হিন্দু আইনে স্ত্রীধনে দৌহিত্রীর নিরঙ্কুশ অধিকার: সুপ্রিম কোর্টের রায়

সারসংক্ষেপ: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এক ঐতিহাসিক রায়ে নিশ্চিত করেছেন যে, দায়ভাগ (Dayabhaga) হিন্দু আইন অনুযায়ী কোনো নারী যদি তার মায়ের ‘স্ত্রীধন’ (Stridhan) সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পান, তবে তিনি তাতে নিরঙ্কুশ মালিকানা (Absolute Ownership) লাভ করবেন। তার মৃত্যুর পর ওই সম্পত্তি তার স্বামীর ওয়ারিশদের কাছে ফিরে যাবে না, বরং তা তার নিজের কন্যা বা পরবর্তী স্ত্রীধন উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তরিত হবে। এই রায়টি হিন্দু নারীদের সম্পত্তির অধিকার এবং বাংলাদেশের সংবিধানের সমতার নীতির এক অভূতপূর্ব আইনি দলিল।

মামলার নাম: মৃগাঙ্ক মোহন ঢালী ও অন্যান্য বনাম চিত্ত রঞ্জন মণ্ডল ও অন্যান্য

সাইটেশন (Citation): 18 SCOB [2023] AD 20

আদালত: আপিল বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট

বিচারপতিগণ: বিচারপতি মো: নুরুজ্জামান, বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, বিচারপতি বোরহানউদ্দীন (রায় প্রণেতা) এবং বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম


১. ভূমিকা: স্ত্রীধন এবং হিন্দু আইনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

হিন্দু উত্তরাধিকার আইন মূলত দুটি প্রধান শাখায় বিভক্ত— মিতাক্ষরা (Mitakshara) এবং দায়ভাগ (Dayabhaga)। বাংলাদেশে মূলত ‘দায়ভাগ’ স্কুলটি অনুসরণ করা হয়। দায়ভাগ আইনের মূল ভিত্তি হলো ‘পারলৌকিক কল্যাণ তত্ত্ব’ বা Doctrine of Religious Efficacy। এর অর্থ হলো, যিনি মৃত ব্যক্তির আত্মার সদ্গতির জন্য পিণ্ডদান বা পারলৌকিক কাজ করতে পারবেন, তিনিই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেন। এই সাধারণ নিয়মের কারণে হিন্দু নারীরা ঐতিহ্যগতভাবে সম্পত্তিতে শুধুমাত্র সীমিত অধিকার বা জীবনস্বত্ব (Limited Interest/ Widow’s Estate) পেয়ে থাকেন।

তবে, হিন্দু আইনে এর একটি শক্তিশালী ব্যতিক্রম রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘স্ত্রীধন’ (Stridhan)। ‘স্ত্রী’ এবং ‘ধন’ শব্দ দুটির মিলনে তৈরি এই শব্দের অর্থ হলো নারীর নিজস্ব সম্পত্তি। কোনো হিন্দু নারী যখন দান, উত্তরাধিকার, বা নিজের দক্ষতা ও শ্রমের মাধ্যমে কোনো সম্পত্তি অর্জন করেন, তখন তা স্ত্রীধন হিসেবে গণ্য হতে পারে। স্ত্রীধনের ওপর একজন নারীর নিরঙ্কুশ মালিকানা (Absolute Ownership) থাকে। আলোচ্য মামলাটি মূলত এই স্ত্রীধন সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিয়ে একটি দীর্ঘদিনের আইনি অস্পষ্টতা এবং বৈষম্যের অবসান ঘটিয়েছে। প্রশ্ন ছিল— এক নারী তার মায়ের কাছ থেকে স্ত্রীধন পেলে, তার মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তি কি তার মেয়ের (কন্যার কন্যা) কাছে যাবে, নাকি স্বামীর ভাই বা অন্য পুরুষ ওয়ারিশদের কাছে ফিরে যাবে?

২. মামলার ফ্যাক্ট বা বিস্তারিত ঘটনা (Facts of the Case)

এই আইনি লড়াইয়ের সূচনা হয়েছিল খুলনার একটি সম্পত্তিকে কেন্দ্র করে। মামলার ঘটনাপ্রবাহ নিচে তুলে ধরা হলো:

  • সম্পত্তির মূল মালিকানা ও স্ত্রীধন অর্জন: নালিশি সম্পত্তির মূল মালিক ছিলেন রুক্ষিণী দাসী (Rukkhini Dashi)। তিনি ১৯১৩ সালের ১৬ মে তারিখে একটি রেজিস্ট্রিকৃত সাফ কবলা দলিলের মাধ্যমে তার নিজস্ব ‘স্ত্রীধন’ তহবিল (Stridhan fund) ব্যবহার করে সম্পত্তিটি ক্রয় করেন। তিনি দীর্ঘকাল এই ১০.৩৭ একর জমি ভোগদখল করেন এবং সি.এস (C.S.) খতিয়ানও তার নামে রেকর্ড হয়।
  • উত্তরাধিকারের প্রথম স্তর: রুক্ষিণী দাসী মৃত্যুবরণ করার পর তার একমাত্র কন্যা হাজারী সুন্দরী দাসী (Hazari Sundory Dashi) এই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন।
  • উত্তরাধিকারের দ্বিতীয় স্তর: পরবর্তীতে হাজারী সুন্দরী দাসীও মৃত্যুবরণ করেন। তিনি তার পেছনে একমাত্র কন্যা এলোকেশী মণ্ডলকে (Elokeshi Mondol) রেখে যান, যিনি এই মামলার মূল বাদী। এলোকেশী মণ্ডল উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তিটি পেয়ে ভোগদখল করতে থাকেন এবং বিভিন্ন ব্যক্তিকে বন্দোবস্তও প্রদান করেন।
  • বিবাদীদের জালিয়াতি ও বেদখলের চেষ্টা: রিভিশনাল সেটেলমেন্ট বা এস.এ (S.A.) রেকর্ড চলাকালে বাদী এলোকেশী মণ্ডল অন্য গ্রামে বসবাস করতেন। তিনি তার চাচাদের (১-৬ নং বিবাদী) ওপর সম্পত্তি রেকর্ডের দায়িত্ব অর্পণ করেন। কিন্তু চাচারা বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রতারণামূলকভাবে এস.এ রেকর্ড নিজেদের নামে করিয়ে নেন। যদিও তারা কখনো জমিতে দখলে ছিলেন না, কিন্তু পরবর্তীতে তারা বাদীর মালিকানা অস্বীকার করেন।
  • মামলা দায়ের: স্বত্ব অস্বীকার করার পর এলোকেশী মণ্ডল ১৯৮১ সালে খুলনার সাব-জজ আদালতে স্বত্ব ঘোষণার মামলা (Title Suit No. 171 of 1981) দায়ের করেন। মামলা চলাকালীন এলোকেশী মৃত্যুবরণ করলে তার ওয়ারিশরা (বর্তমান রেসপন্ডেন্ট) স্থলাভিষিক্ত হন।

বিবাদীদের (আপিলকারী) দাবি

বিবাদীরা দাবি করেন যে, রুক্ষিণী দাসী এই সম্পত্তির প্রকৃত মালিক ছিলেন না; তিনি কেবল তার স্বামী ও দেবরদের ‘বেনামদার’ (Benamdar) ছিলেন। তাদের দাবি অনুযায়ী, এটি যৌথ পরিবারের টাকায় কেনা সম্পত্তি এবং রুক্ষিণীর মৃত্যুর পর তা সঠিকভাবেই তার স্বামীর ওয়ারিশদের (বিবাদীদের) নামে রেকর্ড হয়েছে। তারা আরও দাবি করেন যে, দায়ভাগ হিন্দু আইন অনুযায়ী এটি রুক্ষিণীর স্ত্রীধন নয় এবং এলোকেশী মণ্ডল কোনোভাবেই এর উত্তরাধিকারী হতে পারেন না।

৩. নিম্ন আদালত এবং হাইকোর্ট বিভাগের রায়

এই মামলাটি দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত পৌঁছেছে। পূর্ববর্তী আদালতগুলোর সিদ্ধান্ত ছিল নিম্নরূপ:

  • বিচারিক আদালতের রায় (Trial Court): ১৯৯৫ সালে বিচারিক আদালত বাদীর পক্ষে মামলাটি ডিক্রি করে। আদালত সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, এটি বেনামি সম্পত্তি নয় বরং রুক্ষিণী দাসীর স্ত্রীধন। আদালত ‘হিন্দু উত্তরাধিকার (সংশোধন) আইন, ১৯২৯’ (The Hindu Law of Inheritance (Amendment) Act, 1929)-এর বিধান প্রয়োগ করে জানায় যে, এই আইন অনুযায়ী কন্যার কন্যা বা দৌহিত্রী (Daughter’s daughter) উত্তরাধিকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
  • প্রথম আপিল আদালত (First Appellate Court): বিবাদীরা আপিল করলে ১৯৯৯ সালে প্রথম আপিল আদালত বিচারিক আদালতের রায় বহাল রাখেন এবং আপিল খারিজ করে দেন।
  • হাইকোর্ট বিভাগ (High Court Division): এরপর বিবাদীরা হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশন (Civil Revision No. 2049 of 1999) দায়ের করেন। ২০০০ সালে হাইকোর্ট বিভাগও নিম্ন আদালতগুলোর রায় সঠিক বলে রুল খারিজ করে দেন।

৪. আপিল বিভাগে আইনি লড়াই ও লিভ টু আপিল

হাইকোর্ট বিভাগের রায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে বিবাদীরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল দায়ের করেন। আপিল বিভাগে এসে বিবাদীরা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী আইনি প্রশ্ন বা ‘Point of Law’ উত্থাপন করেন।

লিভ মঞ্জুরের কারণ (Grounds for Leave):

বিবাদীরা সুপ্রিম কোর্টকে দেখান যে, নিম্ন আদালতগুলো যে ‘হিন্দু উত্তরাধিকার (সংশোধন) আইন, ১৯২৯’ প্রয়োগ করে বাদীকে সম্পত্তি দিয়েছে, সেটি একটি মারাত্মক আইনি ভুল। কারণ, ১৯২৯ সালের ওই সংশোধনী আইনটি শুধুমাত্র হিন্দু আইনের ‘মিতাক্ষরা’ (Mitakshara) স্কুলের অনুসারীদের জন্য প্রযোজ্য, বাংলাদেশের ‘দায়ভাগ’ (Dayabhaga) স্কুলের অনুসারীদের জন্য নয়। আপিল বিভাগ এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্নটি পর্যালোচনার জন্য লিভ মঞ্জুর করেন।

৫. উভয় পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক (Arguments)

ক) আপিলকারী (বিবাদী) পক্ষের যুক্তি:

আপিলকারী পক্ষের সিনিয়র আইনজীবী জনাব মো: নুরুল আমিন আদালতে অত্যন্ত জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন:

  • ১৯২৯ সালের আইনের অকার্যকারিতা: তিনি দাবি করেন, যেহেতু ১৯২৯ সালের আইনটি শুধুমাত্র মিতাক্ষরা স্কুলের জন্য প্রযোজ্য, তাই দায়ভাগ শাসিত এই মামলায় ওই আইন প্রয়োগ করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়টি বাতিলযোগ্য।
  • সীমিত অধিকার বা Life Estate: তিনি হিন্দু আইনের প্রখ্যাত পণ্ডিত ডি. এফ. মোল্লা (D. F. Mulla)-এর ‘The Principles of Hindu Law’ বইয়ের ১৩০, ১৬২, ১৬৮ এবং ১৬৯ অনুচ্ছেদের রেফারেন্স দেন। তিনি দাবি করেন যে, দায়ভাগ আইন অনুযায়ী কোনো নারী যখন অন্য নারী বা পুরুষের কাছ থেকে সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পান, তখন তা তার ‘স্ত্রীধন’ হয় না। তিনি কেবল ওই সম্পত্তিতে সীমিত অধিকার বা জীবনস্বত্ব (Limited interest) লাভ করেন।
  • মূল ওয়ারিশের কাছে সম্পত্তি ফেরত: বিবাদীর আইনজীবীর মতে, হাজারী সুন্দরী দাসী তার মা রুক্ষিণীর কাছ থেকে সম্পত্তিটি পেলেও তা হাজারীর স্ত্রীধন হয়নি। ফলে হাজারীর মৃত্যুর পর সম্পত্তিটি তার মেয়ে এলোকেশীর কাছে যাবে না। বরং, সম্পত্তিটি রুক্ষিণীর পরবর্তী স্ত্রীধন ওয়ারিশদের (অর্থাৎ তার স্বামীর ভাই ও ভাতিজাদের, যারা এই মামলার বিবাদী) কাছে ফেরত যাবে।
  • প্রিভি কাউন্সিলের নজির: তিনি প্রিভি কাউন্সিলের ১৯০৩ সালের বিখ্যাত রায় Sheo Shankar Lal vs. Debi Sahai (30 I.A. 202) এর উদাহরণ টানেন, যেখানে বলা হয়েছিল যে, এক নারীর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি তার মৃত্যুর পর পুনরায় স্ত্রীধন হিসেবে হস্তান্তরিত হয় না।

খ) রেসপন্ডেন্ট (বাদী) পক্ষের যুক্তি:

বাদী পক্ষের আইনজীবী জনাব এম. কামরুল হক সিদ্দিকী এই দাবিগুলোর তীব্র বিরোধিতা করে হিন্দু আইনের গভীরে প্রবেশ করেন:

  • আইনি ভুল স্বীকার ও মূল দাবি: তিনি স্বীকার করেন যে নিম্ন আদালতগুলোর ১৯২৯ সালের আইন প্রয়োগ করা ভুল ছিল। কিন্তু তিনি আরজির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের দিকে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, বাদীর মূল দাবি ছিল ‘দায়ভাগ হিন্দু আইন অনুযায়ী স্ত্রীধন সম্পত্তির উত্তরাধিকার’। এই প্রশ্নটিরই সমাধান হওয়া প্রয়োজন।
  • জীমূতবাহনের ‘দায়ভাগ’ টেক্সট: তিনি সরাসরি দায়ভাগ আইনের প্রণেতা জীমূতবাহনের (Jimuta Vahana) মূল গ্রন্থের ৪ নম্বর অধ্যায়ের রেফারেন্স দেন। তিনি দেখান যে, দায়ভাগ আইনে বলা হয়েছে, যখন কোনো কন্যা তার মায়ের স্ত্রীধন পান, তখন তিনি তা একজন পুত্রের মতোই ‘নিরঙ্কুশভাবে’ (Absolutely) পান। কারণ পুত্র ও কন্যা “সমানভাবে” (Equally) উত্তরাধিকারী হয়। দায়ভাগ আইনের কোথাও বলা নেই যে এটি কেবল ‘বিধবার স্বত্ব’ (Widow’s estate) হবে।
  • প্রিভি কাউন্সিলের রায়টি Per Incuriam: তিনি প্রিভি কাউন্সিলের Sheo Shankar Lal মামলা এবং কলকাতা হাইকোর্টের Huri Doyal Singh মামলার সিদ্ধান্তকে ‘অসাবধানতাবশত ভুল’ বা Per incuriam বলে আখ্যায়িত করেন এবং দাবি করেন যে এগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাধ্যকর (Binding precedent) নয়।
  • পণ্ডিতদের মতামত: তিনি গুরুদাস ব্যানার্জি, গোলাপ শাস্ত্রী, এবং পাণ্ডুরং বামন কানে-এর মতো হিন্দু আইনের পণ্ডিতদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, সম্পত্তিতে নারীদের নিরঙ্কুশ অধিকার রয়েছে এবং তা বাধাগ্রস্ত করার কোনো স্পষ্ট বিধান হিন্দু আইনে নেই।

গ) অ্যামিকাস কিউরি (Amicus Curiae) এর মতামত:

আদালতকে সহায়তার জন্য নিযুক্ত অ্যামিকাস কিউরি সিনিয়র আইনজীবী জনাব প্রবীর নিয়োগী একটি লিখিত মতামত দাখিল করেন:

  • মোল্লার আইনের বিশ্লেষণ: তিনি দেখান যে, মোল্লার বইয়ের ১৬০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দ্বিতীয় প্রজন্মের স্ত্রীধন ওয়ারিশ হিসেবে কন্যার কন্যা (Daughter’s daughter) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। হিন্দু আইনে দৌহিত্রীকে স্ত্রীধন থেকে বঞ্চিত করার কোনো সর্বসম্মত বা সুনির্দিষ্ট নিয়ম নেই।
  • আইনের অস্পষ্টতা ও আদালতের ভূমিকা: হিন্দু আইনের প্রখ্যাত রচয়িতাদের মধ্যে মতভেদ থাকায় আইনে যে অস্পষ্টতা বা Ambiguity তৈরি হয়েছে, তা দূর করার দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্টের।
  • সাংবিধানিক সমতা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হিসেবে তিনি বাংলাদেশের সংবিধানের উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আইন ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে আদালতকে অবশ্যই সংবিধানের আলোকে চিন্তা করতে হবে। সংবিধান নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য নিষিদ্ধ করেছে, তাই হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে এমন ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত যা লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করে।

৬. সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ (Court’s Observation & Analysis)

বিচারপতি বোরহানউদ্দীন কর্তৃক রচিত এই রায়ে আপিল বিভাগ হিন্দু আইনের অত্যন্ত জটিল ও প্রাচীন টেক্সটগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

ক) ১৯২৯ সালের আইনের অকার্যকারিতা

আপিল বিভাগ প্রথমেই পরিষ্কার করেন যে, ‘The Hindu Law of Inheritance (Amendment) Act, 1929’ এর ১(২) ধারা অনুযায়ী এই আইনটি শুধুমাত্র তাদের জন্যই প্রযোজ্য যারা ‘মিতাক্ষরা’ (Mitakshara) আইনের অধীন। যেহেতু বাংলাদেশ মূলত ‘দায়ভাগ’ (Dayabhaga) শাসিত অঞ্চল, তাই নিম্ন আদালতগুলোর এই আইনের ওপর ভিত্তি করে রায় দেওয়াটা একটি মারাত্মক ভুল ছিল। আদালত নিম্ন আদালতের এই অংশটুকু এক্সপাঞ্জ (Expunge) বা বাতিল করেন।

খ) দায়ভাগ আইন ও স্ত্রীধনের প্রকৃতি

আদালত ব্যাখ্যা করেন যে, দায়ভাগ আইনে উত্তরাধিকারের মূল নীতি হলো ‘পারলৌকিক কল্যাণ’ (Religious efficacy) বা মৃত ব্যক্তির জন্য বিশেষ কল্যাণ সাধনের সক্ষমতা। সাধারণ নিয়ম হলো, কোনো সম্পত্তি একবার কারো ওপর ন্যস্ত হলে তা আর ছিনিয়ে নেওয়া যায় না। কিন্তু হিন্দু নারীদের ক্ষেত্রে এই নিয়মটি সাংঘর্ষিক, কারণ তারা সম্পত্তিতে কেবল ‘সীমিত মালিকানা’ পান এবং তাদের মৃত্যুর পর তা মূল মালিকের ওয়ারিশদের কাছে ফিরে যায়।

তবে আদালত জোর দিয়ে বলেন যে, ‘স্ত্রীধন’ হলো এর একমাত্র ব্যতিক্রম। স্ত্রীধন সম্পত্তির ওপর একজন নারীর নিরঙ্কুশ বা সম্পূর্ণ মালিকানা (Absolute ownership) থাকে। এটি কখনোই মূল মালিকের ওয়ারিশদের কাছে ফেরে না, বরং এটি সেই নারীর নিজস্ব উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তরিত হয়।

গ) ডি. এফ. মোল্লা (D. F. Mulla) এর আইনের পর্যালোচনা

আদালত ডি. এফ. মোল্লার বিখ্যাত ‘The Principles of Hindu Law’ বইটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করেন।

  • অনুচ্ছেদ ১৬০: এই অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে, “দ্বিতীয় প্রজন্মের স্ত্রীধন ওয়ারিশরা, অর্থাৎ পুত্রের পুত্র, কন্যার পুত্র এবং কন্যার কন্যারা শাখামূলে (per stirpes) সম্পত্তির ভাগ পাবে”। আদালত বলেন, এই অনুচ্ছেদ প্রমাণ করে যে, কন্যার কন্যা বা দৌহিত্রী (যেমন এই মামলার বাদী এলোকেশী) স্ত্রীধন উত্তরাধিকার থেকে কোনোভাবেই বঞ্চিত নয়।
  • অনুচ্ছেদ ১৬২: এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, বোম্বে স্কুল ছাড়া অন্যান্য স্কুলে কোনো নারী স্ত্রীধন উত্তরাধিকার সূত্রে পেলে তা সীমিত অধিকার হয় এবং তার মৃত্যুর পর তা পূর্ববর্তী নারীর স্ত্রীধন ওয়ারিশদের কাছে যায়। আদালত বলেন, হাজারী সুন্দরী তার মা রুক্ষিণীর স্ত্রীধন পেয়েছিলেন। হাজারীর মৃত্যুর পর সম্পত্তিটি রুক্ষিণীর পরবর্তী স্ত্রীধন ওয়ারিশের কাছে যাবে। আর মোল্লার ১৬০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সেই পরবর্তী ওয়ারিশ হলো রুক্ষিণীর কন্যার কন্যা অর্থাৎ বাদী এলোকেশী মণ্ডল।

ঘ) জীমূতবাহনের ‘দায়ভাগ’ (The Dayabhaga by Jimuta Vahana) এর মূল পাঠ বিশ্লেষণ

আদালত দায়ভাগ আইনের স্রষ্টা জীমূতবাহনের মূল টেক্সটগুলো বিশ্লেষণ করেন। দায়ভাগ গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়ের শিরোনামই হলো “নারীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার”。

  • এই অধ্যায়ের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে জীমূতবাহন মনু (Manu)-র উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন: “মায়ের মৃত্যুর পর, সকল সহোদর ভাই এবং সহোদর বোনেরা সমানভাবে মাতৃসম্পত্তি ভাগ করে নেবে”।
  • জীমূতবাহন আরও স্পষ্ট করেছেন যে, এখানে “সমান” (Equal) শব্দটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কোনো কম-বেশি করার সুযোগ নেই। যারা বলে যে পুত্র ও কন্যার অধিকার সমান নয়, তারা আইন বোঝে না এবং তাদের কথা অগ্রাহ্য করতে হবে।
  • আদালত সিদ্ধান্তে আসেন যে, জীমূতবাহনের লেখা থেকে এটি দিনের আলোর মতো স্পষ্ট যে, একজন কন্যা তার মায়ের স্ত্রীধন একজন পুত্রের মতোই ‘নিরঙ্কুশভাবে’ (Absolutely) পান। দায়ভাগ আইনের কোথাও বলা নেই যে এটি কেবল ‘সীমিত অধিকার’ বা ‘বিধবার স্বত্ব’ হবে।
  • আদালত কড়া ভাষায় বলেন, জীমূতবাহন নিজে যেখানে কন্যাকে নিরঙ্কুশ অধিকার দিয়েছেন, সেখানে কোনো আইনজীবী, এমনকি কোনো বিচারপতিরও এখতিয়ার নেই দায়ভাগ আইনে নতুন কিছু সংযোজন করে কোনো কন্যা বা দৌহিত্রীকে তার মাতৃসম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার।

ঙ) হিন্দু আইনের পণ্ডিতদের মতামত (Scholarly Opinions)

আদালত হিন্দু আইনের দিকপাল পণ্ডিতদের গবেষণা উল্লেখ করেন, যারা প্রথাগত রীতিনীতি ও সংস্কৃত টেক্সট সম্পর্কে গভীর জ্ঞানী ছিলেন:

  • স্যার গুরুদাস ব্যানার্জি (Sir Gooroodass Banerjee): তিনি তার Tagore Law Lectures-1878 এ বলেছেন, জীমূতবাহন আধ্যাত্মিক বা পারলৌকিক কল্যাণ তত্ত্বকে একপাশে সরিয়ে রেখে প্রাকৃতিক স্নেহ ও ভালোবাসার (natural love and affection) ওপর ভিত্তি করে কন্যাদের সম্পত্তির অধিকার দিয়েছেন। একবার উত্তরাধিকার সূত্রে স্ত্রীধন হস্তান্তরিত হলে তা আর স্ত্রীধন থাকে না— এই ধারণা জীমূতবাহনের সংজ্ঞার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
  • গোলাপ শাস্ত্রী (Golap Sastri): তিনি বলেছেন, কোনো নারী যখন অন্যের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন, তখন তিনি মৃত ব্যক্তির সমস্ত অধিকার লাভ করেন। দায়ভাগ আইনের চতুর্থ অধ্যায় পড়লে যে কেউই বুঝবে যে, কন্যারা তাদের মায়ের স্ত্রীধনে পুত্রদের সমান অধিকার লাভ করে। তিনি আরও বলেন, বাস্তবে শতকরা নিরানব্বইটি ক্ষেত্রে নারীরা সম্পত্তি নিরঙ্কুশভাবেই পান, সীমিত অধিকারের ধারণাটি সাধারণ মানুষ জানেই না।
  • যোগেন্দ্র চন্দ্র ঘোষ (Jogendra Cunder Ghose): তিনি বলেছেন, যদি কন্যার পর কন্যার কন্যা স্ত্রীধন না পায়, তবে এমন নিয়মের পক্ষে স্মৃতি বা প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে কোনো সমর্থন বা টেক্সট নেই।
  • পাণ্ডুরং বামন কানে (P. V. Kane): তিনি মনুর (IX.192-193) উদ্ধৃতি দিয়ে দেখিয়েছেন যে, মায়ের মৃত্যুর পর শুধু কন্যারা নয়, এমনকি স্নেহের বশবর্তী হয়ে “কন্যার কন্যাদেরও” (daughters of those daughters) মাতামহীর সম্পত্তি থেকে অংশ দেওয়া উচিত।

আদালত বলেন, এই পণ্ডিতরা বাংলার হিন্দু সমাজের রীতিনীতি সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত ছিলেন। তাদের মতামতই দায়ভাগ আইন ব্যাখ্যার সর্বোত্তম মাধ্যম।

চ) পূর্ববর্তী নজির বাতিল (Per Incuriam)

আদালত প্রিভি কাউন্সিলের Sheo Shankar Lal (1903) এবং কলকাতা হাইকোর্টের Huri Doyal Singh (17 Cal 911) মামলা দুটির সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করেন। আদালত বলেন, এই রায়গুলো দায়ভাগ আইনের মূল স্পিরিট ও জীমূতবাহনের টেক্সটকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেনি। ‘Per incuriam’ অর্থ হলো বিচারকের অসাবধানতাবশত বা প্রযোজ্য আইন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবে দেওয়া ভুল রায়। তাই এই পুরানো রায়গুলো বর্তমান মামলার ক্ষেত্রে বাধ্যকর বা বাইন্ডিং (Binding Precedent) নয়।

ছ) সাংবিধানিক সামঞ্জস্যতা এবং সমতার অধিকার (Constitutional Harmony)

এই রায়ের সবচেয়ে যুগান্তকারী অংশ হলো হিন্দু ব্যক্তিগত আইনকে বাংলাদেশের সংবিধানের সমতার নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। আদালত বলেন:

  • অনুচ্ছেদ ২৭: সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।
  • অনুচ্ছেদ ১৯(২) ও ১৯(৩): রাষ্ট্র মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে সচেষ্ট হবে এবং জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সমতা নিশ্চিত করবে।
  • অনুচ্ছেদ ২৮(১) ও ২৮(২): রাষ্ট্র কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করবে না। রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার লাভ করবে।

আদালত জোর দিয়ে বলেন যে, সংবিধানে নারী-পুরুষের সমতা যখন একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত, তখন হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে এমন কোনো ব্যাখ্যা চাপিয়ে দেওয়া যায় না যা নারীদের (কন্যার কন্যাকে) সম্পত্তির অধিকার থেকে বৈষম্যমূলকভাবে বঞ্চিত করে। ভারতে ১৯৫৬ সালের হিন্দু সাকসেশন অ্যাক্ট (Hindu Succession Act, 1956) দ্বারা নারীদের সম্পত্তিতে নিরঙ্কুশ অধিকার দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে যদিও ওই আইন নেই, তবে সংবিধানের আলোকে দায়ভাগ আইনের প্রগতিশীল ব্যাখ্যা প্রদান করে এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব।

৭. সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (Final Verdict)

সমস্ত আইনি, শাস্ত্রীয় এবং সাংবিধানিক বিশ্লেষণ শেষে আপিল বিভাগ এই মর্মে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করেন যে:

  • যেহেতু কোনো সম্পত্তির নিরঙ্কুশ মালিকানা (Absolute ownership) যার থাকে, তার মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তির সমস্ত অধিকার ও দায়দায়িত্ব তার ওয়ারিশদের ওপরই বর্তায়, সেহেতু ‘স্ত্রীধন’ নামক নিরঙ্কুশ সম্পত্তিও উত্তরাধিকারীদের কাছেই যাবে।
  • নালিশি সম্পত্তিটি রুক্ষিণী দাসীর স্ত্রীধন ছিল এবং দায়ভাগ আইনের সঠিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী তা আইনসম্মতভাবেই তার কন্যার কন্যা (দৌহিত্রী) অর্থাৎ বাদী এলোকেশী মণ্ডলের ওপর ন্যস্ত হবে।
  • নিম্ন আদালতগুলো ১৯২৯ সালের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন প্রয়োগ করে যে ভুল করেছিল, তা রায়ের অংশ থেকে বাতিল (Expunge) করা হলো।
  • তবে, বাদীর পক্ষে নিম্ন আদালতগুলোর দেওয়া ডিক্রি এবং হাইকোর্ট বিভাগের রায় অন্যান্য যুক্তিতে সঠিক বিধায় আপিলকারী বিবাদীদের সিভিল আপিলটি খারিজ (Dismissed) করা হলো।

৮. আইনি প্রভাব ও উপসংহার (Legal Impact & Conclusion)

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এই রায়টি (18 SCOB [2023] AD 20) দেশের হিন্দু উত্তরাধিকার আইনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। দীর্ঘকাল ধরে এই ভুল ধারণা প্রচলিত ছিল যে, হিন্দু নারীরা কোনো সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পেলে তা সীমিত সময়ের জন্য (Life estate) পান এবং মৃত্যুর পর তা শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় বা পুরুষ ওয়ারিশদের কাছে চলে যায়।

এই রায়ের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে:

  1. স্ত্রীধন সম্পত্তিতে নারীদের নিরঙ্কুশ মালিকানা (Absolute Ownership) রয়েছে।
  2. কন্যা তার মায়ের স্ত্রীধন একজন পুত্রের মতোই সমান ও নিরঙ্কুশ অধিকারে লাভ করেন।
  3. কন্যার মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তি তার স্বামীর পুরুষ ওয়ারিশদের কাছে যাবে না, বরং তার নিজের কন্যা অর্থাৎ দৌহিত্রী (Daughter’s daughter) সেই সম্পত্তির বৈধ উত্তরাধিকারী হবেন।

পরিশেষে, এই রায়টি শুধুমাত্র প্রাচীন হিন্দু আইনের (দায়ভাগ) সঠিক ব্যাখ্যামূলক দলিলই নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সংবিধানের আলোকে হিন্দু নারীদের সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আইন চর্চা এবং নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে একটি শক্তিশালী আইনি নজির (Precedent) হিসেবে কাজ করবে।


সতর্কীকরণ: এই আর্টিকেলটি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের একটি বিশ্লেষণমূলক সারসংক্ষেপ। আইনি লড়াই বা মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে মূল জাজমেন্ট এবং বিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। ‘আইনপ্রকাশ’ সাধারণ মানুষের আইনি সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই তথ্য প্রকাশ করেছে।

Related Articles

Back to top button