নীলফামারীতে আদালতে আসামির প্রক্সি: হাজতখানায় জালিয়াতি ফাঁস

নীলফামারী: নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ আমলি আদালতে একটি মামলার শুনানিতে মূল আসামির পরিবর্তে অন্য এক ব্যক্তি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ‘প্রক্সি’ দেওয়ার এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। তবে শেষ রক্ষা হয়নি; জামিন নামঞ্জুর হওয়ার পর আদালতের হাজতখানায় নাম-ঠিকানা মেলাতে গিয়ে কেঁচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে আসে। ছদ্মবেশের পুরো রহস্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার এই ঘটনা এখন পুরো আদালতপাড়ায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

উন্নয়নকাজ ও অপহরণ মামলার প্রেক্ষাপট

আদালত সূত্র ও মামলার নথি থেকে জানা যায়, এই ঘটনার সূত্রপাত এলজিইডির (LGED) আওতাধীন প্রায় দুই কোটি টাকার একটি উন্নয়নকাজ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে। মামলার বাদী মো. মনির হোসেন মিয়া (৫৩) চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার বাসিন্দা এবং মেসার্স এম এস কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী।

অভিযোগ অনুযায়ী, নীলফামারীর স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি এই কাজের শ্রমিক সরবরাহের দায়িত্বে ছিলেন। তারা শ্রমিকদের প্রায় ১৮ লাখ ৯০ হাজার টাকা বকেয়া রেখে হঠাৎ কাজ বন্ধ করেন এবং অতিরিক্ত বেআইনি অর্থ দাবি করতে থাকেন। ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মনির হোসেন বকেয়া মেটাতে নীলফামারীতে গেলে অভিযুক্তরা তাঁকে ও তাঁর সহযোগীকে জিম্মি করে প্রাণনাশের ভয় দেখিয়ে নগদ ১১ লাখ ৩১ হাজার টাকা ও ৪টি দামি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। এই ঘটনায় কিশোরগঞ্জ থানায় দণ্ডবিধির ৩৪২/৩৮৬/৩৪ ধারায় একটি মামলা (জি.আর নং-২৭৪/২০২৫) দায়ের করা হয়। পুলিশ তদন্ত শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে।

জামিন নামঞ্জুর ও হাজতখানায় কান্না

সোমবার (১৮ ১৮ মে) চার্জশিটভুক্ত আসামিরা তাদের নিযুক্ত আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন জানান। উভয়পক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে কিশোরগঞ্জ আমলি আদালতের বিজ্ঞ বিচারক মো. মাহমুদুল হাসান সকল আসামির জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন এবং কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

আদালতের নির্দেশের পর আসামিদের যখন কোর্ট হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়, তখন নাম-ঠিকানা রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করার সময় এক ব্যক্তি হঠাৎ বুক ফাটানো কান্নাকাটি শুরু করেন। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের সন্দেহ হলে তারা তাঁকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন।

জিজ্ঞাসাবাদে যেভাবে ফাঁস হলো ছদ্মবেশ

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদের মুখে ওই ব্যক্তি স্বীকার করেন যে, তাঁর নাম মো. সুমন এবং তিনি এই মামলার কোনো আসামিই নন! এই মামলার প্রকৃত আসামি হলেন তাঁর খালাতো ভাই মো. মাসুদ। মাসুদের জরুরি ব্যক্তিগত সমস্যার কথা শুনে তিনি সরল বিশ্বাসে মাসুদের পরিবর্তে আদালতে ‘প্রক্সি আসামি’ হিসেবে কাঠগড়ায় এসে দাঁড়িয়েছিলেন।

কোর্ট পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি বিজ্ঞ বিচারককে অবহিত করলে সুমনকে পুনরায় আদালতের এজলাসে হাজির করা হয়। বিচারকের জেরার মুখে সুমন অকপটে নিজের দোষ স্বীকার করে বলেন, “হুজুর, আমি এই মামলার বিষয়ে বিন্দুমাত্র কিছু জানি না। খালাতো ভাইয়ের কথায় সম্পূর্ণ না বুঝে সরল বিশ্বাসে আদালতে দাঁড়িয়েছিলাম।” সুমনের বক্তব্যে জালিয়াতি ও প্রতারণার অকাট্য প্রমাণ পাওয়ায় আদালত ক্ষুব্ধ হন এবং আইনগত প্রক্রিয়া লঙ্ঘনের অপরাধে ছদ্মবেশী প্রক্সিদাতা সুমনকেও সরাসরি জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেন।

আইনজীবী ও বাদীর বক্তব্য

এই বিষয়ে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়া আসামিপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ মোরসালিন রায়হান কাকন বলেন, “আসামিরা আমাদের চেম্বারে যে তথ্য ও নথিপত্র দিয়েছিল, আমরা সেই অনুযায়ী হাজিরা ও জামিন আবেদন প্রস্তুত করেছিলাম। বিজ্ঞ আদালত জামিন নামঞ্জুর করার পরই আমরা জানতে পারি যে, মূল আসামির পরিবর্তে অন্য একজন প্রক্সি দিয়েছিলেন। আইনজীবীদের পক্ষে মক্কেলের এমন জালিয়াতি আগে থেকে ধরা কঠিন।”

অন্যদিকে, মামলার বাদী মনির হোসেন মিয়া তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আসামিরা আগে আমার টাকা ও মোবাইল ছিনতাই করেছে, আর এখন স্বয়ং আদালতের সাথে প্রতারণা ও জালিয়াতি করছে। আমি আদালতের কাছে এই জালিয়াতিরও কঠোর বিচার প্রত্যাশা করছি।” বিজ্ঞ বিচারক এই মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২৯ জুলাই ২০২৬ তারিখ নির্ধারণ করেছেন।

নিউজ রেফারেন্স: https://lawyersclubbangladesh.com/2026/05/19/proxy-accused-mystery-unfolded-at-nilphamari-kishorganj-court/

Related Articles

Back to top button