পেশাগত অসদাচরণ: বার কাউন্সিলে অভিযোগের দরখাস্ত মুসাবিদা

প্রশ্ন: একজন আইনজীবী বিচারককে ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে তার মক্কেলের জামিন করিয়ে দিবেন আশ্বাস দিয়ে মক্কেলের আত্মীয়ের নিকট থেকে অগ্রীম ৪০,০০০ টাকা গ্রহণ করেন। কিন্তু আদালত উক্ত মক্কেলের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। আইনজীবী মক্কেলের আত্মীয়কে কোনো টাকা দেননি। তৎপ্রেক্ষিতে উক্ত মক্কেলের আত্মীয় সংশ্লিষ্ট আইনজীবীর বিরুদ্ধে The Canons of Professional Conduct and Etiquette অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আপনার শরণাপন্ন হয়েছেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান উল্লেখ করে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নিকট দায়েরের জন্য একটি দরখাস্ত প্রস্তুত করুন।

ভূমিকা ও আইনি বিধান (Legal Provisions):

আইন পেশা একটি মহান এবং সম্মানজনক পেশা। একজন আইনজীবীর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো আদালতের মর্যাদা সমুন্নত রাখা এবং মক্কেলের স্বার্থ বিশ্বস্ততার সাথে রক্ষা করা। উল্লিখিত ঘটনায় আইনজীবী বিচারককে ঘুষ দেওয়ার নাম করে টাকা গ্রহণ করে এবং আত্মসাৎ করে চরম পেশাগত অসদাচরণ (Professional Misconduct) করেছেন। এই কাজের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল প্রণীত “The Canons of Professional Conduct and Etiquette”-এর নিম্নোক্ত বিধানসমূহ চরমভাবে লঙ্ঘন করেছেন:

  • আদালতের প্রতি কর্তব্য (Chapter III – Duty to the Court): বিচারককে ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব বা দাবি করা আদালতের পবিত্রতা ও নিরপেক্ষতার প্রতি চরম অবমাননা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট করার সামিল।
  • মক্কেলের প্রতি কর্তব্য (Chapter II – Conduct with regard to Clients): মক্কেলের সাথে প্রতারণা করা, মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া এবং মক্কেলের টাকা আত্মসাৎ করা পেশাগত বিশ্বস্ততার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

এই অসদাচরণের জন্য বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২ এর ৩২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উক্ত আইনজীবীর বিরুদ্ধে বার কাউন্সিলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (Disciplinary Proceeding) গ্রহণের আবেদন করতে হবে। নিচে মক্কেলের আত্মীয়ের পক্ষে একটি দরখাস্তের মুসাবিদা প্রস্তুত করা হলো:


দরখাস্তের মুসাবিদা (Draft of the Complaint Petition):

বরাবর,
সচিব,
বাংলাদেশ বার কাউন্সিল,
বার কাউন্সিল ভবন, শাহবাগ, ঢাকা-১০০০।

বিষয়: বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২ এর ৩২ অনুচ্ছেদ এবং ‘The Canons of Professional Conduct and Etiquette’ লঙ্ঘনের দায়ে অ্যাডভোকেট জনাব [অভিযুক্ত আইনজীবীর নাম]-এর বিরুদ্ধে পেশাগত অসদাচরণের (Professional Misconduct) অভিযোগ এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন।

অভিযোগকারী:
নাম: মো. আব্দুর রহমান (মক্কেলের বড় ভাই)
পিতা: মো. আব্দুল করিম
ঠিকানা: বাসা নং- ১০, রোড নং- ৫, মিরপুর, ঢাকা।
মোবাইল: ০১৭১২-XXXXXX

বনাম

অভিযুক্ত আইনজীবী:
নাম: অ্যাডভোকেট জনাব [অভিযুক্তের নাম] সদস্য, ঢাকা আইনজীবী সমিতি
চেম্বার ঠিকানা: রুম নং- ২০২, ঢাকা জজ কোর্ট ভবন, ঢাকা।
সনদ নং: [সনদ নম্বর, যদি জানা থাকে]

জনাব,
বিনীত নিবেদন এই যে, আমি নিম্নস্বাক্ষরকারী অভিযোগকারী উপরোক্ত অভিযুক্ত আইনজীবীর বিরুদ্ধে নিম্নবর্ণিত সুনির্দিষ্ট কারণ ও তথ্যাদির ভিত্তিতে পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগ দায়ের করছি:

  1. আমার ছোট ভাই মো. আরিফ হোসেন একটি মিথ্যা ফৌজদারি মামলায় (মামলা নং- ২৫/২০২৪, ধারা: দণ্ডবিধির ৩৯২) গত ১৫/০৩/২০২৪ তারিখে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে জেল হাজতে যায়।
  2. আমার ভাইয়ের জামিন শুনানির জন্য আমি ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জনাব [অভিযুক্তের নাম]-এর শরণাপন্ন হই এবং তিনি আমার ভাইয়ের পক্ষে ওকালতনামা গ্রহণ করেন। তার আইনি ফিস বাবদ আমি তাকে ১০,০০০/- (দশ হাজার) টাকা প্রদান করি।
  3. গত ২০/০৩/২০২৪ তারিখে অভিযুক্ত আইনজীবী আমাকে তার চেম্বারে ডেকে জানান যে, মামলার পরিস্থিতি জটিল, তবে সংশ্লিষ্ট বিচারককে ৪০,০০০/- (চল্লিশ হাজার) টাকা ঘুষ প্রদান করলে তিনি নিশ্চিতভাবে জামিন করিয়ে দেবেন। বিচারককে ম্যানেজ করার কথা বলে তিনি আমার নিকট থেকে অগ্রিম ঐ ৪০,০০০/- টাকা নগদ গ্রহণ করেন (যার সাক্ষী আমার সাথে থাকা অপর দুই আত্মীয়)।
  4. পরবর্তীতে গত ২৫/০৩/২০২৪ তারিখে মাননীয় আদালত আমার ভাইয়ের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।
  5. জামিন নামঞ্জুর হওয়ার পর আমি অভিযুক্ত আইনজীবীর কাছে গিয়ে বিচারককে দেওয়ার জন্য নেওয়া ঘুষের ঐ ৪০,০০০/- টাকা ফেরত চাইলে তিনি টাকা ফেরত দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানান। এমনকি তিনি আমার সাথে চরম দুর্ব্যবহার করেন এবং আমাকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে তার চেম্বার থেকে বের করে দেন।
  6. অভিযুক্ত আইনজীবীর এরূপ কর্মকাণ্ড “The Canons of Professional Conduct and Etiquette”-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি বিচারকের নামে ঘুষ চেয়ে আদালতের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করেছেন এবং একজন বিচারপ্রার্থীর অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে প্রতারণামূলকভাবে অর্থ আত্মসাৎ করে চরম পেশাগত অসদাচরণ করেছেন।

প্রার্থনা (Prayer):

অতএব, বিনীত প্রার্থনা এই যে, উপরোক্ত অভিযোগটি সদয় আমলে গ্রহণ করে বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২ এর ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিষয়টি শৃঙ্খলামূলক ট্রাইব্যুনালে (Disciplinary Tribunal) প্রেরণপূর্বক সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্ত অ্যাডভোকেট জনাব [অভিযুক্তের নাম]-এর আইন পেশার সনদ বাতিল/স্থগিত করাসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আদেশ দানে মর্জি হয়।

সংযুক্তি:
১. ওকালতনামা ও মামলার কাগজপত্রের ফটোকপি।
২. অভিযোগকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
৩. বার কাউন্সিলের বিধি মোতাবেক নির্ধারিত ফি জমার ব্যাংক রসিদ।

সত্যপাঠ (Verification):
আমি শপথপূর্বক ঘোষণা করছি যে, অত্র দরখাস্তের ১ থেকে ৬ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত সকল তথ্য আমার নিজ জ্ঞান ও বিশ্বাসমতে সম্পূর্ণ সত্য। এতে কোনো তথ্য গোপন করা হয়নি। সত্যপাঠে স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে অদ্য ০৪ মে, ২০২৬ তারিখে আমি নিজ স্বাক্ষর প্রদান করলাম।

বিনীত নিবেদক,

(স্বাক্ষর)

মো. আব্দুর রহমান
তারিখ: ০৪/০৫/২০২৬

Related Articles

Back to top button