্ষণগুলো প্রদান করেন:
- অমুসলিমের ওপর ব্যক্তিগত আইন নয়: হাইকোর্ট ৬৭ ডিএলআর ৩০২ (অনিল কুমার পোদ্দার বনাম মোস্তফা ইউনুস) মামলার নজির টেনে বলেন, মোগল আমলে মুসলিম আইন এদেশের রাষ্ট্রীয় আইন ছিল বলে তখন সবার ওপর তা প্রযোজ্য হতো। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে ব্যক্তিগত আইন শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। একজন হিন্দু ক্রেতার বিরুদ্ধে মুসলিম আইনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
- সংবিধান ও ধর্মীয় স্বাধীনতা: সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের নিজস্ব ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে। একজনের ব্যক্তিগত আইন অন্য ধর্মের নাগরিকের অধিকারকে খর্ব করতে পারে না।
- ‘Mohammadan’ বনাম ‘Muslim’ শব্দ ব্যবহার: বিচারপতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকে আইন ও বইপত্রে মুসলিমদের ‘Mohammadan’ (মোহাম্মাদান) বলা হতো, যা ভুল। মুসলিমরা মহানবী (সা.)-এর উপাসক নয়, বরং ইসলামের অনুসারী। ১৯৭৩ সালের পর থেকে বাংলাদেশের ১৮টি আইনে ‘Mohammadan’ শব্দ পরিবর্তন করে ‘Muslim’ করা হয়েছে। তাই ভবিষ্যৎ রায়ে ও লেখায় ‘Mohammadan Law’-এর পরিবর্তে **’Muslim Law’** ব্যবহারের নির্দেশনা দেন তিনি।
৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট বাদীপক্ষের (আবেদনকারী) রিভিশন আবেদনটি খারিজ (Discharged) করেছেন এবং নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:
- অতিরিক্ত জেলা জজ (আপিল আদালত) আদালতের দেওয়া ২০২৪ সালের মামলা খারিজের রায়টি বহাল (Affirmed) করা হলো।
- অমুসলিম ক্রেতাদের বিরুদ্ধে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে দায়ের করা অগ্রক্রয় মামলাটি আইনত অচল হিসেবে গণ্য হবে।
মামলার শিরোনাম: মোছা: রিজিয়া খাতুন ওরফে রিজিয়া ইসলাম বনাম মোছা: দুলারি খাতুন ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ৬৬৫৬ / ২০২৪
রায় প্রদানের তারিখ: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬

