তামাদির মেয়াদ বৃদ্ধিতে পক্ষগণের চুক্তি: তামাদি আইন, ১৯০৮ এর ৩ ধারা

প্রশ্ন: “পক্ষগণ একমত হয়েও তামাদির মেয়াদ বৃদ্ধি করতে পারেন না।” The limitation Act, 1908 এর Section 3 অনুযায়ী বক্তব্যটি ব্যাখ্যা করুন।

ভূমিকা ও প্রাসঙ্গিক ধারা: বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা রোধ করা এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর মামলা-মোকদ্দমার অবসান ঘটানোই হলো তামাদি আইন (The Limitation Act), ১৯০৮ এর মূল উদ্দেশ্য। এই আইনের ৩ ধারা তামাদি আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বাধ্যতামূলক বিধান (Mandatory provision)। এই ধারার বিধানটি এতই কঠোর যে, মামলার পক্ষগণ পারস্পরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েও এর নির্ধারিত মেয়াদ বৃদ্ধি করতে বা এড়াতে পারেন না।

তামাদি আইনের ৩ ধারার বিধান (Provisions of Section 3):

তামাদি আইনের ৩ ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, প্রথম তফসিলে (First Schedule) নির্ধারিত তামাদির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর যদি কোনো মামলা (Suit) দায়ের করা হয়, কোনো আপিল (Appeal) করা হয় বা কোনো দরখাস্ত (Application) পেশ করা হয়, তবে বিবাদী পক্ষ তামাদির কোনো প্রশ্ন বা আপত্তি উত্থাপন না করলেও আদালত উক্ত মামলা, আপিল বা দরখাস্তটি খারিজ (Dismiss) করে দেবেন।

অর্থাৎ, তামাদির মেয়াদ শেষে মামলা গ্রহণ না করা বা খারিজ করে দেওয়া আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক একটি দায়িত্ব। বিবাদী যদি আদালতে এসে মৌখিকভাবে বা লিখিত জবাবে বলে যে “আমার তামাদি নিয়ে কোনো আপত্তি নেই”, তবুও আদালত মামলাটি খারিজ করে দিতে বাধ্য।

পক্ষগণ কেন একমত হয়েও তামাদির মেয়াদ বৃদ্ধি করতে পারেন না? এর আইনি ব্যাখ্যা:

  • পাবলিক পলিসি বা জনস্বার্থ (Public Policy): তামাদি আইন কোনো ব্যক্তিগত বা প্রাইভেট আইন নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের বৃহত্তর জনস্বার্থ বা ‘Public Policy’-এর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এর উদ্দেশ্য হলো মানুষকে অনন্তকাল ধরে আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে না রাখা। তাই ব্যক্তিগত চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের এই বৃহত্তর নীতিকে বাতিল করা যায় না।
  • চুক্তি আইনের সাথে সাংঘর্ষিক: তামাদির মেয়াদ হলো সংবিধিবদ্ধ আইন (Statutory Law)। চুক্তি আইন (The Contract Act), ১৮৭২ এর ২৩ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো চুক্তির উদ্দেশ্য বা বিষয়বস্তু এমন হয় যা প্রচলিত কোনো আইনের বিধানকে ব্যর্থ (Defeat) করে দেয়, তবে উক্ত চুক্তিটি বেআইনি এবং বাতিল (Void)। যেহেতু তামাদির মেয়াদ বাড়ানোর চুক্তি তামাদি আইনের ৩ ধারাকে ব্যর্থ করে, তাই এটি আইনত একটি বাতিল চুক্তি।
  • আদালতের এখতিয়ার (Jurisdiction of Court): তামাদির মেয়াদ পার হয়ে যাওয়ার পর মামলা বিচার করার আইনগত এখতিয়ার আদালতের থাকে না। আইনি নীতি হলো— পক্ষগণের সম্মতি কখনো আদালতকে এখতিয়ার প্রদান করতে পারে না (Consent cannot confer jurisdiction)।

লিগ্যাল ম্যাক্সিম ও আইনি নীতি (Legal Maxims and Principles):

  • “Statute of limitation is a statute of repose, peace, and justice”: তামাদি আইন হলো শান্তি, বিশ্রাম ও ন্যায়বিচারের আইন। সমাজকে অন্তহীন মামলা-মোকদ্দমার হাত থেকে রেহাই দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যই এই আইনের কঠোর প্রয়োগ বাঞ্ছনীয়।
  • “No agreement can defeat the provisions of law” (কোনো চুক্তি আইনের বিধানকে ব্যর্থ করতে পারে না): আইন যেখানে একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়েছে, সেখানে চুক্তির মাধ্যমে তা পরিবর্তন করার ক্ষমতা কোনো ব্যক্তির নেই।

উদাহরণ (Example):

ধরা যাক, ‘ক’ ‘খ’-এর কাছ থেকে ১ লক্ষ টাকা ঋণ নিলো। চুক্তি অনুযায়ী ১ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে টাকা ফেরত দেওয়ার কথা। টাকা আদায়ের জন্য মানি স্যুট (Money Suit) দায়ের করার তামাদির মেয়াদ ৩ বছর, অর্থাৎ ১ জানুয়ারি ২০২৩ তারিখ পর্যন্ত।

এখন ‘ক’ ও ‘খ’ যদি পারস্পরিক সম্মতিতে একটি লিখিত চুক্তি করে যে, “এই ঋণের ক্ষেত্রে আমাদের মধ্যে তামাদির মেয়াদ ৩ বছরের পরিবর্তে ৫ বছর হবে”, তবে এই চুক্তিটি চুক্তি আইনের ২৩ ধারা অনুযায়ী সম্পূর্ণ বাতিল। ১ জানুয়ারি ২০২৩ এর পর ‘খ’ যদি মামলা দায়ের করে, তবে ‘ক’ আপত্তি না জানালেও আদালত তামাদি আইনের ৩ ধারার ক্ষমতাবলে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে (Suo motu) মামলাটি খারিজ করে দেবেন।

উপসংহার (Conclusion):

পরিশেষে বলা যায়, তামাদি আইনের ৩ ধারা একটি পরম এবং অলঙ্ঘনীয় বিধান। আইন দ্বারা নির্ধারিত সময়সীমা রাষ্ট্রের তৈরি করা একটি গণ্ডি, যা পার হওয়ার পর আইনি প্রতিকারের দরজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়। যেহেতু এই আইনটি জনস্বার্থে প্রণীত, তাই ব্যক্তিগত চুক্তির মাধ্যমে বা পক্ষগণের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে তামাদির মেয়াদ বৃদ্ধি করা, শিথিল করা বা মওকুফ করা কোনোভাবেই আইনসিদ্ধ নয়।

Related Articles

Back to top button