রায়ের আগে সম্পত্তি ক্রোক (Attachment Before Judgment) এর শর্তাবলী | হাইকোর্ট

সারসংক্ষেপ: দেওয়ানী কার্যবিধির ৩৮ আদেশের ৫ বিধি (Order 38 Rule 5 of CPC) অনুযায়ী রায়ের আগে সম্পত্তি ক্রোক (Attachment before judgment) একটি ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ। কেবল ‘বিবাদী সম্পত্তি বিক্রি করে দেবেন’ বা ‘বিদেশে চলে যাবেন’— এমন অস্পষ্ট ও ঢালাও অভিযোগের (Vague allegations) ভিত্তিতে সম্পত্তি ক্রোক করা যায় না। এর জন্য বিবাদীর সম্পত্তি হস্তান্তরের পেছনে ডিক্রি জারিতে বাধা দেওয়ার ‘অসৎ উদ্দেশ্য’ (Malafide intention) সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে হবে। এছাড়া, যার বিরুদ্ধে আর্থিক দাবি রয়েছে, ক্রোকের আবেদন কেবল তার সম্পত্তির ওপরই করা যায়, তৃতীয় পক্ষের ওপর নয়।
বিচারপতি: মো: লুৎফর রহমান, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, রায়ের আগে সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ মূলত বিবাদীর নিজের সম্পত্তি ভোগের সাংবিধানিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করে। তাই নিছক অনুমান বা হয়রানির উদ্দেশ্যে এমন আবেদন করা হলে আদালত তা মঞ্জুর করবেন না।
১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা
মামলাটি ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে দায়ের করা ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা আদায়ের একটি অর্থ মোকদ্দমা (Money Suit)।
- বাদীর দাবি: ছেলে (বাদী) তার মা (১নং বিবাদী) এবং বোনের (২নং বিবাদী) বিরুদ্ধে মামলা করেন। বাদীর দাবি, তিনি তাদের একটি ফ্ল্যাটের সাজসজ্জার জন্য ৭০ লাখ টাকা খরচ করেছেন এবং পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রির একটি বড় অংশ মা তাকে না দিয়ে নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। বিবাদীরা যুক্তরাষ্ট্রে (USA) স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তারা ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে দিতে পারেন, তাই মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফ্ল্যাটটি রায়ের আগে ক্রোক (Attachment before judgment) করার আবেদন করেন বাদী।
- বিবাদীর দাবি: মা ও বোন (বিবাদীপক্ষ) দাবি করেন যে, দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং হয়রানিমূলক। যে ফ্ল্যাটটি ক্রোক চাওয়া হয়েছে তা কেবল বোনের (২নং বিবাদী) মালিকানাধীন, এর সাথে মায়ের কোনো সম্পর্ক নেই। শুধুমাত্র বোনকে চাপে ফেলার জন্যই এই আবেদন করা হয়েছে।
২. নিম্ন আদালত যা বলেছে
- বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০২৪): ঢাকার ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত বাদীর ক্রোকের আবেদনটি খারিজ করে দেন। আদালত জানান, বাদীর দাবির কোনো সুনির্দিষ্ট ভিত্তি নেই এবং এটি কেবল হয়রানির উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
- রিভিশন আদালত (District Judge Court – ২০২৪): বিচারিক আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে বাদী ঢাকা জেলা জজ আদালতে রিভিশন দায়ের করলে আদালত তা সরাসরি খারিজ করে দেন। এরপর বাদী হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন।
৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ
হাইকোর্ট নথিপত্র এবং দেওয়ানী কার্যবিধির বিধান পর্যালোচনা করে নিম্ন আদালতের আদেশ সঠিক বলে মত দেন এবং নিম্নোক্ত আইনি বিষয়গুলো স্পষ্ট করেন:
- ক্রোকের শর্তাবলী (Conditions of Rule 5): হাইকোর্ট জানান, ৩৮ আদেশের ৫ বিধিতে ক্রোকের জন্য তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়— ক) বিবাদী সম্পত্তি হস্তান্তর করতে উদ্যত হয়েছেন, খ) আদালতের এখতিয়ারের বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন এবং গ) এর মূল উদ্দেশ্য হলো আদালতের সম্ভাব্য ডিক্রি জারিতে বাধা দেওয়া।
- অসৎ উদ্দেশ্য প্রমাণ (Malafide Intention): হাইকোর্ট ৩১ ডিএলআর (এডি) নজির উল্লেখ করে বলেন, বিবাদী সম্পত্তি বিক্রি করে দেবেন— এমন ঢালাও অভিযোগ যথেষ্ট নয়। আদালতকে নিশ্চিত হতে হবে যে বিবাদীর সম্পত্তি হস্তান্তরের পেছনে ‘অসৎ উদ্দেশ্য’ বা ডিক্রি এড়ানোর চেষ্টা রয়েছে। এই মামলায় বাদী তা প্রমাণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।
- মালিকানার প্রশ্ন: আর্থিক দাবিটি মূলত মায়ের (১নং বিবাদী) বিরুদ্ধে করা হয়েছে, কিন্তু ক্রোক চাওয়া হয়েছে বোনের (২নং বিবাদীর) ফ্ল্যাট। যার বিরুদ্ধে দাবি নেই, তার সম্পত্তি ক্রোক করা আইনের অপব্যবহার।
৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
যেহেতু বাদীর ক্রোকের আবেদনের কোনো সুনির্দিষ্ট ভিত্তি ছিল না, তাই হাইকোর্ট নিচের সিদ্ধান্তগুলো প্রদান করেন:
- বাদীর (আবেদনকারীর) রিভিশন রুলটি খারিজ (Discharged) করা হলো।
- ঢাকা জেলা জজ ও যুগ্ম জেলা জজ আদালতের দেওয়া রায়ের আগে ক্রোকের আবেদন নামঞ্জুরের আদেশ বহাল (Affirmed) রাখা হলো। হাইকোর্টের দেওয়া অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ প্রত্যাহার করা হলো।
মামলার শিরোনাম: নওশাদ ইমতিয়াজ বনাম সুলতানা নিলুফার বানু ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ২৮১৬ / ২০২৪
রায় প্রদানের তারিখ: ১১ নভেম্বর ২০২৫
