মৃত ব্যক্তির শুধু কন্যা ও ভাই থাকলে সম্পত্তির বণ্টন: সুপ্রিম কোর্টের রায়

মৃত ব্যক্তির শুধু কন্যা ও ভাই থাকলে সম্পত্তির বণ্টন কীভাবে হবে: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

সারসংক্ষেপ: মুসলিম উত্তরাধিকার আইন (ফারায়েজ) অনুযায়ী কোনো মৃত ব্যক্তির যদি পুত্রসন্তান না থাকে এবং শুধুমাত্র ২ কন্যা ও ১ ভাই থাকে, তবে কন্যারা মোট সম্পত্তির দুই-তৃতীয়াংশ (২/৩) পাবে এবং অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ (১/৩) ভাই ‘আসাবা’ (Residuary) বা অবশিষ্টাংশভোগী হিসেবে পাবে। বিচারিক আদালত ফারায়েজের এই নিয়মে ভুল করলে আপিল আদালত তা সংশোধনের জন্য মামলা রিমান্ডে পাঠাতে পারে।

বিচারপতি: মো: জিয়াউল হক, হাইকোর্ট বিভাগ

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, মুসলিম ফারায়েজ আইন পবিত্র কোরআনের ঐশী নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। সূরা আন-নিসার ১১, ১২ এবং ১৭৬ নম্বর আয়াতে উত্তরাধিকারীদের অংশ সুনির্দিষ্ট করা আছে। এর বাইরে গিয়ে কোনো আদালত নিজের খেয়ালখুশিমতো সম্পত্তির ভাগাভাগি বা ‘সাহাম’ নির্ধারণ করতে পারে না।

১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা

মামলাটি ঝালকাঠি জেলার কামদেবপুর মৌজার একটি পৈতৃক সম্পত্তির বাটোয়ারা সংক্রান্ত।

  • মূল বিরোধ: সম্পত্তির মূল মালিক ছিলেন দুই ভাই— আকরাম আলী এবং একরাম আলী। একরাম আলী মারা যাওয়ার সময় কোনো পুত্রসন্তান রেখে যাননি, শুধু ২ কন্যা (যার মধ্যে একজন মামলার বাদী) এবং ভাই আকরাম আলীকে রেখে যান।
  • বাদীর দাবি: বাদী (একরাম আলীর কন্যা) দাবি করেন যে, তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তির বড় অংশের মালিক। তিনি বিবাদীদের কাছে বাটোয়ারা চাইলে তারা তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
  • বিবাদীর দাবি: বিবাদীরা (আকরাম আলীর ওয়ারিশগণ) দাবি করেন, একরাম আলী মারা যাওয়ার পর তার ২ কন্যা ২/৩ অংশ পেয়েছে এবং একরাম আলীর ভাই হিসেবে আকরাম আলী অবশিষ্টাংশভোগী (আসাবা) হিসেবে ১/৩ অংশ পেয়েছেন। সুতরাং, বাদী সম্পূর্ণ সম্পত্তির দাবিদার হতে পারেন না।

২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে

  • বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০০৭): যুগ্ম জেলা জজ আদালত মামলার রায়ে চরম একটি আইনি ভুল করে। আদালত বলে যে, একরাম আলীর মৃত্যুর পর তার ভাই আকরাম আলী কোনো সম্পত্তি পাবে না; বরং দুই কন্যাই সব সম্পত্তির মালিক হবে। এই যুক্তিতে আদালত বাদীর পক্ষে মামলা ডিক্রি করে দেয়।
  • আপিল আদালত (Appellate Court – ২০১১): বিবাদীরা আপিল করলে অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত বিচারিক আদালতের এই মারাত্মক আইনি ভুলটি (ফারায়েজের ভুল) ধরতে পারে। আপিল আদালত বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করে মামলাটি পুনরায় সঠিকভাবে ফারায়েজ অনুযায়ী বিচারের জন্য রিমান্ডে (Remand) পাঠায়। এরপর বাদীপক্ষ হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করে।

৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ

হাইকোর্ট নথিপত্র এবং সাক্ষ্য পর্যালোচনা করে আপিল আদালতের রায় সম্পূর্ণ সঠিক বলে মত দেন এবং বিচারিক আদালতের ভুল ধরিয়ে দেন:

  • বিচারিক আদালতের অজ্ঞতা: বিচারিক আদালত তার রায়ে বলেছিল, ভাইয়ের মৃত্যুর পর অন্য ভাই কোনো সম্পত্তি পায় না। হাইকোর্ট জানান, এটি মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী একটি রায়।
  • পবিত্র কোরআনের বিধান: হাইকোর্ট পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নিসার সুস্পষ্ট বিধান উল্লেখ করে বলেন, মৃত ব্যক্তির যদি কোনো পুত্র না থাকে এবং একাধিক কন্যা থাকে, তবে কন্যারা পাবে সম্পত্তির ২/৩ (দুই-তৃতীয়াংশ)। আর বাকি ১/৩ (এক-তৃতীয়াংশ) ভাই ‘আসাবা’ বা অবশিষ্টাংশভোগী হিসেবে পাবে।
  • সঠিক ফারায়েজ: এই মামলায় একরাম আলীর ২ কন্যা পাবে ২/৩ অংশ (প্রত্যেকে ১/৩ করে) এবং তার ভাই আকরাম আলী পাবে অবশিষ্ট ১/৩ অংশ। স্থানীয় চেয়ারম্যানও সাক্ষ্য দেওয়ার সময় এই সঠিক ভাগাভাগির কথাই উল্লেখ করেছিলেন, যা বিচারিক আদালত এড়িয়ে গেছে।

৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট বাদীপক্ষের রিভিশন আবেদনটি খারিজ (Discharged) করেছেন এবং নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:

  • অতিরিক্ত জেলা জজ (আপিল আদালত) আদালতের দেওয়া ২০১১ সালের রিমান্ডের রায়টি বহাল (Upheld) করা হলো। অর্থাৎ, মামলাটি পুনরায় বিচারিক আদালতে চলবে।
  • বিচারিক আদালতকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ফারায়েজের সঠিক নিয়ম অনুসরণ করে আগামী ৬ (ছয়) মাসের মধ্যে মামলাটি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে। প্রয়োজনে পক্ষগণ নতুন করে সাক্ষ্য দিতে পারবেন।

মামলার শিরোনাম: ফারুক হোসেন ও অন্যান্য বনাম জাহিদা বেগম ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ২৮৩৬ / ২০১১
রায় প্রদানের তারিখ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫

Related Articles

Back to top button