চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মামলায় স্বত্ব চূড়ান্তভাবে প্রমাণের প্রয়োজন নেই | হাইকোর্ট

সারসংক্ষেপ: চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার (Permanent Injunction) মামলায় বাদীর নিরবচ্ছিন্ন ও বৈধ দখল প্রমানিত হওয়াই মুখ্য বিষয়। এই ধরনের মামলায় স্বত্ব বা মালিকানার (Title) প্রশ্নটি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করার প্রয়োজন নেই। আদালত কেবল আনুষঙ্গিকভাবে স্বত্বের বিষয়টি দেখবে যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, বাদী কোনো জবরদখলকারী বা অবৈধ দখলদার (Usurper/Trespasser) নন। এই মামলায় দেওয়া ডিক্রি পরবর্তীতে কোনো স্বত্বের মামলায় ‘রেস-জুডিকাটা’ (Res-judicata) হিসেবে কাজ করবে না।
বিচারপতি: মো: রেজাউল হাসান, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য হলো একজন আপাত বৈধ দখলদারকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ থেকে রক্ষা করা এবং বিবাদীদের আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া থেকে বিরত রাখা। তাই কেবল বৈধ দখল প্রমাণের ভিত্তিতেই এই ডিক্রি দেওয়া আইনসম্মত।
১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা
মামলাটি গাইবান্ধা জেলার একটি জমির চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মামলা।
- বাদীর দাবি: মোছা. আসিস বেওয়া ও অন্যান্যরা (বাদী) প্রথমে জমিটির স্বত্ব ঘোষণা এবং চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মামলা করেন। পরবর্তীতে তারা স্বত্ব ঘোষণার দাবিটি প্রত্যাহার করে নেন এবং মামলাটি কেবল চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মামলা হিসেবে চলতে থাকে। তারা আর.এস (R.S.) খতিয়ানের ভিত্তিতে নিজেদের বৈধ দখল দাবি করেন।
- বিবাদীর দাবি: আজাদুল ইসলাম ও অন্যান্যরা (বিবাদী) দাবি করে যে বাদীদের নালিশি জমিতে কোনো স্বত্ব বা দখল নেই এবং তারা সি.এস খতিয়ানের একটি ভুল ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে মামলা করেছে।
২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে
- বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০১৩): গাইবান্ধার প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালত উভয় পক্ষের সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে বাদীর মামলা খারিজ করে দেন।
- আপিল আদালত (Appellate Court – ২০১৪): গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতে বাদী আপিল করলে আদালত বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করেন এবং বাদীদের দখলে বাধা না দেওয়ার জন্য চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার ডিক্রি প্রদান করেন। এরপর বিবাদীরা হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন।
৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ
হাইকোর্ট নথিপত্র এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে আপিল আদালতের রায় সঠিক বলে মত দেন এবং নিম্নোক্ত আইনি বিষয়গুলো স্পষ্ট করেন:
- স্বত্ব প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা: হাইকোর্ট জানান, চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার মামলায় স্বত্বের বিষয়টি আনুষঙ্গিকভাবে (Incidentally) দেখা হয় শুধু এটা নিশ্চিত হতে যে, বাদী পরিচ্ছন্ন হাতে (Clean hands) আদালতে এসেছেন এবং তিনি কোনো ভূমিদস্যু নন। এই মামলায় স্বত্ব চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি করার কোনো সুযোগ বা প্রয়োজন নেই।
- দখলের প্রমাণ ও খতিয়ানের বৈধতা: বাদীদের পূর্বসূরিদের নামে আর.এস (R.S.) খতিয়ান নং ১৪৭ রয়েছে, যা তাদের বৈধ দখলের প্রাথমিক প্রমাণ বহন করে। বিবাদীরা এই খতিয়ানের বৈধতা খণ্ডন (Rebut) করতে পারেনি।
- সাক্ষ্য প্রমাণে বিবাদীর ব্যর্থতা: বাদীর পক্ষে ১নং সাক্ষী (P.W.1) খতিয়ানসহ অন্যান্য দালিলিক প্রমাণ দিয়ে নিজেদের দখল প্রমাণ করেছেন এবং পিডব্লিউ-২ ও ৩ তা সমর্থন করেছেন। কিন্তু বিবাদীরা ২ ও ৩নং সাক্ষীকে কোনো জেরাই করেনি এবং নিজেদের দাবির পক্ষে কোনো সাক্ষীও হাজির করেনি।
- রেস-জুডিকাটা (Res-Judicata) প্রযোজ্য নয়: হাইকোর্ট স্পষ্ট করে দেন যে, যেহেতু নিষেধাজ্ঞার মামলায় স্বত্ব চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে না, তাই এই মামলার রায় ভবিষ্যতের কোনো স্বত্বের মামলায় ‘রেস-জুডিকাটা’ বা দোবারা দোষ হিসেবে কাজ করবে না।
৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট বিবাদীপক্ষের (আবেদনকারী) রিভিশন আবেদনটির ওপর নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:
- আবেদনকারীর রুলটি খারিজ (Discharged) করা হলো।
- অতিরিক্ত জেলা জজ (আপিল আদালত) আদালতের দেওয়া ২০১৪ সালের বাদীর পক্ষে চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার ডিক্রি বহাল (Upheld) রাখা হলো।
মামলার শিরোনাম: আজাদুল ইসলাম ও অন্যান্য বনাম মোছা. আসিস বেওয়া ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ১৭৪৯ / ২০১৪ (12 SCOB [2019] HCD 211)
রায় প্রদানের তারিখ: ৭ মার্চ ২০১৯
