দলিলের লিখিত বিষয়বস্তুর বিরুদ্ধে মৌখিক সাক্ষ্য: সাক্ষ্য আইনের বিধান

প্রশ্ন: কোন ক্ষেত্রে একটি দলিলের লিখিত বিষয়বস্তুর বিরুদ্ধে মৌখিক সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য? The Evidence Act, 1872 এর সংশ্লিষ্ট বিধানের আলোকে ব্যাখ্যা করুন।

ভূমিকা ও প্রাসঙ্গিক ধারা (General Rule): সাক্ষ্য আইন (The Evidence Act), ১৮৭২-এর ৯১ ধারা অনুযায়ী, কোনো চুক্তি, অনুদান বা সম্পত্তির বিলি-বন্দেজের শর্তাবলী যখন দলিলে লিপিবদ্ধ করা হয়, তখন তা প্রমাণের জন্য দলিলটিকেই আদালতে উপস্থাপন করতে হয়। এর ধারাবাহিকতায় ৯২ ধারায় সাধারণ নিয়ম হিসেবে বলা হয়েছে যে, যখন কোনো দলিলের শর্তাবলী ৯১ ধারা অনুযায়ী প্রমাণিত হয়, তখন চুক্তির পক্ষগণের মধ্যে ওই দলিলের শর্তগুলোর বিরোধিতা, পরিবর্তন, সংযোজন বা বিয়োজন (Contradicting, varying, adding to, or subtracting from) করার উদ্দেশ্যে কোনো মৌখিক সাক্ষ্য (Oral Evidence) গ্রহণ করা যাবে না।

তবে এই নিয়মটি নিরঙ্কুশ নয়। সাক্ষ্য আইনের ৯২ ধারায় ৬টি শর্ত বা ব্যতিক্রম (Provisos) উল্লেখ করা হয়েছে, যে ক্ষেত্রগুলোতে একটি দলিলের লিখিত বিষয়বস্তুর বিরুদ্ধে বা বাইরে গিয়েও মৌখিক সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য।

দলিলের লিখিত বিষয়বস্তুর বিরুদ্ধে মৌখিক সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হওয়ার ক্ষেত্রসমূহ (Exceptions under Section 92):

  • ১. দলিলের বৈধতা ক্ষুণ্ণকারী বিষয় (Proviso 1): কোনো ঘটনা যা দলিলটিকে আইনত বাতিল বা অকার্যকর করে দেয়, তা প্রমাণের জন্য মৌখিক সাক্ষ্য দেওয়া যায়। যেমন— জালিয়াতি, প্রতারণা (Fraud), ভীতি প্রদর্শন (Intimidation), বেআইনি উদ্দেশ্য, চুক্তি সম্পাদনে যোগ্যতার অভাব, পণের ব্যর্থতা (Failure of consideration) অথবা ঘটনা বা আইনের ভুল (Mistake)।
  • ২. পৃথক মৌখিক চুক্তি (Proviso 2): দলিলে যে বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই (Silent) এবং যা দলিলের লিখিত শর্তের সাথে সাংঘর্ষিক নয় (Not inconsistent), এমন কোনো বিষয়ে পক্ষগণের মধ্যে কোনো পৃথক মৌখিক চুক্তি হয়ে থাকলে তা প্রমাণের জন্য মৌখিক সাক্ষ্য দেওয়া যাবে। এক্ষেত্রে আদালত দলিলের আনুষ্ঠানিকতার মাত্রা বিবেচনা করবেন।
  • ৩. পূর্বশর্তমূলক চুক্তি (Proviso 3): দলিলে উল্লিখিত কোনো বাধ্যবাধকতা কার্যকর হওয়ার আগে কোনো পূর্বশর্ত (Condition precedent) পালনের জন্য পক্ষগণের মধ্যে পৃথক কোনো মৌখিক চুক্তি থাকলে, তা প্রমাণের জন্য মৌখিক সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য।
  • ৪. চুক্তি রদ বা পরিবর্তনের পরবর্তী মৌখিক চুক্তি (Proviso 4): দলিলটি বাতিল (Rescind) বা পরিবর্তন (Modify) করার উদ্দেশ্যে পরবর্তীতে পক্ষগণের মধ্যে কোনো স্বতন্ত্র মৌখিক চুক্তি হয়ে থাকলে তা প্রমাণ করা যাবে। (তবে আইন অনুযায়ী যে দলিল লিখিত ও নিবন্ধিত (Registered) হওয়া বাধ্যতামূলক, তার ক্ষেত্রে এই মৌখিক সাক্ষ্য দেওয়া যাবে না)।
  • ৫. প্রথা বা রীতি (Proviso 5): কোনো নির্দিষ্ট চুক্তির ক্ষেত্রে যদি স্থানীয় কোনো প্রথা বা রীতি (Custom or usage) সাধারণত যুক্ত থাকে, যা দলিলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি, তবে সেই প্রথা প্রমাণের জন্য মৌখিক সাক্ষ্য দেওয়া যায়। তবে শর্ত হলো, উক্ত প্রথা দলিলের লিখিত শর্তের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারবে না।
  • ৬. পারিপার্শ্বিক অবস্থা (Proviso 6): দলিলের ব্যবহৃত ভাষা বিদ্যমান বাস্তব বা পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে কীভাবে সম্পর্কিত, তা আদালতকে বোঝানোর জন্য মৌখিক সাক্ষ্য প্রদান করা যেতে পারে।

লিগ্যাল ম্যাক্সিম ও আইনি নীতি (Legal Maxims and Principles):

  • “Best Evidence Rule” (সর্বোত্তম সাক্ষ্যের নীতি): ৯১ ও ৯২ ধারার মূল ভিত্তি হলো এই নীতি। দালিলিক সাক্ষ্য হলো সর্বোত্তম সাক্ষ্য। তবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং প্রতারণা রোধ করতেই ৯২ ধারার ব্যতিক্রমগুলো (Provisos) রাখা হয়েছে, যাতে কেউ কাগজের দলিলে কারসাজি করে আইনের ফাঁক গলে পার পেতে না পারে।
  • “Fraud vitiates everything”: প্রতারণা সবকিছুকে বাতিল করে দেয়। দলিলে যা-ই লেখা থাকুক না কেন, তা যদি প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত হয়, তবে ১ম শর্ত অনুযায়ী তা মৌখিক সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণ করে বাতিল করা যায়।

উদাহরণ (Example):

ধরা যাক, ‘ক’ একটি জমি বিক্রির দলিল ‘খ’-এর বরাবরে সম্পাদন করে দিলো এবং দলিলে লেখা থাকলো যে ‘ক’ জমির সম্পূর্ণ মূল্য ৫ লক্ষ টাকা বুঝিয়া পাইয়াছে। কিন্তু পরবর্তীতে ‘ক’ আদালতে মামলা করে দাবি করলো যে, ‘খ’ তাকে ভয় দেখিয়ে (Intimidation) এবং জোরপূর্বক দলিলে স্বাক্ষর করিয়েছে, সে কোনো টাকা পায়নি। ৯২ ধারার সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী দলিলের বাইরে কিছু বলা যায় না, কিন্তু ৯২ ধারার ১ম শর্ত (Proviso 1) অনুযায়ী, ‘ক’ তার এই ভীতি প্রদর্শন ও প্রতারণার দাবিটি প্রমাণের জন্য দলিলের লিখিত কথার বিরুদ্ধে আদালতে মৌখিক সাক্ষ্য দিতে পারবে।

উপসংহার (Conclusion):

পরিশেষে বলা যায়, সাক্ষ্য আইনের ৯১ ও ৯২ ধারা মূলত লিখিত চুক্তির পবিত্রতা ও নিশ্চয়তা রক্ষার জন্য প্রণীত হয়েছে, যাতে মানুষ চুক্তির শর্ত নিয়ে ইচ্ছেমতো বিভ্রান্তি ছড়াতে না পারে। কিন্তু একই সাথে, আইনের এই কঠোরতা যেন কোনো অন্যায়ের হাতিয়ার না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রেখেই ৯২ ধারার ৬টি ব্যতিক্রম যুক্ত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে বিশেষ পরিস্থিতিতে দলিলের বিষয়বস্তুর বিরুদ্ধেও সত্য উদ্ঘাটনের জন্য মৌখিক সাক্ষ্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়।

Related Articles

Back to top button