কুকি-চিন মামলায় জামিন জালিয়াতি: বেঞ্চ অফিসার বরখাস্ত

ঢাকা: দেশের সর্বোচ্চ আদালতে চাঞ্চল্যকর জামিন জালিয়াতির ঘটনায় এবার কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গোষ্ঠী কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সদস্যদের জন্য তৈরি পোশাক জব্দের মামলায় প্রধান আসামির ভুয়া জামিন আদেশের নেপথ্যে জড়িত থাকার অভিযোগে হাইকোর্টের এক বেঞ্চ অফিসারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তা ও প্রশাসনের পদক্ষেপ

সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ওই বেঞ্চ অফিসারের নাম জাকির হোসেন। প্রাথমিক তদন্তে জালিয়াতির সাথে তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়ায় তাকে কেবল দায়িত্ব থেকেই সরিয়ে দেওয়া হয়নি, বরং কেন তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ও স্থায়ী শাস্তিমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না— তা জানতে চেয়ে একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) জারি করা হয়েছে। গত ২৯ এপ্রিল অ্যাটর্নি জেনারেল এই জালিয়াতির বিষয়টি প্রধান বিচারপতির নজরে আনলে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশনার আলোকেই প্রশাসন এই দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে।

যেভাবে সাজানো হয়েছিল জালিয়াতির নিখুঁত ছক

তদন্তকারী সূত্রগুলো জালিয়াতির এক ভয়াবহ চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরেছে। জানা যায়, প্রায় সাত মাস আগে ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি আব্দুল্লাহ ইউসুফ সুমনের বেঞ্চে চট্টগ্রামের ‘রিংভো অ্যাপারেলস’-এর মালিক সাহেদুল ইসলামের জামিন আবেদন শুনানির জন্য ওঠে। শুনানিতে আদালতকে বিভ্রান্ত করতে সুকৌশলে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি সাধারণ মামলার এজাহার উপস্থাপন করা হয়, যেখানে কুকি-চিন বা রাষ্ট্রবিরোধী কোনো অভিযোগের উল্লেখই ছিল না।

আদালত সেই সাজানো সাধারণ মামলার তথ্যের ভিত্তিতে সরল বিশ্বাসে জামিন মঞ্জুর করেন। এরপর মূল জালিয়াতির কাজটি করা হয় লিখিত আদেশে। আদেশের প্রথম পৃষ্ঠায় থাকা মামলার নম্বর, থানার নাম এবং অভিযোগের ধারা বদলে সেখানে কুকি-চিনের পোশাক জব্দের মামলার নম্বর ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ধারা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এই ভুয়া আদেশটিই সংশ্লিষ্ট কারাগারে দাখিল করে কারামুক্ত হন প্রধান আসামি সাহেদুল।

যে ভুলে ধরা পড়ল জালিয়াতি

এত বড় জালিয়াতির ঘটনাটি হয়তো লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যেত। কিন্তু সম্প্রতি ওই একই মামলার অপর এক আসামি উচ্চ আদালতে জামিন চাইতে আসেন। শুনানিকালে তার আইনজীবীরা সাহেদুলের জামিন পাওয়ার ভুয়া আদেশটিকে ‘নজির’ (Precedent) হিসেবে আদালতের সামনে তুলে ধরেন। তখনই নথিপত্র যাচাই করতে গিয়ে রেকর্ডের সাথে আদেশের অমিল পাওয়া যায় এবং এই বিশাল জালিয়াতি ধরা পড়ে।

মামলার মূল প্রেক্ষাপট ও নেপথ্যের চুক্তি

গত ২০২৫ সালের ১৭ মে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি এলাকায় সাহেদুল ইসলামের মালিকানাধীন ‘রিংভো অ্যাপারেলস’-এর গুদাম থেকে কেএনএফ-এর জন্য তৈরি ২০ হাজার ৩০০টি বিশেষ পোশাক জব্দ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, প্রায় দুই কোটি টাকার চুক্তিতে এসব পোশাক তৈরি করা হচ্ছিল। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা মামলায় সাহেদুল ছাড়াও গোলাম আজম (৪১) ও নিয়াজ হায়দারকে (৩৯) আসামি করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন মনে করছে, হাইকোর্ট বিভাগের কোনো বেঞ্চ কর্মকর্তা বা ফৌজদারি শাখার কর্মচারীর গভীর যোগসাজশ ছাড়া এত বড় জালিয়াতি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তদন্তের পরিধি বাড়িয়ে চক্রের অন্যান্য সদস্যদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে।

Related Articles

Back to top button