লিখিত জবাব দাখিল ছাড়া Order 9 Rule 13A তে একতরফা ডিক্রি রদ বেআইনি | হাইকোর্ট

লিখিত জবাব দাখিল না করলে ৯ আদেশের ১৩ক বিধিতে একতরফা ডিক্রি রদ করা যায় না: সুপ্রিম কোর্ট
সারসংক্ষেপ: দেওয়ানী কার্যবিধির ৯ আদেশের ১৩ক (Order IX, Rule 13A of CPC) বিধি একটি বিশেষ বিধান, যার মাধ্যমে অনূর্ধ্ব ৩,০০০ টাকা খরচার (Cost) বিনিময়ে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই একতরফা ডিক্রি রদ করা যায়। কিন্তু এই বিধানটি শুধুমাত্র সেই বিবাদীদের জন্য প্রযোজ্য, যারা এর আগে আদালতে উপস্থিত হয়েছিলেন এবং ‘লিখিত জবাব’ (Written Statement) দাখিল করেছিলেন। যারা কখনো আদালতে উপস্থিত হননি বা জবাব দেননি, তারা এই বিধির সুবিধা পাবেন না।
বিচারপতি: মো: রিয়াজ উদ্দিন খান, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, আইনজীবীর ভুলের কারণে দেওয়ানী কার্যবিধির ভুল বিধানে আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করতে পারে না। বিবাদী যদি লিখিত জবাব দাখিল না করেই একতরফা ডিক্রির শিকার হন, তবে তাকে ৯ আদেশের ১৩ক বিধির বদলে ৯ আদেশের ১৩ বিধিতে (Order IX, Rule 13) উপযুক্ত কারণ দর্শিয়ে অথবা অন্য কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় প্রতিকার চাইতে হবে।
১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা
মামলাটি কিশোরগঞ্জ সদরের একটি বাটোয়ারা (Partition) মামলা।
- বাদীর মামলা ও একতরফা ডিক্রি: বাদী বাটোয়ারা মামলা করার পর ১ ও ২নং বিবাদী (বর্তমান আবেদনকারীদের পূর্বসূরি) আদালতে উপস্থিত হননি এবং কোনো লিখিত জবাব (Written Statement) দাখিল করেননি। ফলে আদালত তাদের বিরুদ্ধে একতরফা (Ex-parte) ডিক্রি প্রদান করেন।
- বিবাদীর আবেদন: পরবর্তীতে ১নং বিবাদীর ওয়ারিশরা এই একতরফা ডিক্রি বাতিলের জন্য দেওয়ানী কার্যবিধির ৯ আদেশের ১৩ক বিধিতে (Order IX, Rule 13A) একটি আবেদন করেন।
২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে
- বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০১৬): কিশোরগঞ্জের সিনিয়র সহকারী জজ আদালত বিবাদীদের আবেদনটি গ্রহণ করেন এবং ৩,০০০ টাকা খরচা (Cost) দেওয়ার শর্তে একতরফা ডিক্রি বাতিল করে মামলাটি পুনরায় চালুর আদেশ দেন।
- রিভিশন আদালত (Revisional Court – ২০১৭): বিচারিক আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে বাদী রিভিশন দায়ের করেন। অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত শুনানি শেষে বিচারিক আদালতের আদেশটি বাতিল করে দেন। আদালত জানান, যেহেতু বিবাদীরা লিখিত জবাব দেয়নি, তাই ৯ আদেশের ১৩ক বিধিতে তাদের আবেদন করার আইনি কোনো সুযোগ নেই। এরপর বিবাদীরা হাইকোর্টে রিভিশন করেন।
৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ
হাইকোর্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের রায় সম্পূর্ণ সঠিক বলে মত দেন এবং নিম্নোক্ত আইনি বিষয়গুলো স্পষ্ট করেন:
- আইনের সুস্পষ্ট বিধান: হাইকোর্ট ৯ আদেশের ১৩ক বিধির প্রথম শর্তাংশ (Proviso) তুলে ধরে বলেন, এই বিধিতে একতরফা ডিক্রি রদ করতে হলে বিবাদীকে অবশ্যই ডিক্রি হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে হলফনামা (Affidavit) সহকারে আবেদন করতে হবে এবং এটি কেবল সেই বিবাদী করতে পারবেন যিনি “উপস্থিত হয়ে লিখিত জবাব দাখিল করেছেন” (by the defendant who appeared and filed written statement)।
- বিবাদীর আইনি ত্রুটি: এই মামলায় বিবাদীরা কখনোই আদালতে উপস্থিত হয়ে লিখিত জবাব দেননি। উপরন্তু তাদের আবেদনে কোনো হলফনামাও ছিল না, ছিল কেবল একটি সত্যপাঠ (Verification)। তাই বিচারিক আদালত আইন অমান্য করে এই আবেদন মঞ্জুর করেছিল। হাইকোর্টে বিবাদীর আইনজীবী ভুল স্বীকার করেন এবং জানান যে আবেদনটি মূলত ৯ আদেশের ১৩ বিধিতে করা উচিত ছিল।
৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
যেহেতু বিবাদীদের আবেদনটি ভুল বিধানে করা হয়েছিল, তাই হাইকোর্ট নিচের সিদ্ধান্তগুলো প্রদান করেন:
- বিবাদীপক্ষের (আবেদনকারী) রুলটি খারিজ (Discharged) করা হলো।
- অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের দেওয়া ২০১৭ সালের রিভিশন মঞ্জুরের রায়টি বহাল রাখা হলো (অর্থাৎ একতরফা ডিক্রিটিই বহাল রইল)।
- তবে হাইকোর্ট বিবাদীদের এই মর্মে স্বাধীনতা দিয়েছেন যে, তারা দেওয়ানী কার্যবিধির অধীনে থাকা অন্যান্য আইনগত প্রতিকার (যেমন- উপযুক্ত বিধিতে পুনরায় আবেদন বা আপিল) গ্রহণ করতে পারবেন।
মামলার শিরোনাম: মো: মাসুদ মিয়া ওরফে মাসুদ করিম ও অন্যান্য বনাম শৈলেন্দ্র চন্দ্র মোদক।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ৩৩৫৪ / ২০১৭
রায় প্রদানের তারিখ: ৬ জানুয়ারি ২০১৯
