বিচারক নিয়োগ ও সচিবালয় অধ্যাদেশসহ ২০টি অধ্যাদেশ বাতিলের পথে, সংসদে সুপারিশ

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক অধ্যাদেশগুলোর একটি বড় অংশ এখন কার্যকারিতা হারানোর পথে। জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ ও স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠাসহ মোট ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল বা রহিত করার সুপারিশ করেছে, যা দেশের বিচার ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
সংসদে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই করে এই সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি অধ্যাদেশ সরাসরি রহিত করার জন্য বিল আনার প্রস্তাব করা হয়েছে এবং আরও ১৬টি অধ্যাদেশ আপাতত বিল আকারে না এনে ভবিষ্যতে সংশোধন করে নতুনভাবে প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।
রহিতকরণের জন্য প্রস্তাবিত অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ। এই দুটি অধ্যাদেশ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।
বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’ গঠন করে বিচারক নিয়োগের একটি স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া চালু করার কথা ছিল। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত এই কাউন্সিল যোগ্য ব্যক্তিদের বাছাই করে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করার কথা ছিল।
অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করে একটি স্বতন্ত্র সচিবালয়ের হাতে ন্যস্ত করার পরিকল্পনা ছিল। এতে অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, শৃঙ্খলা এবং ছুটি সংক্রান্ত বিষয়গুলো একটি স্বাধীন কাঠামোর আওতায় আনার কথা বলা হয়েছিল।
কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব অধ্যাদেশ বিল আকারে পাস না হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। জানা গেছে, ১০ এপ্রিলের পর এসব অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাতে শুরু করেছে।
এছাড়া আরও ৯৮টি অধ্যাদেশ অপরিবর্তিতভাবে বিল আকারে পাস করার সুপারিশ করা হয়েছে এবং ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে উপস্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু অধ্যাদেশ—যেমন গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংক্রান্ত—এখনই পাস না করে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী করে উপস্থাপন করা হবে। তবে এসব সিদ্ধান্ত নিয়েও রাজনৈতিক মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য এ বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছেন। তাদের মতে, বিচার বিভাগকে আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী করার জন্য এসব অধ্যাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত এবং সেগুলো বাতিল করা সংস্কার প্রক্রিয়াকে পিছিয়ে দিতে পারে।
অন্যদিকে সরকারপক্ষের যুক্তি হলো, কিছু অধ্যাদেশে কারিগরি ত্রুটি ও বাস্তবায়নগত সীমাবদ্ধতা ছিল, যা সংশোধন ছাড়া কার্যকর করা সম্ভব নয়। তাই সেগুলো পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে আরও কার্যকর আইন হিসেবে প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কাঠামো এবং প্রশাসনিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে এটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে সংস্কার বনাম স্থিতিশীলতার প্রশ্নে।
সব মিলিয়ে, অধ্যাদেশগুলো বাতিল বা সংশোধনের এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশের আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



