শর্তযুক্ত দানপত্রের শর্তভঙ্গে জমির মালিকানা ফেরত | হাইকোর্ট

সারসংক্ষেপ: কোনো সম্পত্তি যদি নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহারের শর্তে (যেমন: স্থানীয়দের খাওয়ার পানির জন্য পুকুর খনন) দান বা হস্তান্তর করা হয় এবং দলিলে শর্ত থাকে যে উদ্দেশ্য ব্যাহত হলে সম্পত্তি ফেরত যাবে, তবে সেই শর্ত ভঙ্গ হলে জমির মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল মালিক বা তার ওয়ারিশদের কাছে ফিরে যায় (Reverted back)। এক্ষেত্রে নতুন করে দলিল বাতিলের মামলার প্রয়োজন নেই, চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার (Permanent Injunction) মামলাই রক্ষণীয়।
বিচারপতি: মো: ভীষ্মদেব চক্রবর্তী, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, শর্তযুক্ত দানপত্র বা প্রত্যর্পণ দলিলের (Prottarpan deed) শর্ত ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠান ওই সম্পত্তির মালিকানা ধরে রাখতে পারে না। চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মামলায় আদালত যদিও প্রাথমিকভাবে দখল বিবেচনা করেন, তবে শর্তভঙ্গের বিষয়টি মালিকানা প্রমাণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে।
১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা
মামলাটি নেত্রকোনা জেলার একটি পুকুর নিয়ে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার (Permanent Injunction) মামলা।
- বাদীর দাবি: মূল মালিক দুর্গানাথ ভদ্রের ওয়ারিশদের কাছ থেকে হস্তান্তরিত হয়ে বাদী ২০০০ সালে ১.২১ একর জমি (পুকুর) সাফ কবলা দলিলে কেনেন। বাদী জমির দখল নিয়ে নিজের নামে নামজারি (Mutation) করে খাজনা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু ২০০৫ সালে ১নং বিবাদী (জেলা পরিষদ, নেত্রকোনা) পুকুরটি ইজারা দেওয়ার জন্য দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলে বাদী স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মামলা করেন।
- বিবাদীর (জেলা পরিষদ) দাবি: জেলা পরিষদ দাবি করে যে, মূল মালিক দুর্গানাথ ১৯২১ সালে একটি নিবন্ধিত ‘প্রত্যর্পণ দলিলে’ জমিটি জেলা পরিষদকে হস্তান্তর করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল জেলা পরিষদ সেখানে পুকুর খনন করবে এবং গ্রামবাসী খাওয়ার পানি পাবে। কিন্তু পরবর্তীতে গভীর নলকূপ আসায় পুকুরের পানি খাওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। তাই পুকুর রক্ষার জন্য জেলা পরিষদ এটি মাছ চাষের জন্য ইজারা দিয়ে আসছে।
২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে
- বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০০৮): বারহাট্টার সহকারী জজ আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে বাদীর পক্ষে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার ডিক্রি মঞ্জুর করেন।
- আপিল আদালত (Appellate Court – ২০১৫): জেলা পরিষদ আপিল করলে নেত্রকোনার ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত আপিলটি খারিজ করে বিচারিক আদালতের ডিক্রি বহাল রাখেন। এরপর জেলা পরিষদ হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করে।
৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ
হাইকোর্ট নথিপত্র এবং ১৯২১ সালের প্রত্যর্পণ দলিলটি (Exhibit-Ka) গভীরভাবে পর্যালোচনা করে নিম্নোক্ত আইনি বিষয়গুলো স্পষ্ট করেন:
- শর্তযুক্ত দলিল (Conditional Deed): হাইকোর্ট জানান, ১৯২১ সালের প্রত্যর্পণ দলিলের শর্তই ছিল যে, জেলা পরিষদ পুকুর খনন করবে এবং গ্রামবাসী পানি খাবে। কিন্তু দলিলে স্পষ্ট বলা ছিল— যদি এই উদ্দেশ্যের বাইরে পুকুরটি অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা হয়, তবে জমির মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে দাতার ওয়ারিশদের কাছে ফিরে যাবে।
- শর্তভঙ্গ ও মালিকানা হারানো: জেলা পরিষদ নিজেই স্বীকার করেছে যে তারা এখন পুকুরটি মাছ চাষের জন্য ইজারা দিচ্ছে, যা দলিলের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। ফলে, শর্ত ভঙ্গের কারণে পুকুরের মালিকানা অনেক আগেই মূল মালিকের ওয়ারিশদের কাছে ফেরত গেছে (Reverted back)।
- বাদীর বৈধ মালিকানা ও দখল: যেহেতু মালিকানা ওয়ারিশদের কাছে ফিরে এসেছিল, তাই তারা বৈধভাবেই জমিটি বিক্রি করেছেন এবং বাদীর দলিল, নামজারি ও খাজনার রসিদ বাদীর বৈধ দখল ও স্বত্ব প্রমাণ করে।
৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট বিবাদীপক্ষের (जिला পরিষদ) রিভিশন আবেদনটির ওপর নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:
- জেলা পরিষদের জারি করা রুলটি খারিজ (Discharged) করা হলো।
- ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতের দেওয়া বাদীর পক্ষের চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার ডিক্রি বহাল (Affirmed) রাখা হলো। হাইকোর্টের দেওয়া স্থিতাবস্থার আদেশ (Status quo) প্রত্যাহার করা হলো।
মামলার শিরোনাম: প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা পরিষদ, নেত্রকোনা বনাম আবুল কাশেম ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ১৩৫৪ / ২০১৬
রায় প্রদানের তারিখ: ৩ জুলাই ২০২৫

