জালিয়াতির আপোষ ডিক্রি ও অস্পষ্ট সীমানায় স্বত্ব ঘোষণার মামলা খারিজ | হাইকোর্ট

জালিয়াতির আপোষ ডিক্রি ও অস্পষ্ট সীমানায় স্বত্ব ঘোষণার মামলা খারিজ: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
সারসংক্ষেপ: নিলাম খরিদ্দারদের (Auction Purchasers) পক্ষভুক্ত না করে মূল মালিকের সাথে যোগসাজশে জালিয়াতির মাধ্যমে প্রাপ্ত ‘আপোষ ডিক্রি’ (Compromise Decree) নিলাম খরিদ্দারদের ওপর বাধ্যকর নয়। এছাড়া দেওয়ানী কার্যবিধির ৭ আদেশের ৩ বিধি অনুযায়ী আর্জিতে জমির সুস্পষ্ট বিবরণ না থাকলে স্বত্ব ঘোষণার মামলা রক্ষণীয় নয়।
বিচারপতি: মো: আলী রেজা, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, আদালতের সাথে প্রতারণা (Fraud upon Court) করে কোনো আপোষ ডিক্রি হাসিল করা হলে তা বাতিলযোগ্য। পাশাপাশি, আর্জিতে দাবিকৃত জমির পরিমাণ যদি বাস্তবের রেকর্ডের চেয়ে বেশি বা অস্পষ্ট হয়, তবে আদালত সেই অশনাক্তযোগ্য জমির ওপর স্বত্ব ঘোষণার ডিক্রি দিতে পারে না।
১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা
মামলাটি খুলনার ৩৬.২৩ একর জমি নিয়ে দায়ের করা একটি স্বত্ব ঘোষণার মামলা।
- বাদীর দাবি: বাদীপক্ষ দাবি করে যে, ১৯৪৭ সালের দিকে তারা মূল মালিকের কাছ থেকে ৯,০০০ টাকা সেলামি এবং ২৬০ টাকা বার্ষিক খাজনায় জমিটি বন্দোবস্ত নেয়। পরবর্তীতে রেকর্ড মালিকের নামে হওয়ায় তারা ১৯৬৯ সালে একটি মামলা করে এবং ১৯৭১ সালে মালিকের সাথে আপোষ ডিক্রির (Compromise Decree) মাধ্যমে মালিকানা লাভ করে।
- বিবাদীর দাবি: বিবাদীপক্ষ দাবি করে যে, এই জমিগুলো সরকারি পাওনা আদায় আইনের (Public Demands Recovery Act) অধীনে বিভিন্ন সার্টিফিকেট মামলায় (১৯৫৯ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে) নিলামে তোলা হয় এবং তারা বৈধভাবে নিলাম খরিদ করে দখল ও নামজারি পেয়েছেন। বাদীর আপোষ ডিক্রি সম্পূর্ণ ভুয়া ও যোগসাজশমূলক।
২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে
- বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০০৩): বিচারিক আদালত বাদীর ১৯৭১ সালের আপোষ ডিক্রি এবং সাক্ষ্য গ্রহণ করে বাদীর পক্ষে মামলা ডিক্রি করে।
- আপিল আদালত (Appellate Court – ২০১২): আপিল আদালত বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করে দেয়। আদালত দেখতে পায় যে বাদী বন্দোবস্তের কোনো কাগজ দেখাতে পারেনি এবং আপোষ ডিক্রিটি নিলাম খরিদ্দারদের (বিবাদীদের) অধিকার ক্ষুণ্ণ করে প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়া হয়েছিল।
৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ
হাইকোর্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে আপিল আদালতের রায় সঠিক বলে মত দেন এবং বাদীর দাবিতে বেশ কিছু আইনি ত্রুটি চিহ্নিত করেন:
- প্রতারণামূলক আপোষ ডিক্রি: বাদী ১৯৭১ সালে যে আপোষ ডিক্রি পেয়েছিল, সেখানে নিলাম খরিদ্দারদের (বিবাদীদের) বিবাদী করা হয়নি। নিলাম বিক্রির পর আগের মালিকের সাথে করা এই আপোষ ডিক্রি বিবাদীদের ওপর আইনত বাধ্যকর নয়। আদালত একে ‘আদালতের সাথে প্রতারণা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
- অস্পষ্ট ও অবাস্তব সীমানা (Order 7 Rule 3 & Order 20 Rule 9 of CPC): আর্জিতে বাদী এমন কিছু দাগে জমির স্বত্ব দাবি করেছে, বাস্তবে যে দাগগুলোতে জমির পরিমাণ দাবিকৃত পরিমাণের চেয়ে অনেক কম (যেমন: একটি দাগে মোট জমি ০.০৫ একর, কিন্তু বাদী দাবি করেছে ১.০৩ একর)। জমির এমন অস্পষ্ট ও অসম্ভব বিবরণের কারণে মামলাটি দেওয়ানী কার্যবিধি অনুযায়ী রক্ষণীয় নয়।
- দখল ও নামজারি: বিবাদীদের নামে নিলাম খরিদের পর নামজারি (Mutation) ও খাজনা দেওয়ার বৈধ রসিদ রয়েছে, যা তাদের দখল ও মালিকানার শক্তিশালী সহায়ক প্রমাণ (Collateral evidence)।
৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট বাদীপক্ষের রিভিশন আবেদনটি খারিজ (Discharged) করেছেন এবং নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:
- স্পেশাল ডিস্ট্রিক্ট জজ (আপিল আদালত) আদালতের দেওয়া ২০১২ সালের মামলা খারিজের রায়টি বহাল (Upheld) করা হলো।
- যুগ্ম জেলা জজ (বিচারিক আদালত) আদালতের দেওয়া ২০০৩ সালের মূল রায়টি বাতিল (Set aside) করা হলো। অর্থাৎ বাদীর স্বত্ব ঘোষণার মামলা চূড়ান্তভাবে খারিজ।
মামলার শিরোনাম: জীতেন্দ্র নাথ সানা (মৃত) ও তার ওয়ারিশগণ বনাম দবিরুদ্দিন সরদার ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ১৮১৯ / ২০১২
রায় প্রদানের তারিখ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫
