সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বন্ধ, বিচারকদের আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত

ঢাকা: স্বাধীন বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক চরম নাটকীয় ও নজিরবিহীন মোড় এসেছে। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক করার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে গঠিত কাঙ্ক্ষিত ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’-এর কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই সাথে সেখানে কর্মরত সব বিচারককে সুপ্রিম কোর্ট থেকে সরিয়ে সরাসরি আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সন্ধ্যায় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক জরুরি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই আদেশ কার্যকর করা হয়।
অধ্যাদেশ বাতিল ও ‘দ্বৈতশাসন’ ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন
সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে গত বছরের ৩০ নভেম্বর বহুল প্রতীক্ষিত ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা অধ্যাদেশ, ২০২৪’ জারি করা হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান নবনির্বাচিত সরকার ওই অধ্যাদেশটিকে আর চূড়ান্ত আইনে পরিণত করেনি। ফলে অধ্যাদেশটির মেয়াদ ও কার্যকারিতা হারানোয় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে এর অধীনে থাকা সব বিচারককে আইন মন্ত্রণালয়ে বদলি বা সংযুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিচার বিভাগে দীর্ঘদিনের বহুল আলোচিত সেই ‘দ্বৈতশাসন’ ব্যবস্থা পুনরায় ফিরে এল।
উল্লেখ্য, ১৯৭২ সালের মূলসংধানের ২২ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, “রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবে।” কিন্তু এই মৌলিক নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে বিচার বিভাগকে স্বাধীন করার বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর স্থায়ী রূপ দেওয়া সম্ভব হয়নি।
মাসদার হোসেন মামলার ঐতিহাসিক পটভূমি
১৯৯৪ সালে অধস্তন (নিম্ন) আদালতের বিচারকদের বেতন গ্রেড ও বৈষম্য নিয়ে বিচারকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সেই ক্ষোভের ধারাবাহিকতায় তৎকালীন বিচারক মাসদার হোসেনসহ ৪৪১ জন বিচারকের পক্ষে হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। এই রিটের চূড়ান্ত শুনানি শেষে ১৯৯৭ সালে হাইকোর্ট জুডিসিয়াল সার্ভিসকে একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন সার্ভিস হিসেবে ঘোষণা করে ঐতিহাসিক আদেশ দেন।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে তৎকালীন রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করলে দীর্ঘ শুনানি শেষে ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রায়টি (মাসদার হোসেন মামলার রায়) প্রদান করেন। আপিল বিভাগের ওই রায়ে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণে ১২ দফা সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল:
- संবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলার পূর্ণ ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের হাতে থাকবে।
- বিচার বিভাগ কখনো জাতীয় সংসদ বা নির্বাহী বিভাগের অধীনে থাকবে না এবং জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটসহ সব বিচারক সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করবেন।
- জুডিসিয়ারির (নিম্ন আদালত) বার্ষিক বাজেট প্রণয়নের ওপর executive বা নির্বাহী বিভাগের কোনো হাত থাকবে না। এই বাজেট সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্ট নিজে প্রণয়ন এবং বরাদ্দ করবে।
আপিল বিভাগের ওই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণার পর দীর্ঘ প্রায় ৮ বছর কেটে গেলেও কোনো রাজনৈতিক সরকার তা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করেনি। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক ঘোষণা করা হলেও আইন মন্ত্রণালয় ও সুপ্রিম কোর্টের যৌথ এখতিয়ার বা দ্বৈতশাসনের কারণে সেই স্বাধীনতা মূলত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও তৎকালীন প্রধান বিচারপতির উদ্যোগ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর, ১০ আগস্ট দেশের ২৫তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। দায়িত্ব নেওয়ার পর ২১ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ইনার গার্ডেনে আয়োজিত দেশের সকল বিচারকদের উদ্দেশে দেওয়া এক ঐতিহাসিক অভিভাষণে তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, সুপ্রিম কোর্ট ও আইন মন্ত্রণালয়ের যৌথ এখতিয়ার সম্পূর্ণরূপে বিলোপ করে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা না হলে বিচারকদের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে না।
প্রধান বিচারপতির এই অনমনীয় অবস্থানের পর ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট থেকে একটি পৃথক সচিবালয়ের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। একই সাথে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত ‘বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন’ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় স্থাপনের জোর সুপারিশ করে। যার ফলশ্রুতিতে গত বছরের ৩০ নভেম্বর (২০২৪) স্বতন্ত্র ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়েছিল।
আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার আশঙ্কা
বর্তমান নির্বাচিত সরকার সংসদে এই অধ্যাদেশটি পাস না করায় এবং নতুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সব বিচারককে আইন মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ায় সুপ্রিম কোর্টের একক প্রশাসনিক কর্তৃত্বের অবসান ঘটল। বিচার অঙ্গনের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে মাসদার হোসেন মামলার রায়ের মূল চেতনা এবং বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা অর্জনের প্রক্রিয়াটি আবারও বড় ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়ল।


