৭ বছরের শিশুকে ২১ দেখিয়ে মামলা: বাদীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার নির্দেশ

নাটোর: দেশের বিচার ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করতে মিথ্যা তথ্য প্রদান ও হয়রানিমূলক মামলার এক চাঞ্চল্যকর দৃষ্টান্ত সামনে এসেছে নাটোরে। মাত্র সাত বছর বয়সী এক শিশুকে ২১ বছর বয়স্ক যুবক সাজিয়ে হত্যাচেষ্টার মতো গুরুতর মামলা দায়ের করেছিলেন এক ব্যক্তি। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। বিষয়টি আদালতের নজরে আসার পর আদালত তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই মামলার বাদীর বিরুদ্ধেই নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়েরের নির্দেশ দিয়েছেন।

আদালতের কঠোর অবস্থান ও বাদীর ক্ষমা প্রার্থনা

মঙ্গলবার (৫ মে) নাটোরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম এই যুগান্তকারী আদেশ প্রদান করেন। আদালতের তলবে এদিন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা গুরুদাসপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) বখতিয়ার হোসেন এবং মামলার বাদী শাহানুর রহমান সশরীরে ট্রাইব্যুনালে হাজির হন।

শুনানিকালে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানান, আসামিরা আত্মগোপনে থাকায় তিনি বয়স যাচাই করতে পারেননি এবং আসামিদের মধ্যে যে একজন শিশু রয়েছে, তা কেউ পুলিশকে অবহিত করেনি। অন্যদিকে, পরিস্থিতি বেগতিক দেখে মামলার বাদী শাহানুর রহমান নিজের এই জঘন্য ভুলের জন্য আদালতের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবে আদালত তার এই ক্ষমা প্রত্যাখ্যান করে কঠোর ভাষায় বলেন, “বয়স এক-দুই বছর এদিক-ওদিক হতে পারে, কিন্তু সাত বছরের শিশুকে ২১ বছর দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। ভুল তথ্য দেওয়া গুরুতর অপরাধ, এর কোনো ক্ষমা নেই।”

শিশুকে অব্যাহতি ও পুলিশের প্রতি ৭ দিনের আল্টিমেটাম

আদালত নির্দোষ ওই শিশুটিকে দ্রুত আইনি হয়রানি থেকে মুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী সাত দিনের মধ্যে শিশুটিকে এই বানোয়াট মামলা থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (রিপোর্ট) দাখিলের জন্য মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মিথ্যা তথ্যের আইনি পরিণতি ও বাদীর সম্ভাব্য শাস্তি

আইনের চোখে সরকারি কর্মচারীকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আবদুল কাদের মিয়া এ বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, দণ্ডবিধির ১৭৭ ও ১৮২ ধারা অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীকে অসত্য তথ্য প্রদান করলে কঠোর ব্যবস্থার বিধান রয়েছে। এই অপরাধ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তের (এক্ষেত্রে বাদী শাহানুর রহমান) ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা এক হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ও মামলার পেছনের কথা

আদালত ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ৯ এপ্রিল নাটোরের গুরুদাসপুরের ধারাবারিষা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে শাহানুর রহমানের ছেলে শ্রাবণ সরকারের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনাকে পুঁজি করে পরদিন শ্রাবণের বাবা শাহানুর রহমান পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যাচেষ্টার মামলা দায়ের করেন। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সেই মামলায় তিনি সাত বছরের শিশু হুসেন আলীকেও আসামি করেন এবং অত্যন্ত চতুরতার সাথে এজাহারে তার বয়স ২১ বছর উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে শিশু হুসেনের পরিবার বিষয়টি জানতে পেরে আইনি প্রতিকার চেয়ে সরাসরি আদালতের দ্বারস্থ হলে এই ভয়াবহ জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

Related Articles

Back to top button