সময় পার হওয়ায় স্কুলের নির্বাচন সংক্রান্ত মামলা অকার্যকর (Infructuous) | হাইকোর্ট

সময় পার হওয়ায় স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন সংক্রান্ত মামলা অকার্যকর (Infructuous): হাইকোর্ট
সারসংক্ষেপ: স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদ ২ বছর। নির্বাচন ও ভোটার তালিকা নিয়ে দায়ের করা কোনো মামলা বিচারাধীন অবস্থায় যদি দীর্ঘ সময় (যেমন ৫ বছর) অতিবাহিত হয়ে যায় এবং বাদীদের সন্তানরা আর ওই স্কুলের শিক্ষার্থী না থাকে, তবে মামলার কারণ (Cause of Action) বিলুপ্ত বা অকার্যকর (Infructuous) হয়ে যায়। এ অবস্থায় আদালত যৌক্তিক কারণে মামলাটি নিষ্পত্তি করে দেন।
বিচারপতি: মো: রিয়াজ উদ্দিন খান, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, সময়ের ব্যবধানে যদি কোনো মামলার প্রাসঙ্গিকতা বা মূল কারণটিই হারিয়ে যায়, তবে সেই মামলাটি আর চালিয়ে নেওয়ার কোনো অর্থ হয় না। আইনি পরিভাষায় একে ‘Infructuous’ বা অকার্যকর বলা হয়।
১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা
মামলাটি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের কাইকেরটেক নবাব হাবিবুল্লাহ হাই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির নির্বাচন সংক্রান্ত।
- বাদীর দাবি: বাদীরা নিজেদের অভিভাবক ও ভোটার দাবি করে বলেন যে, স্কুলের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় জালিয়াতি করা হয়েছে। অনেকের নাম দুবার এসেছে এবং যাদের সন্তান স্কুলে পড়ে না তাদেরও ভোটার করা হয়েছে। তারা এই ভোটার তালিকা বাতিল এবং নির্বাচনের ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (Temporary Injunction) চেয়ে ২০১৫ সালে দেওয়ানী মামলা (Title Suit) দায়ের করেন।
- বিবাদীর দাবি: স্কুল কর্তৃপক্ষ (বিবাদী) দাবি করে যে, বাদীদের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন এবং নির্বাচন বানচাল করার জন্যই এই মামলা করা হয়েছে।
২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে
- বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০১৫): সোনারগাঁয়ের সহকারী জজ আদালত ২ জুলাই ২০১৫ তারিখে বাদীদের আবেদন মঞ্জুর করে ৬ জুলাই (নির্ধারিত নির্বাচনের দিন) পর্যন্ত অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
- আপিল আদালত (Appellate Court – ২০১৫): স্কুল কর্তৃপক্ষ জেলা জজ আদালতে আপিল করলে আদালত তা খারিজ করে দেন। আদালত বলেন, ভোটার তালিকায় ভুল থাকলে তা সংশোধনের জন্য হাতে সময় ছিল। তাই নিম্ন আদালতের নিষেধাজ্ঞায় হস্তক্ষেপ করা হয়নি। এরপর স্কুল কর্তৃপক্ষ হাইকোর্টে রিভিশন মামলা দায়ের করেন।
৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ
২০২০ সালে হাইকোর্টে মামলাটির শুনানিকালে কোনো পক্ষ উপস্থিত ছিল না। তবে হাইকোর্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে অত্যন্ত যৌক্তিক কিছু বিষয় তুলে ধরেন:
- সময়ের ব্যবধান ও কমিটির মেয়াদ: হাইকোর্ট জানান, ২০১৫ সালের ৬ জুলাই নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হাইকোর্টে শুনানি হচ্ছে ২০২০ সালে (৫ বছর পর)। আইন অনুযায়ী ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদ থাকে ২ বছর। এই ৫ বছরে অন্তত দুবার নতুন কমিটি হওয়ার কথা এবং নতুন করে হালনাগাদ ভোটার তালিকা তৈরি হওয়ার কথা।
- বাদীদের যোগ্যতা হারানো: ২০১৫ সালে বাদীদের সন্তানরা ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণিতে পড়ত। ৫ বছর পর স্বাভাবিকভাবেই তারা আর ওই স্কুলের শিক্ষার্থী নেই। ফলে বাদীরা এখন আর আইন অনুযায়ী ‘অভিভাবক ভোটার’ হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না।
- মামলা অকার্যকর (Infructuous): সময়ের পরিবর্তনের কারণে যে নির্বাচন ও ভোটার তালিকার ওপর নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছিল, বাস্তবে সেটির আর কোনো অস্তিত্ব নেই। এই মামলার মূল কারণ বা ‘Cause of action’ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
যেহেতু মামলার প্রাসঙ্গিকতা শেষ হয়ে গেছে, তাই হাইকোর্ট নিচের সিদ্ধান্তগুলো প্রদান করেন:
- মামলাটি অকার্যকর (Infructuous) হয়ে যাওয়ায় রুলটি নিষ্পত্তি (Disposed of) করা হলো।
- বিচারিক আদালতকে নির্দেশ দেওয়া হলো, হাইকোর্টের এই পর্যবেক্ষণের আলোকে ২০১৫ সালের মূল মামলাটিও (Title Suit No. 141 of 2015) অকার্যকর হিসেবে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করে দিতে।
মামলার শিরোনাম: কাইকেরটেক নবাব হাবিবুল্লাহ হাই স্কুল বনাম ফরিদ মিয়া ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ২২৬৭ / ২০১৫
রায় প্রদানের তারিখ: ৭ অক্টোবর ২০২০
