স্বত্ব ও বেদখলের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া ডিক্রি বাতিল | হাইকোর্ট

সারসংক্ষেপ: দেওয়ানী মামলায় বাদীকে অবশ্যই তার মালিকানার ধারাবাহিকতা (Chain of title), আইনি বৈধতা এবং বেদখল হওয়ার সুনির্দিষ্ট তারিখ ও বিবরণ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে। বাদীর নিজস্ব সাক্ষীরা যদি পরস্পরবিরোধী সাক্ষ্য দেয় এবং পরোক্ষভাবে বিবাদীর দখলকে স্বীকার করে নেয়, তবে বাদী স্বত্ব ও খাস দখলের ডিক্রি পেতে পারে না।

বিচারপতি: মো: ইকবাল কবীর এবং মিসেস জেসমিন আরা বেগম, হাইকোর্ট বিভাগ

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ফার্স্ট আপিলের (First Appeal) এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, কোনো নিলাম খরিদের দাবি করলে অবশ্যই তার দখলনামা (Dakhalanama) আদালতে দাখিল করতে হবে। এছাড়া, বাদীর সাক্ষীরা যদি মূল ঘটনা না দেখেই ‘শুনেছি’ বলে সাক্ষ্য দেয় এবং বিবাদীর স্থাপনার অস্তিত্ব স্বীকার করে নেয়, তবে সেই সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে ডিক্রি দেওয়া বিচারিক আদালতের মারাত্মক ভুল।

১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা

মামলাটি ফেনী জেলার ২৩১ নং খতিয়ানের ১১৬ শতক জমির স্বত্ব ঘোষণা এবং খাস দখল পুনরুদ্ধারের মামলা।

  • বাদীর দাবি: জমির মূল রায়ত (মালিক) ছিলেন গিরিশ চন্দ্র ধূপি। বকেয়া খাজনার দায়ে ১৯৩৫ সালে জমিটি নিলাম বিক্রি হয় এবং সফরজান বিবি তা কেনেন। পরবর্তীতে গিরিশের বিধবা স্ত্রী সরলা সুন্দরী ১৯৩৭ সালে একটি ‘কবুলিয়ত’ দলিলের মাধ্যমে ৫৯ শতক জমি পান। বাদী এই ধারাবাহিকতায় জমির মালিক এবং বিবাদীরা তাকে বেদখল করেছে।
  • বিবাদীর (আপিলকারী) দাবি: বিবাদীরা গিরিশ চন্দ্র ধূপির বৈধ ওয়ারিশ। তারা দাবি করেন যে, নিলাম বিক্রি বা কবুলিয়ত দলিলের ঘটনা সম্পূর্ণ ভুয়া এবং সরকারি নথিতে এমন কোনো নিলাম বা রেন্ট কেসের অস্তিত্ব নেই। তারা উত্তরাধিকার সূত্রে নিরবচ্ছিন্নভাবে জমিটি ভোগদখল করছেন।

২. নিম্ন আদালত যা বলেছে

  • বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০১৩): ফেনীর দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে বাদীর পক্ষে মামলাটি ডিক্রি করে দেন (অর্থাৎ বাদীর স্বত্ব ও খাস দখল মঞ্জুর করেন)। এর বিরুদ্ধে বিবাদীরা হাইকোর্টে ফার্স্ট আপিল দায়ের করেন।

৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ

হাইকোর্ট নথিপত্র এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে বিচারিক আদালতের রায়ে মারাত্মক আইনি ও বস্তুগত ত্রুটি খুঁজে পান:

  • নিলাম ও দলিলের প্রমাণ নেই: বাদী দাবি করেছে জমিটি নিলাম হয়েছিল, কিন্তু নিলামের কোনো ‘দখলনামা’ (Possession certificate) আদালতে দাখিল করতে পারেনি। এছাড়া, ১৯৩৭ সালের ‘কবুলিয়ত’ দলিল প্রমাণের জন্য পিডব্লিউ-২ (PW-2) ১৯৩৬ সালের একটি ভলিউম আদালতে উপস্থাপন করেন, যা দলিলের সত্যতাকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
  • সাক্ষীদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য: বাদীর ১নং সাক্ষী (PW-1) মূল মালিকের নাম নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন। বেদখল হওয়ার বিষয়ে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ বা বিবরণ দিতে পারেননি। ৩নং সাক্ষী (PW-3) স্বীকার করেছেন যে তিনি বেদখল হওয়ার কোনো ঘটনা স্বচক্ষে দেখেননি। ৪নং সাক্ষী (PW-4) বলেছেন, তিনি কেবল বেদখল হওয়ার কথা ‘শুনেছেন’। এ ধরনের ‘শোনা কথা’ (Hearsay evidence) আইনত অগ্রহণযোগ্য।
  • বিবাদীর দখল প্রমাণিত: বাদীর নিজস্ব ৫নং সাক্ষী (PW-5) জেরার মুখে স্বীকার করে নেন যে, নালিশি জমিতে বিবাদীদের ঘর, ল্যাট্রিন এবং টিউবওয়েল রয়েছে। বাদীর সাক্ষীর এই স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে, জমিতে বিবাদীদের আগে থেকেই দখল রয়েছে এবং বাদীকে বেদখল করার গল্পটি ভিত্তিহীন।

৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

হাইকোর্ট বিবাদীপক্ষের (আপিলকারী) আপিলটি মঞ্জুর (Allowed) করেছেন এবং নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:

  • ফেনীর দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতের দেওয়া ২০১৩ সালের বাদীর পক্ষের ডিক্রিটি বাতিল (Set aside) করা হলো।
  • বাদী তার মালিকানা ও বেদখলের বিষয়টি প্রমাণ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হওয়ায় বাদীর মূল মামলাটি খারিজ বলে গণ্য হবে।

মামলার শিরোনাম: সেনতারা বেগম ও অন্যান্য বনাম জাকির হোসেন (মৃত) ও তার ওয়ারিশগণ।
ফার্স্ট আপিল নং: ৪০২ / ২০১৩
রায় প্রদানের তারিখ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫

Related Articles

Back to top button