উইলস লিটল ফ্লাওয়ার বিতর্ক: বিচারপতির বিরুদ্ধে শিক্ষক হেনস্তার অভিযোগ বনাম পাল্টা জিডি

ঢাকা: রাজধানীর স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজকে কেন্দ্র করে এক নজিরবিহীন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. আলী রেজার বিরুদ্ধে স্কুলের এক শিক্ষককে বাসভবনে ডেকে অপমানের অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, বিচারপতির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, প্রাইভেট কোচিং না করায় ওই শিক্ষক তার দশম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলেকে ক্লাসে মারধর করেছেন। এ ঘটনায় পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও থানায় সাধারণ ডায়েরির (জিডি) পর পরিস্থিতি বেশ ঘোলাটে রূপ নিয়েছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি

গত রোববার (২৬ এপ্রিল) উইলস লিটল ফ্লাওয়ারের একদল শিক্ষার্থী সরাসরি প্রধান বিচারপতি বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। তাদের দাবি, স্কুলের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পালকে বিচারপতি মো. আলী রেজা নিজ বাসভবনে ডেকে নিয়ে চরম অপমান ও হেনস্তা করেছেন। প্রিয় শিক্ষকের এমন অপমানের বিচার চেয়ে প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপ কামনা করেছে শিক্ষার্থীরা। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে।

পাল্টা জিডিতে উঠে এলো ভিন্ন চিত্র

শিক্ষার্থীদের এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে বিচারপতির পরিবার। উল্টো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি ও অপপ্রচারের অভিযোগ এনে রমনা মডেল থানায় একটি জিডি করেছেন বিচারপতির ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. আশিকুর রহমান। এই জিডিতে ঘটনার যে বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তা শিক্ষার্থীদের দাবির সম্পূর্ণ বিপরীত।

জিডির তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার মূল সূত্রপাত গত ১৬ এপ্রিল। ওই দিন বিকেল ৩টা ৩৬ মিনিটে শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পাল বিচারপতিকে ফোন করে বেশ উচ্চবাচ্যে বলেন, “আপনি কি নাঈমের বাপ? আপনি স্কুলে আসেন।” আদালত চলাকালীন এমন ফোনে বিচারপতি বিস্ময় প্রকাশ করেন। পরে তিনি জানতে পারেন, ওই শিক্ষকের ব্যক্তিগত কোচিংয়ে না যাওয়ার কারণে ক্লাসরুমে সবার সামনে বিচারপতির ছেলে নাঈম রেজাকে মারধর করেছেন তিনি।

বাসভবনে আপস-মীমাংসা ও পরবর্তী উত্তেজনা

ছেলের গায়ে হাত তোলার বিষয়টি নিয়ে বিচারপতি স্কুলের অধ্যক্ষ আ ন ম শামসুল আলমের সাথে কথা বললে তিনি ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে, পরে অধ্যক্ষের মাধ্যমেই শিক্ষক দয়াল চন্দ্র পাল ও অপর এক শিক্ষককে নিজের বাসায় চায়ের আমন্ত্রণ জানান বিচারপতি। ১৮ এপ্রিল তারা বাসভবনে গেলে নিজেদের ভুলের জন্য ক্ষমা চান এবং সেখানেই বিষয়টি সম্মানজনকভাবে মীমাংসা হয়। এমনকি অতিথি আপ্যায়ন শেষে বিচারপতির ছেলে নিজেই শিক্ষকদের লিফট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসে।

টিসি নিয়ে স্কুল ছাড়ল বিচারপতির ছেলে

জিডিতে আরও বলা হয়েছে, বিষয়টি মীমাংসা হয়ে যাওয়ার পরও ১৯ এপ্রিল নাঈম স্কুলে পরীক্ষা দিতে গেলে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়। তার সহপাঠী সানজিদ ও ফাহিম তাকে লাঞ্ছিত করে এবং নাহিয়ান ও রোহানসহ আরও কয়েকজন তাকে জীবননাশের হুমকি দেয়।

ছেলের নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কায় পড়ে যান বিচারপতি। বাধ্য হয়ে ২১ এপ্রিল তিনি ছেলেকে ওই স্কুল থেকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট (টিসি) নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করান। কিন্তু এরপরও ২৩ এপ্রিল রাত থেকে স্কুলের বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে বিচারপতির বিরুদ্ধে উসকানিমূলক ও কুরুচিপূর্ণ পোস্ট দেওয়া শুরু হয়। এই সাইবার বুলিং ও হুমকির জেরেই মূলত ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নিশ্চিতে রমনা থানায় জিডিটি করা হয়েছে।

পুরো ঘটনাটি বর্তমানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং আইন অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সুষ্ঠু তদন্তের দিকেই এখন তাকিয়ে আছেন সবাই।

Related Articles

Back to top button