অর্পিত বা দেবোত্তর সম্পত্তিতে চুক্তি প্রবলের ডিক্রি অকার্যকর | হাইকোর্ট

সারসংক্ষেপ: ‘অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১’-এর ১৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো জমি যদি অর্পিত সম্পত্তির ‘ক’ তফসিলে (Ka list) গেজেটভুক্ত হয়, তবে ওই জমির বিষয়ে চলমান যেকোনো মামলা ও কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল (Abated) হয়ে যাবে। এছাড়া, দেবোত্তর সম্পত্তির ভুয়া হস্তান্তরের ওপর ভিত্তি করে পাওয়া ‘চুক্তি প্রবলের’ (Specific Performance) একতরফা ডিক্রি এবং তার জারি (Execution) মামলা সম্পূর্ণ বেআইনি ও আইনের দৃষ্টিতে অকার্যকর (Non est)।

বিচারপতি: মো: ভীষ্মদেব চক্রবর্তী এবং মুরাদ-এ-মওলা সোহেল, হাইকোর্ট বিভাগ

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, প্রতারণামূলক বা ভুয়া দলিলের মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তির ওপর ভিত্তি করে চুক্তি প্রবলের ডিক্রি আদায় করলেও তা দিয়ে অর্পিত বা দেবোত্তর সম্পত্তি গ্রাস করা যাবে না। অর্পিত সম্পত্তি আইনের বিধান অনুযায়ী এই ধরনের ডিক্রি জারির কার্যক্রম চলার কোনো আইনি সুযোগ নেই।

১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা

মামলাটি ঢাকার মিটফোর্ড রোডের একটি জমির ‘চুক্তি প্রবল’ ডিক্রি এবং এর জারি (Execution) মামলা সংক্রান্ত।

  • চুক্তি প্রবলের ডিক্রি: ফজলুল হক নামের এক ব্যক্তি নুরুল ইসলাম নামক এক বিক্রেতার বিরুদ্ধে চুক্তি প্রবলের মামলা করে ১৯৯৪ সালে একতরফা ডিক্রি (Ex-parte decree) পান। ২০০৬ সালে তিনি ওই ডিক্রি বাস্তবায়নের জন্য ডিক্রি জারির (Execution Case No. 02 of 2006) মামলা করেন।
  • মালিকানার জালিয়াতি (দেবোত্তর সম্পত্তি): নুরুল ইসলাম যার কাছ থেকে জমি কিনেছিলেন (জাহানারা খাতুন), তিনি ১৯৭১ সালে এক দেবোত্তর সম্পত্তির সেবাইত (Sebayet)-এর সাথে ভুয়া এওয়াজ বা বিনিময় দলিলের মাধ্যমে মালিকানা দাবি করেছিলেন। আপিল বিভাগের এক রায়ে (সিভিল আপিল ১৮৩/২০০৯) ওই এওয়াজ দলিলটি ভুয়া প্রমাণিত হয় এবং জমিটি ‘দেবোত্তর সম্পত্তি’ হিসেবে সাব্যস্ত হয়।
  • অর্পিত সম্পত্তি ঘোষণা: পরবর্তীতে, ২০১২ সালে সরকার উক্ত জমিটিকে ‘অর্পিত সম্পত্তি’ (Vested Property) হিসেবে ‘ক’ তফসিলে গেজেটভুক্ত করে। ডিক্রিদার ফজলুল হকের স্ত্রী এই গেজেটের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে মামলা করলেও তা খারিজ হয়ে যায়।

২. নিম্ন আদালত যা বলেছে

  • বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০১২): ডিক্রি জারির মামলায় বর্তমান রিভিশনকারী এবং সরকারপক্ষ দেওয়ানী কার্যবিধির ২১ আদেশের ৫৮ বিধি অনুযায়ী সম্পত্তিটি অবমুক্ত করার জন্য মিস কেস (Misc Case) দায়ের করে। কিন্তু ঢাকার ৩য় যুগ্ম জেলা জজ আদালত তা রক্ষণীয় নয় বলে সরাসরি খারিজ করে দেন। এর বিরুদ্ধে রিভিশনকারী এবং সরকারপক্ষ পৃথকভাবে হাইকোর্টে দুটি রিভিশন দায়ের করেন।

৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ

হাইকোর্ট নথিপত্র এবং পূর্ববর্তী আদালতের রায়গুলো পর্যালোচনা করে নিম্ন আদালতের আদেশে ত্রুটি খুঁজে পান এবং নিম্নোক্ত আইনি বিষয়গুলো স্পষ্ট করেন:

  • ভুয়া দলিলের ওপর ডিক্রি অচল: হাইকোর্ট জানান, আপিল বিভাগের রায় অনুযায়ী জমির মূল বিক্রেতারই কোনো বৈধ স্বত্ব ছিল না (যেহেতু জমিটি দেবোত্তর ছিল এবং সেবাইত বেআইনিভাবে তা হস্তান্তর করেছিলেন)। ফলে, সেই অবৈধ মালিকানার ওপর ভিত্তি করে পাওয়া চুক্তি প্রবলের ডিক্রি এবং তার জারি (Execution) মামলা কোনোভাবেই চলতে পারে না।
  • অর্পিত সম্পত্তি আইনের ১৩ ধারা: জমিটি বর্তমানে অর্পিত সম্পত্তির ‘ক’ তফসিলভুক্ত এবং এর নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে। ‘অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন, ২০০১’-এর ১৩ ধারা অনুযায়ী, ‘ক’ তফসিলভুক্ত জমির ওপর কোনো ডিক্রি বা তার জারি কার্যক্রম চলতে পারে না, তা আইনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল (Abated) হয়ে যাবে।
  • হাইকোর্টের নজির: হাইকোর্ট ১৪ এমএলআর (এডি) ২১৮ মামলার নজির উল্লেখ করে জানান, অর্পিত সম্পত্তি বা শত্রু সম্পত্তির ওপর চুক্তি প্রবলের মামলা রক্ষণীয় নয় এবং এমন সম্পত্তির ওপর দেওয়া ডিক্রি আইনের দৃষ্টিতে কোনো ডিক্রিই নয়।

৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

উভয় পক্ষের শুনানি শেষে হাইকোর্ট নিচের যুগান্তকারী সিদ্ধান্তগুলো প্রদান করেন:

  • রিভিশন দুটি নিষ্পত্তি (Disposed of) করা হলো।
  • ঢাকার ৩য় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে বিচারাধীন ডিক্রি জারির মামলা (Execution Case No.02 of 2006) এবং যে ডিক্রির ওপর ভিত্তি করে তা দায়ের হয়েছিল, তা আইনের দৃষ্টিতে অকার্যকর (Non est) এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল (Abated) বলে ঘোষণা করা হলো।

মামলার শিরোনাম: মো: মোতাহার হোসেন (মৃত) ও তার ওয়ারিশগণ বনাম মো: ফজলুল হক (মৃত) ও তার ওয়ারিশগণ; এবং বাংলাদেশ সরকার বনাম মো: ফজলুল হক (মৃত) ও তার ওয়ারিশগণ।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ২০৪৯ / ২০১২ এবং ৩৩৫৯ / ২০১৪
রায় প্রদানের তারিখ: ১১ ডিসেম্বর ২০২৫

Related Articles

Back to top button