সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া ৭২৫ দিন দেরিতে আপিল গ্রহণযোগ্য নয় | হাইকোর্ট

সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া ‘অসুস্থতার’ অজুহাতে ৭২৫ দিন দেরিতে আপিল গ্রহণযোগ্য নয়: সুপ্রিম কোর্ট

সারসংক্ষেপ: তামাদি আইনের (Limitation Act) ৫ ধারা অনুযায়ী আপিল দায়েরের বিলম্ব মওকুফ (Condonation of delay) করার ক্ষেত্রে আদালত সাধারণত উদার দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট তারিখ, হাসপাতালের নাম বা ডাক্তারি সনদ ছাড়া ঢালাওভাবে শুধু এক লাইনে ‘অসুস্থতার’ কারণ দেখিয়ে ৭২৫ দিনের দীর্ঘ বিলম্ব (Inordinate delay) মওকুফ করা যায় না। এ ধরনের ক্ষেত্রে আপিল খারিজ করা সম্পূর্ণ আইনসম্মত।

বিচারপতি: মো: রিয়াজ উদ্দিন খান, হাইকোর্ট বিভাগ

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের নজির [AIR 1987 (SC) 1353] অনুযায়ী বিলম্ব মওকুফের ক্ষেত্রে খুব বেশি যান্ত্রিক বা কড়াকড়ি (Pedantic approach) না করে বাস্তবসম্মত ও উদার হওয়া উচিত। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, দীর্ঘ ৭২৫ দিনের বিলম্বের ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা ডাক্তারি কাগজপত্র ছাড়াই কেবল মুখে অসুস্থতার কথা বললে তা আদালত গ্রহণ করবে।

১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা

মামলাটি ঢাকার একটি সম্পত্তির ওপর স্থিতাবস্থা (Status-quo) বজায় রাখা সংক্রান্ত।

  • বাদীর আবেদন: মামলাটি ২০১০ সালে দায়ের করা হয়। ২০২৩ সালে এসে বাদীপক্ষ সম্পত্তির হস্তান্তর ঠেকাতে বিবাদীদের ওপর স্থিতাবস্থার (Status-quo) আদেশ চেয়ে বিচারিক আদালতে আবেদন করে।
  • বিবাদীর পদক্ষেপ: বিচারিক আদালত বাদীর পক্ষে স্থিতাবস্থা মঞ্জুর করার দীর্ঘ ৭২৫ দিন পর ১০নং বিবাদী জেলা জজ আদালতে আপিল দায়ের করেন। এত দেরিতে আপিল করার কারণ হিসেবে তামাদি আইনের ৫ ধারার আবেদনে তিনি মাত্র এক লাইনে উল্লেখ করেন যে, ‘অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকায়’ দেরি হয়েছে।

২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে

  • বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০২৩): ঢাকার তৃতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালত ২০২৩ সালের ২৩ জানুয়ারি বিবাদীদের ওপর জমিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন।
  • আপিল আদালত (Appellate Court – ২০২৫): ১০নং বিবাদী ৭২৫ দিন পর আপিল করলে, সিনিয়র জেলা জজ আদালত দেখতে পান যে, বিলম্বের কারণ হিসেবে দেওয়া ব্যাখ্যাটি একেবারেই অসন্তোষজনক। ফলে আদালত বিলম্ব মওকুফের আবেদন নামঞ্জুর করে আপিলটি সরাসরি খারিজ (Summarily dismissed) করে দেন। এরপর বিবাদী হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন।

৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ

হাইকোর্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে আপিল আদালতের রায় সম্পূর্ণ সঠিক বলে মত দেন এবং নিম্নোক্ত আইনি বিষয়গুলো স্পষ্ট করেন:

  • বিলম্বের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা: হাইকোর্ট জানান, ৭২৫ দিনের বিলম্ব একটি অস্বাভাবিক দীর্ঘ সময়। তামাদি আইনে প্রতিটি দিনের বিলম্বের ব্যাখ্যা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেখানে ঠিক কবে অসুস্থ হয়েছিলেন, কোন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, ডাক্তারের নাম কী এবং এর সপক্ষে কোনো ডাক্তারি সনদ না দিয়ে কেবল অবহেলার সাথে এক লাইনে ‘অসুস্থ’ দাবি করা আইনের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য।
  • উদার দৃষ্টিভঙ্গির অপব্যবহার: আদালত ন্যায়বিচারের স্বার্থে ছোটখাটো বিলম্ব মওকুফ করে থাকে। কিন্তু বিবাদী বিচারিক আদালতে উপস্থিত থেকে মামলা লড়ার পরও আপিল করতে ৭২৫ দিন দেরি করেছে, যা আদালতের উদারতার সুযোগ নেওয়ার শামিল। আপিল আদালত সঠিক কারণেই এই আবেদন বাতিল করেছে।

৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট বিবাদীপক্ষের (আবেদনকারী) রিভিশন আবেদনটির ওপর নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:

  • আবেদনকারীর রুলটি খারিজ (Discharged) করা হলো।
  • সিনিয়র জেলা জজ (আপিল আদালত) আদালতের দেওয়া আপিল খারিজের আদেশটি বহাল (Affirmed) করা হলো।
  • মামলাটি ২০১০ সাল থেকে বিচারাধীন থাকায় বিচারিক আদালতকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কোনো ধরনের অপ্রয়োজনীয় মুলতবি (Adjournment) ছাড়া আগামী ৬ (ছয়) মাসের মধ্যে মূল মামলাটি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে।

মামলার শিরোনাম: মো: নাসির উদ্দিন বনাম শাহাব আহসান ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ৬৮১ / ২০২৫
রায় প্রদানের তারিখ: ২ মার্চ ২০২৬

Related Articles

Back to top button