জুলাই অভ্যুত্থান মামলা: শ্যোন অ্যারেস্ট ঘিরে পুলিশের বাণিজ্য

ঢাকা: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে হওয়া মামলাগুলোতে আসামিদের ঢালাওভাবে জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। এর চেয়েও বড় শঙ্কার বিষয় হলো, এসব মামলায় আদালত থেকে আইনি প্রক্রিয়ায় জামিন পাওয়ার পরও কারামুক্তি মিলছে না বহু আসামির। জামিন মঞ্জুরের পর কারামুক্তির ঠিক আগমুহূর্তে অন্য কোনো মামলায় ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ (Shown Arrest) দেখিয়ে আটকে রাখা হচ্ছে তাদের। কাগজে-কলমে মুক্তি নিশ্চিত হলেও বাস্তবে জেলের তালা খুলতে পার হতে হচ্ছে পুলিশের অদৃশ্য ‘পাঁচ স্তরের ক্লিয়ারেন্স’। আর এই পুরো প্রক্রিয়া ঘিরেই অভিযোগ উঠেছে ঘাটে ঘাটে বাণিজ্য ও ব্যাপক অনিয়মের।

জামিন পেলেও কারামুক্তিতে বাধা অদৃশ্য ক্লিয়ারেন্স

আইনজ্ঞদের মতে, ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি) এবং সুপ্রিম কোর্টের নজির অনুযায়ী, আদালত একবার জামিন মঞ্জুর করলে তা কার্যকর করার দায়িত্ব প্রশাসনের। জামিনপ্রাপ্ত আসামিকে অযথা আটকে রাখা সম্পূর্ণ বেআইনি। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অনুসন্ধানে জানা যায়, আদালতের জামিন আদেশ জারির পর আসামিকে মুক্তি পেতে দীর্ঘ এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আদেশটি প্রথমে ডিএমপির ডিসি প্রসিকিউশন, এরপর বিভাগীয় পুলিশ কার্যালয়, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), সংশ্লিষ্ট থানা হয়ে চূড়ান্তভাবে আবার কারাগারে পৌঁছায়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে ঘুস লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।

জিম্মি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ

ভুক্তভোগীদের দাবি, অসাধু পুলিশ কর্মকর্তা ও দালাল চক্র এই ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়াকে হাতিয়ার বানিয়ে আসামিদের কার্যত জিম্মি করে অর্থ আদায় করছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক মামলার আসামিদের ক্ষেত্রে এই বাণিজ্য সবচেয়ে বেশি। ঢাকা জজকোর্টের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি জানান, রাজনৈতিক মামলায় জামিন পাওয়ার পরও থানা পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ না করতে পারলে কারামুক্তি প্রায় অসম্ভব। তা না হলে একই থানায় বা পাশের থানায় নতুন কোনো মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। যার ফলে আসামির স্বজনরা কারাগারের গেটে গিয়ে হতাশা নিয়ে ফিরে আসেন।

ভুক্তভোগীর বয়ান: বারবার শ্যোন অ্যারেস্ট

রাজধানীর শাহজাহানপুর থানার একটি বৈষম্যবিরোধী মামলায় গ্রেফতার হওয়া এক মাংস ব্যবসায়ীর ঘটনা এর জ্বলন্ত প্রমাণ। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে তাকে প্রথমে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে আদালত থেকে জামিন পেলেও তিনি বের হতে পারেননি। স্বজনরা কারাফটকে গিয়ে জানতে পারেন, তাকে অন্য একটি মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে। এভাবে পর্যায়ক্রমে তিনটি মামলায় তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে এবং সংশ্লিষ্ট থানাকে ‘ম্যানেজ’ করে তবেই তিনি কারামুক্ত হন বলে অভিযোগ করেন।

অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন ঘিরে নতুন বাণিজ্য

অন্যদিকে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যারা বিরোধিতা করেননি, এমন অনেক নিরপরাধ ব্যক্তিকেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব মামলায় জড়ানো হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই হয়রানি বন্ধে ফৌজদারি কার্যবিধিতে ১৭৩(ক) ধারা সংযোজন করেছে, যার উদ্দেশ্য তদন্ত শেষে নিরপরাধদের অব্যাহতি দেওয়া। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই ‘অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন’ ঘিরেও চলছে বাণিজ্য। অর্থের বিনিময়ে নিরপরাধ ব্যক্তিদের পাশাপাশি বিগত সরকারের পদধারী অনেক প্রকৃত অপরাধী ও সহিংসতায় জড়িতদেরও অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।

ডিএমপির বক্তব্য

এসব অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের মুখপাত্র এনএম নাসিরুদ্দিন জানান, আদালত থেকে জামিন হওয়ার পর কারামুক্তির ক্ষেত্রে পুলিশের কোনো আলাদা ক্লিয়ারেন্স নেওয়ার নিয়ম নেই। আদালতের আদেশ অনুযায়ীই কারামুক্তি পাওয়ার কথা। অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে বাণিজ্যের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেন যে, পদ-পদবি দেখে কাউকে ভিন্নভাবে মূল্যায়নের সুযোগ নেই। তবে এ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পেলে ডিএমপি অবশ্যই তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Related Articles

Back to top button