মানহানির মামলায় তৃতীয় পক্ষের অধিকার নেই: শিশির মনির

ঢাকা: ফৌজদারি আইনে মানহানির মামলার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি হলো— ঠিক যার মানহানি হয়েছে, কেবল তিনিই আদালতের আশ্রয় নিতে পারবেন। তৃতীয় কোনো ব্যক্তির পক্ষে অন্যের মানহানির বিচার চেয়ে মামলা করার কোনো আইনি সুযোগ নেই। কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজার বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি বিতর্কিত মানহানি মামলায় হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন পাওয়ার পর এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।
মানহানি মামলার আইনি ভিত্তি ও অপপ্রয়োগের অভিযোগ
সোমবার (২৭ এপ্রিল) আইনি লড়াই শেষে আইনজীবী শিশির মনির প্রচলিত আইনের একটি দিক উন্মোচন করেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, ভারতীয় উপমহাদেশের আইনি কাঠামো এবং বাংলাদেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, মানহানির অভিযোগ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অধিকারের পর্যায়ভুক্ত। অর্থাৎ, যে ব্যক্তির সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তাকেই সরাসরি মামলার বাদী হতে হবে। আলোচিত এই মামলায় সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নিজে কোনো অভিযোগ দায়ের করেননি, বরং তার পক্ষে অন্য একজন স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলাটি করেছেন। শিশির মনিরের মতে, এটি স্পষ্টতই আইনের ভুল প্রয়োগ এবং এ ধরনের মামলার কোনো শক্ত আইনি ভিত্তি নেই।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও মামলার অসঙ্গতি
এই আইনি বিতর্কের শুরু মূলত গত ২৬ মার্চ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান জানিয়ে দেওয়া সেই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর বড় জামে মসজিদে জুমার খুতবার আগে সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজা কিছু মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
তবে মামলার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকটি হলো এর ভৌগোলিক বিভ্রান্তি। ঘটনাটি কুষ্টিয়ার হলেও গত ২ এপ্রিল মামলাটি দায়ের করা হয় সিরাজগঞ্জের জজ আদালতে। মামলার বাদী হন সিরাজগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির। আইনজীবী শিশির মনির মামলার এজাহারের একটি বড় অসঙ্গতি তুলে ধরে জানান, নথিপত্রে ঘটনাস্থল হিসেবে শরীয়তপুরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, অথচ বিচার চাওয়া হয়েছে সিরাজগঞ্জে। এই ধরনের পদ্ধতিগত দুর্বলতা মামলাটির গ্রহণযোগ্যতাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া
সিরাজগঞ্জের আদালতে মামলাটি দায়েরের পর স্বাভাবিক নিয়মেই আমির হামজার প্রতি সমন জারি করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত তারিখে তিনি আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় বিচারক তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। বিষয়টি হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ালে সোমবার আদালত তাকে আট সপ্তাহের আগাম জামিন প্রদান করেন। আদেশে বলা হয়, মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই জামিন বহাল থাকতে পারে।
হাইকোর্টের এই আদেশের ফলে আপাতত সংসদ সদস্য আমির হামজার বিরুদ্ধে জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানাটি স্থগিত থাকছে। তবে জামিনের এই নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলে তাকে সিরাজগঞ্জের সংশ্লিষ্ট আদালতেই আত্মসমর্পণ করে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে। তৃতীয় পক্ষের করা এই মামলাটি বাংলাদেশের আইনি অঙ্গনে মানহানি মামলার যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।



