অগ্রক্রয় মামলায় আরজি সংশোধন করে ‘সংলগ্ন ভূমির মালিক’ দাবি বৈধ | হাইকোর্ট

অগ্রক্রয় (Pre-emption) মামলায় আরজি সংশোধন করে ‘সংলগ্ন ভূমির মালিক’ দাবি করা বৈধ: সুপ্রিম কোর্ট

সারসংক্ষেপ: অগ্রক্রয় বা প্রি-এমপশন মামলায় প্রথমে ‘উত্তরাধিকার সূত্রে শরিক’ হিসেবে দাবি করার পর, আপিল পর্যায়ে আরজি সংশোধন করে ‘সংলগ্ন ভূমির মালিক’ (Contiguous landowner) হিসেবে দাবি করা বেআইনি নয়। আরজি সংশোধনের আদেশ মঞ্জুর হলে তা মূল মামলা দায়েরের তারিখ থেকে কার্যকর (Relate back) হয়, ফলে তামাদি আইনের (Limitation) কোনো বাধা থাকে না।

বিচারপতি: মো: রিয়াজ উদ্দিন খান, হাইকোর্ট বিভাগ

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, আপিল আদালত যদি বাতিল হয়ে যাওয়া কোনো আইনি নজিরের (Overruled precedent) ওপর ভিত্তি করে রায় প্রদান করে এবং আরজি সংশোধনের আইনি ফলাফল বুঝতে ভুল করে, তবে তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নজির অনুযায়ী অগ্রক্রয় মামলায় নতুন করে সংলগ্ন ভূমির মালিক দাবি করতে আইনি কোনো বাধা নেই।

১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা

মামলাটি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া এলাকার একটি অগ্রক্রয় (Pre-emption) মামলা।

  • বাদীর দাবি (প্রি-এমপ্টর): বাদী প্রথমে নিজেকে উত্তরাধিকার সূত্রে খতিয়ানের শরিক দাবি করে অগ্রক্রয় মামলাটি দায়ের করেন।
  • বিবাদীর দাবি (প্রি-এমপ্টী): বিবাদী আপত্তি জানিয়ে বলেন যে, বি.এস (B.S) খতিয়ানে বাদী বা তার পূর্বসূরির কোনো নাম নেই, তাই তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে শরিক নন এবং মামলা করতে পারেন না।

২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে

  • বিচারিক আদালত (Trial Court – ১৯৯৬): বি.এস খতিয়ানে নাম না থাকার কারণে সিনিয়র সহকারী জজ আদালত বাদীর অগ্রক্রয় মামলাটি খারিজ করে দেন।
  • আপিল আদালত (Appellate Court – ২০০৬): বাদী আপিল করেন এবং আপিল চলাকালে দেওয়ানী কার্যবিধির ৬ আদেশের ১৭ বিধি অনুযায়ী আরজি সংশোধন করে নিজেকে ‘সংলগ্ন ভূমির মালিক’ হিসেবে দাবি করেন। আদালত আরজি সংশোধনটি মঞ্জুরও করেন। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, চূড়ান্ত রায়ে যুগ্ম জেলা জজ আদালত আপিলটি খারিজ করে দেন। আপিল আদালত ৩৮ ডিএলআর ২০৬ এর একটি নজির টেনে বলেন যে, মূল মামলায় সংলগ্ন ভূমির মালিক দাবি না করে পরবর্তীতে আরজি সংশোধন করে এই দাবি করা যায় না। এরপর বাদী হাইকোর্টে রিভিশন মামলা দায়ের করেন।

৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ

হাইকোর্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে আপিল আদালতের রায়ে সুস্পষ্ট আইনি ত্রুটি খুঁজে পান:

  • আপিল আদালতের ভুল নজির প্রয়োগ: হাইকোর্ট জানান, আপিল আদালত ৩৮ ডিএলআর ২০৬ এর যে নজির টেনেছে তা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ৪২ ডিএলআর (এডি) ১১০ [Sree Shushil Ranjan Dutto -Vs- Al-Haj Moulvi Idris Mia] মামলায় বাতিল করেছে। আপিল বিভাগ স্পষ্ট করেছে যে, উত্তরাধিকার সূত্রে শরিক হিসেবে দাবি করার পাশাপাশি ‘সংলগ্ন ভূমির মালিক’ হিসেবে আরজি সংশোধন করে দাবি করতে কোনো বাধা নেই।
  • তামাদি বা সময়সীমার বাধা (Limitation): ১৯৭৯ বিএসসিআর ১৩৫ মামলার নজির অনুযায়ী, আরজি সংশোধন মঞ্জুর হলে তা মূল মামলা দায়েরের দিন থেকেই কার্যকর হয়েছে বলে ধরা হয় (Relate back)। যেহেতু মূল অগ্রক্রয় মামলাটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই দায়ের হয়েছিল, তাই সংশোধিত দাবি তামাদি দোষে দুষ্ট হবে না।
  • আপিল আদালতের অমনোযোগিতা: আপিল আদালত নিজেই আরজি সংশোধনের আবেদন মঞ্জুর করেছিলেন, কিন্তু রায়ে ভুলবশত উল্লেখ করেছেন যে আবেদনটি শুধু নথিতে রাখা হয়েছে। এটি বিচারিক মনের প্রয়োগহীনতা।

৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

যেহেতু আপিল পর্যায়ে আরজি সংশোধন মঞ্জুর হওয়ার পর নতুন দাবির (সংলগ্ন ভূমির মালিক) ওপর কোনো সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়নি, তাই হাইকোর্ট নিচের সিদ্ধান্তগুলো প্রদান করেন:

  • বাদীর (আবেদনকারী) রুলটি অ্যাবসলিউট (Absolute) বা মঞ্জুর করা হলো।
  • যুগ্ম জেলা জজ (আপিল আদালত) আদালতের দেওয়া ২০০৬ সালের রায়টি বাতিল (Set aside) করা হলো।
  • মামলাটি পুনরায় বিচারের জন্য আপিল আদালতে রিমান্ডে (Remand) পাঠানো হলো। আপিল আদালতকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আবেদনকারী প্রকৃতপক্ষেই ‘সংলগ্ন ভূমির মালিক’ কি না, সে বিষয়ে উভয় পক্ষকে নতুন করে অতিরিক্ত সাক্ষ্য (Additional Evidence) দেওয়ার সুযোগ দিয়ে দ্রুত আপিলটি নিষ্পত্তি করতে হবে।

মামলার শিরোনাম: মোহাম্মদ জাকারিয়া বনাম মোস্তাফিজুর রহমান ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ৫৯০ / ২০০৭
রায় প্রদানের তারিখ: ৮ অক্টোবর ২০২০

Related Articles

Back to top button