সুপ্রিম কোর্ট বার নির্বাচন: দলীয় প্যানেলে মানা, স্বতন্ত্রে ছাড়

ঢাকা: দেশের সর্বোচ্চ আদালতের আইনজীবী অঙ্গনে আসন্ন নির্বাচন ঘিরে এবার তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এক রাজনৈতিক মেরুকরণ। আগামী ১৩ ও ১৪ মে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (এসসিবিএ) নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের দলীয় বা প্যানেলভিত্তিক অংশগ্রহণের ওপর আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সমিতির সাধারণ সদস্যদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়, যা আইনি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
যে আইনি যুক্তিতে এই নিষেধাজ্ঞা
আইনজীবীদের এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে বিদ্যমান আইনি কাঠামো। গত রোববার (২৬ এপ্রিল) বিকেলে সুপ্রিম কোর্ট বারের সাউথ হলে একটি বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) অনুষ্ঠিত হয়। সমিতির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি হুমায়ুন কবির মঞ্জুর সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সভায় প্রায় তিন শতাধিক আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।
সভার আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯। সভায় উপস্থিত আইনজীবীরা জানান, যেহেতু এই আইনের আওতায় বর্তমানে আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তাই দলটির সমর্থিত কোনো প্যানেল বা সংগঠনের (যেমন: বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ) ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নেওয়া সরাসরি আইনের পরিপন্থি। অন্তত একশ জন সাধারণ সদস্যের লিখিত দাবির প্রেক্ষিতেই এই ইজিএম ডাকা হয়েছিল এবং সেখানেই সর্বসম্মতিক্রমে দলীয় পরিচয়ে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞার এই প্রস্তাব পাস হয়।
দলীয় ব্যানারে মানা থাকলেও স্বতন্ত্র প্রার্থিতায় ছাড়
বিশেষ এই সাধারণ সভার কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে থাকা এসসিবিএ সম্পাদক ব্যারিস্টার মো. মাহফুজুর রহমান মিলন নিষেধাজ্ঞার পরিধি নিয়ে একটি সূক্ষ্ম আইনি ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, এই নিষেধাজ্ঞাটি মূলত একটি সাংগঠনিক বা প্যানেলভিত্তিক বিধিনিষেধ। অর্থাৎ, যারা সরাসরি সম্মিলিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ বা বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের পদে ছিলেন বা সংগঠনটির হয়ে প্যানেলভিত্তিক লড়তে চান, তারা এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
তবে গণতান্ত্রিক অধিকার ও পেশাজীবী সংগঠনের রীতিনীতি অনুযায়ী কোনো আইনজীবী যদি দলীয় পরিচয় সম্পূর্ণভাবে পরিহার করে ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’ হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান, তবে তার জন্য আইনি বা গঠনতান্ত্রিক কোনো বাধা থাকছে না। এর ফলে, ব্যালট পেপারে কোনো প্রার্থীর নামের পাশে আওয়ামী লীগের কোনো সংগঠনের নাম বা দলীয় পরিচয় ব্যবহারের সুযোগ এবার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল।
নির্বাচন কমিশন গঠন ও ভোটের সার্বিক প্রস্তুতি
বিশেষ সাধারণ সভায় গৃহীত এই লিখিত সিদ্ধান্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের কাছে হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া চলছে। এবারের এসসিবিএ নির্বাচন সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মিফতাহ উদ্দীন চৌধুরীকে প্রধান করে একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে। সমিতির এই নতুন সিদ্ধান্তের আলোকে তারাই প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই, প্রার্থিতা বৈধতা এবং চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
আসন্ন এই নির্বাচনকে ঘিরে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে এখন উৎসব ও কৌতূহলের আমেজ। আগামী ১৩ ও ১৪ মে দুই দিনব্যাপী এই ভোটগ্রহণে সভাপতি ও সম্পাদকসহ মোট ১৪টি পদের বিপরীতে নতুন নেতৃত্ব বেছে নেবেন আইনজীবীরা। সুপ্রিম কোর্ট বার সম্পাদকের তথ্যমতে, এবার নির্বাচনে আট হাজারের বেশি আইনজীবী ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন। একদিকে ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী প্যানেলের অনুপস্থিতি, অন্যদিকে স্বতন্ত্রদের অংশগ্রহণের সুযোগ— সব মিলিয়ে এবারের এসসিবিএ নির্বাচনে ভোটের হিসাব-নিকাশ কেমন হবে, তা দেখার অপেক্ষায় পুরো আইনজীবী সমাজ।



