নাবালক সন্তানের নামে কেনা জমি বেনামি নয়, সন্তানেরই অংশ | হাইকোর্ট

সারসংক্ষেপ: ‘বেনামি’ (Benami) সম্পত্তির ক্ষেত্রে মূল মালিক লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকে এবং যার নামে সম্পত্তি কেনা হয় (বেনামদার), তার কোনো প্রকৃত স্বার্থ থাকে না। কিন্তু একটি দলিলে যদি মা ও তার নাবালক সন্তানের নাম একসাথে থাকে এবং সম্পত্তি কেনার টাকা যদি এককভাবে মায়ের নিজস্ব না হয়, তবে সেই সম্পত্তি বেনামি হিসেবে গণ্য হবে না। এক্ষেত্রে সন্তানও ওই জমির বৈধ ও সমান অংশীদার হবেন।
বিচারপতি: মো: রিয়াজ উদ্দিন খান, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, আমাদের দেশে নাবালকের নামে জমি কেনায় কোনো আইনি বাধা নেই। বাবা বা মা নাবালক সন্তানের নামে বা সন্তানের সাথে যৌথ নামে জমি কিনলে ধরে নিতে হবে যে তা সন্তানের কল্যাণের জন্যই (Doctrine of advancement) কেনা হয়েছে, যদি না শক্ত প্রমাণ দিয়ে এর বিপরীত কিছু প্রতিষ্ঠিত করা যায়।
১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা
মামলাটি বগুড়ার গাবতলী এলাকার একটি বেনামি সম্পত্তির ঘোষণা এবং মালিকানা সংক্রান্ত।
- বাদীর (মায়ের) দাবি: বাদী (মা) দাবি করেন যে, ১৯৪৬ সালে তিনি তার নিজস্ব এবং তার স্বামীর দেওয়া টাকায় ২.২৬ একর জমি কেনেন। দলিল রেজিস্ট্রি করার সময় তিনি তার ৬ মাস বয়সী ছেলের নামও (১নং বিবাদী) দলিলে যুক্ত করেন। মায়ের দাবি— ছেলের নাম শুধু ‘সৌজন্যমূলক’ (Curtsey) দেওয়া হয়েছিল, ছেলে আসলে একজন বেনামদার। মূল দলিল মায়ের কাছেই আছে, তাই তিনি এককভাবে সম্পত্তির মালিক।
- বিবাদীর (ছেলের) দাবি: ছেলে দাবি করেন যে, আকিকার সময় তার নানা ও বাবার পরিবার থেকে তিনি যে উপহার ও টাকা পেয়েছিলেন, তা দিয়েই তার মা ওই সম্পত্তি কিনেছিলেন। তাই তিনি বেনামদার নন, বরং ওই জমির অর্ধেক অংশের প্রকৃত মালিক। এস.এ (SA) এবং হালনাগাদ রেকর্ডও তার নামে রয়েছে।
২. নিম্ন আদালত ও আপিল আদালত যা বলেছে
- বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০১৫): গাবতলীর সহকারী জজ আদালত মায়ের পক্ষে রায় দিয়ে জানান যে, জমি কেনার সময় ছেলেটি মাত্র ৬ মাসের শিশু ছিল। তার নিজের কোনো আয় ছিল না, তাই সে মায়ের বেনামদার।
- আপিল আদালত (Appellate Court – ২০২০): ছেলে আপিল করলে অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত বিচারিক আদালতের রায় বাতিল করে দেন। আদালত জানান, নাবালকের নামে জমি কেনা বেআইনি নয়। দলিলে দুজনের নামই আছে এবং খতিয়ান ও খাজনার দাখিলা ছেলের নামে রয়েছে। তাই জমিটি বেনামি নয়। এরপর মা হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন।
৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ
হাইকোর্ট নথিপত্র এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে আপিল আদালতের রায় সঠিক বলে মত দেন এবং নিম্নোক্ত বিষয়গুলো স্পষ্ট করেন:
- বেনামি সম্পত্তির প্রমাণ: হাইকোর্ট ৯ এমএলআর ৩২৪ মামলার নজির টেনে বলেন, একটি সম্পত্তি বেনামি কি না তা নির্ভর করে টাকার উৎস (Source of fund), দখলের ধরন এবং উদ্দেশ্য (Motive)-এর ওপর। যে বেনামি দাবি করবে, প্রমাণের দায়িত্বও (Burden of proof) তারই।
- টাকার উৎস কার?: মা তার আর্জিতে এবং সাক্ষীরা তাদের জবানবন্দিতে পরিষ্কার বলেছেন যে, জমি কেনার টাকা মায়ের নিজস্ব ছিল না; বরং তা তার স্বামী ও বাবার দেওয়া টাকা ছিল। যেহেতু মা নিজে এককভাবে ওই তহবিলের মালিক ছিলেন না, তাই তিনি এককভাবে পুরো জমির মালিকানাও দাবি করতে পারেন না। স্বামী ও বাবার দেওয়া টাকা দিয়ে ছেলের মঙ্গলের জন্যই জমিটি কেনা হয়েছিল বলে ধরে নেওয়া হবে।
- যৌথ দলিলে বেনামি হয় না: বেনামি সম্পত্তিতে প্রকৃত মালিকের নাম দলিলে থাকে না। কিন্তু এই দলিলে মা ও ছেলের নাম একত্রে (Joint names) আছে। যেখানে দুজনের নামই প্রকাশ্যে আছে, সেখানে একজনকে আরেকজনের বেনামদার বলার সুযোগ নেই।
- দলিল কার কাছে থাকবে?: জমির মালিক যেহেতু মা ও ছেলে দুজনই, তাই দুজনের যেকোনো একজনের কাছেই মূল দলিল থাকাটা স্বাভাবিক। মা হিসেবে দলিলের জিম্মাদার তিনি থাকতেই পারেন, এটা একক মালিকানা প্রমাণ করে না।
৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট মায়ের (আবেদনকারী) রিভিশন আবেদনটির ওপর নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:
- আবেদনকারীর রুলটি খারিজ (Discharged) করা হলো।
- অতিরিক্ত জেলা জজ (আপিল আদালত) আদালতের দেওয়া ২০২০ সালের ছেলের পক্ষে মালিকানার রায়টি বহাল (Affirmed) করা হলো। অর্থাৎ, ছেলে (বিবাদী) ওই দলিলে বেনামদার নয়, বরং বৈধ অংশীদার।
মামলার শিরোনাম: এশিয়া বেওয়া (মৃত) ও তার ওয়ারিশগণ বনাম মো: ওসমান গণি আকন্দ ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ৫৪০ / ২০২১
রায় প্রদানের তারিখ: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬

