লিখিত স্বীকৃতি ও তামাদির মেয়াদ বৃদ্ধি: তামাদি আইন, ১৯০৮ (Section 19)

প্রশ্ন: The limitation Act, 1908 এর বিধান অনুযায়ী তামাদির মেয়াদ গণনার ক্ষেত্রে লিখিত স্বীকৃতির (Acknowledgement in Writing) ফলাফল কী? মক্কেলের পক্ষে তার নিযুক্ত আইনজীবী কর্তৃক প্রদত্ত কোনো লিখিত স্বীকৃতি আইনগত বৈধ কি? সংশ্লিষ্ট আইন উল্লেখে উত্তর দিন।
ভূমিকা ও প্রাসঙ্গিক ধারা: তামাদি আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো একটি নির্দিষ্ট সময় পর মামলার অধিকার বিলুপ্ত করা। তবে পাওনাদার বা দাবিদারের অধিকার সুরক্ষার্থে তামাদি আইন (The Limitation Act), ১৯০৮ এর ১৯ ধারায় ‘লিখিত স্বীকৃতির’ (Acknowledgement in Writing) মাধ্যমে তামাদির মেয়াদ নতুন করে শুরু হওয়ার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধান সন্নিবেশিত করা হয়েছে।
লিখিত স্বীকৃতির (Acknowledgement in Writing) ফলাফল:
তামাদি আইনের ১৯(১) ধারা অনুযায়ী তামাদির মেয়াদ গণনার ক্ষেত্রে লিখিত স্বীকৃতির ফলাফল নিম্নরূপ:
কোনো সম্পত্তি বা অধিকারের ব্যাপারে তামাদির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে যদি সেই ব্যক্তি (যাঁর বিরুদ্ধে উক্ত সম্পত্তি বা অধিকার দাবি করা হচ্ছে) দায় স্বীকার করে কোনো লিখিত দলিলে স্বাক্ষর করেন, তবে উক্ত স্বীকৃতি যে তারিখে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেই তারিখ হতে তামাদির একটি নতুন মেয়াদ (Fresh period of limitation) গণনা শুরু হবে।
লিখিত স্বীকৃতির মাধ্যমে নতুন মেয়াদ শুরু হওয়ার শর্তসমূহ:
- স্বীকৃতিটি অবশ্যই লিখিত হতে হবে।
- যাঁর বিরুদ্ধে অধিকার দাবি করা হচ্ছে, স্বীকৃতিতে তাঁর স্বাক্ষর থাকতে হবে।
- স্বীকৃতিটি অবশ্যই মূল মামলা দায়েরের তামাদির মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বে প্রদান করতে হবে। (মেয়াদ শেষ হওয়ার পর স্বীকৃতি দিলে নতুন করে তামাদির মেয়াদ শুরু হবে না)।
- স্বীকৃতিতে অবশ্যই দায় বা অধিকারের বিষয়টি স্পষ্ট বা অন্তত অনুমানযোগ্য হতে হবে।
মক্কেলের পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবীর লিখিত স্বীকৃতির আইনি বৈধতা:
মক্কেলের পক্ষে তার নিযুক্ত আইনজীবী কর্তৃক প্রদত্ত লিখিত স্বীকৃতি সম্পূর্ণ আইনগতভাবে বৈধ।
এর আইনি ভিত্তি হলো তামাদি আইনের ১৯ ধারার ২নং ব্যাখ্যা (Explanation II)। এই ব্যাখ্যায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, এই ধারার অধীন “স্বাক্ষরিত” (Signed) বলতে কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃক ব্যক্তিগতভাবে স্বাক্ষর করাকেই বোঝায় না, বরং তার পক্ষে যথাযথভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো প্রতিনিধি (Duly authorized agent) কর্তৃক স্বাক্ষর করাকেও বোঝায়।
যেহেতু একজন নিযুক্ত আইনজীবী (Advocate বা Pleader) ওকালতনামা (Vakalatnama) সম্পাদনের মাধ্যমে তার মক্কেলের পক্ষে আইনি কার্য পরিচালনার জন্য আইনানুগভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত হন, তাই তার প্রদত্ত লিখিত ও স্বাক্ষরিত স্বীকৃতি মক্কেলের নিজের দেওয়া স্বীকৃতি হিসেবেই আইনের দৃষ্টিতে গণ্য হবে এবং তা তামাদির মেয়াদ বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।
লিগ্যাল ম্যাক্সিম ও আইনি নীতি (Legal Maxims and Principles):
- “Qui facit per alium facit per se” (যে ব্যক্তি অন্যের মাধ্যমে কাজ করে, সে নিজেই তা করে): এই এজেন্সি নীতির কারণেই আইনজীবীর স্বীকৃতি মক্কেলের স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হয়।
- “Vigilantibus non dormientibus jura subveniunt” (আইন সজাগ ব্যক্তিকে সাহায্য করে, ঘুমন্ত ব্যক্তিকে নয়): তামাদি আইনের এই সাধারণ নীতির ব্যতিক্রম হলো ১৯ ধারা। যখন বিবাদী নিজেই তার দায় স্বীকার করে নেয়, তখন বাদীর অধিকার নতুন করে সজাগ হয় এবং আইন তাকে মামলা করার জন্য নতুন সময়সীমা প্রদান করে।
উদাহরণ (Example):
ধরা যাক, ‘ক’ ‘খ’-এর কাছ থেকে ৫ লক্ষ টাকা ঋণ নেয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী টাকা আদায়ের তামাদির মেয়াদ শেষ হবে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এখন, ২০২২ সালের ১ নভেম্বর (অর্থাৎ তামাদির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই) ‘ক’ নিজে অথবা তার নিযুক্ত আইনজীবী একটি চিঠির মাধ্যমে ‘খ’-কে জানায় যে, “আপনার পাওনা ৫ লক্ষ টাকার বিষয়টি আমাদের বিবেচনায় আছে এবং আমরা তা পরিশোধের চেষ্টা করছি।”
যেহেতু এই চিঠিটি একটি স্বাক্ষরিত ‘লিখিত স্বীকৃতি’ এবং তা তামাদির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দেওয়া হয়েছে, তাই তামাদি আইনের ১৯ ধারা অনুযায়ী ওই ১ নভেম্বর ২০২২ তারিখ হতে পাওনা আদায়ের জন্য ‘খ’-এর অনুকূলে পুনরায় নতুন করে ৩ বছরের তামাদির মেয়াদ শুরু হবে।
উপসংহার (Conclusion):
পরিশেষে বলা যায়, তামাদি আইনের ১৯ ধারার বিধানটি দেনাদার ও পাওনাদার উভয়ের জন্যই একটি ভারসাম্যপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এটি পাওনাদারকে তড়িঘড়ি করে মামলা করা থেকে বিরত রাখে, যখন দেনাদার তার দায় মেনে নেয়। আর এই দায় স্বীকারের ক্ষেত্রে মক্কেলের পাশাপাশি তার নিযুক্ত ক্ষমতাপ্রাপ্ত আইনজীবীর স্বাক্ষরও সমভাবে আইনগত বৈধতা বহন করে, যা দেওয়ানি বিচার প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক ও স্বীকৃত রীতি।
