ভুলে ভরা কমিশনার রিপোর্ট ও অস্পষ্ট সীমানায় বাটোয়ারা মামলা খারিজ | সুপ্রিম কোর্ট

ভুলে ভরা কমিশনার রিপোর্ট ও অস্পষ্ট সীমানায় বাটোয়ারা মামলা খারিজ: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
সারসংক্ষেপ: আধুনিক রেকর্ড অব রাইটস (এস.এ, আর.এস, বি.এস) এবং নিবন্ধিত দলিল (Registered Deeds) উপেক্ষা করে কেবল মোগল আমলের ‘থাক’ বা ‘ওয়াজিব-উল-আরজ’ এর ওপর ভিত্তি করে অ্যাডভোকেট কমিশনারের দেওয়া প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া দেওয়ানী কার্যবিধির ৭ আদেশের ৩ বিধি অনুযায়ী আর্জিতে জমির সুনির্দিষ্ট সীমানা না থাকলে আদালত বাটোয়ারা ডিক্রি দিতে পারে না।
বিচারপতি: মো: বশির উল্লাহ, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, অ্যাডভোকেট কমিশনারের প্রতিবেদন কোনো চূড়ান্ত বা অকাট্য প্রমাণ (Sacrosanct) নয়। এটি কেবল একটি সাক্ষ্য মাত্র, যা অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের সাথে মিলিয়ে দেখতে হয়। এছাড়া, সর্বশেষ খতিয়ান সবসময় পূর্ববর্তী খতিয়ানের চেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাবে এবং সুনির্দিষ্ট সীমানা উল্লেখ ছাড়া কোনো বাটোয়ারা মামলার রায় কার্যকর (Executable) করা সম্ভব নয়।
১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা
মামলাটি হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর এলাকার একটি জমি বাটোয়ারা এবং দলিল বাতিলের মামলা।
- বাদীর দাবি: বাদীপক্ষ দাবি করে যে, তারা মূল মালিক লক্ষ্মী নারায়ণ সাহার উত্তরাধিকারী হিসেবে সম্পত্তির অর্ধেক অংশের মালিক। কিন্তু বিবাদীরা তাদের অংশ বুঝিয়ে না দিয়ে ভুল খতিয়ান তৈরি করেছে এবং কিছু জমি বিক্রি করে দিয়েছে। তাই তারা বাটোয়ারা এবং বিবাদীদের দলিলগুলো বাতিলের মামলা করে।
- বিবাদীর দাবি: বিবাদীপক্ষ দাবি করে যে, এই জমির মূল মালিকানা তারা বৈধ নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে কিনেছেন এবং এস.এ, আর.এস ও বি.এস খতিয়ান তাদের নামে রয়েছে। বাদীপক্ষ জমির মালিক নয়, বরং তারা বিবাদীদের জমিতে মাসিক ৫০০ টাকা ভাড়ায় বসবাসকারী ভাড়াটিয়া।
২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে
- বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০১৭): বিচারিক আদালত মূলত একজন অ্যাডভোকেট কমিশনারের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বাদীর পক্ষে মামলাটি ডিক্রি করে দেয় এবং বাটোয়ারার নির্দেশ দেয়।
- আপিল আদালত (Appellate Court – ২০২১): বিবাদীরা আপিল করলে আপিল আদালত নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে মামলা খারিজ করে দেয়। আদালত দেখতে পায় যে, কমিশনার আধুনিক দলিলপত্র না দেখে শুধু সেকেলে নথির ওপর ভিত্তি করে একপেশে রিপোর্ট দিয়েছিলেন। এরপর বাদীপক্ষ হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করে।
৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ
হাইকোর্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে আপিল আদালতের রায় সঠিক বলে মত দেন এবং বিচারিক আদালতের বেশ কিছু আইনি ত্রুটি তুলে ধরেন:
- ত্রুটিপূর্ণ কমিশনার রিপোর্ট: অ্যাডভোকেট কমিশনার তার তদন্তে আধুনিক সি.এস বা সুজি (Suzi) ম্যাপ এবং সীমানা পিলার ব্যবহার করেননি। তিনি শুধুমাত্র বাদীর দেওয়া মোগল আমলের পুরনো ‘থাক’ (Thak) ও ‘ওয়াজিব-উল-আরজ’ নথির ওপর ভিত্তি করে রিপোর্ট দিয়েছেন। হাইকোর্ট জানান, বিবাদীদের নিবন্ধিত দলিল এবং আধুনিক রেকর্ড বাদ দিয়ে এমন রিপোর্টের ভিত্তিতে মালিকানা নির্ধারণ বেআইনি।
- সর্বশেষ রেকর্ডের প্রাধান্য: এস.এ (S.A.), আর.এস (R.S.) এবং বি.এস (B.S.)—এই তিনটি জরিপেই বিবাদীদের নাম সঠিকভাবে রেকর্ড করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী শক্তিশালী বিপরীত প্রমাণ না থাকলে সর্বশেষ রেকর্ড অব রাইটস প্রাধান্য পাবে।
- নিবন্ধিত দলিলের অকাট্যতা: সাক্ষ্য আইন এবং রেজিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী, নিবন্ধিত দলিল (Registered Document) জেনুইন বা খাঁটি হওয়ার শক্তিশালী অনুমান বহন করে। কেবল মৌখিক দাবির ভিত্তিতে এগুলো বাতিল করা যায় না।
- অস্পষ্ট সীমানা (Order 7 Rule 3 of CPC): বাদীর আর্জির তফসিলে জমির কোনো সুনির্দিষ্ট সীমানা (Boundary) দেওয়া ছিল না। সীমানা ছাড়া অশনাক্তযোগ্য জমির ওপর আদালত কোনো কার্যকর ডিক্রি দিতে পারে না।
- ভাড়াটিয়া প্রমাণিত: সাক্ষীদের জবানবন্দি থেকে হাইকোর্ট দেখতে পান যে, বাদীপক্ষ প্রকৃতপক্ষে বিবাদীদের জায়গায় মাসিক ৫০০ টাকা ভাড়ায় বসবাসকারী ভাড়াটিয়া। ভাড়াটিয়া কখনো মালিকানা বা বাটোয়ারা দাবি করতে পারে না।
৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট বাদীপক্ষের রিভিশন আবেদনটি খারিজ (Discharged) করেছেন এবং নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:
- যুগ্ম জেলা জজ (আপিল আদালত) আদালতের দেওয়া ২০২১ সালের মামলা খারিজের রায়টি বহাল (Affirmed) করা হলো।
- সহকারী জজ (বিচারিক আদালত) আদালতের দেওয়া ২০১৭ সালের মূল রায়টি বাতিল (Set aside) করা হলো। অর্থাৎ বাদীর বাটোয়ারা ও দলিল বাতিলের মামলাটি চূড়ান্তভাবে খারিজ।
মামলার শিরোনাম: সমর চন্দ্র সাহা বনাম শ্রী সুদান চন্দ্র সাহা ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ২৭০ / ২০২২
রায় প্রদানের তারিখ: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫
