নির্দিষ্ট সময়ে টাকা জমা না দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চুক্তি বাতিল হয় না | সুপ্রিম কোর্ট

সারসংক্ষেপ: সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের (Specific Relief Act) ২৮ ধারা অনুযায়ী, আদালত কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্রেতা জমির বাকি মূল্য জমা দিতে ব্যর্থ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে (Automatically) চুক্তি বা ডিক্রি বাতিল হয়ে যায় না। মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও আদালতের সময় বাড়ানোর এখতিয়ার রয়েছে। তবে ডিক্রিতে যদি স্পষ্টভাবে বলা থাকে যে টাকা না দিলে চুক্তি বাতিল হবে, কেবল তখনই তা বাতিল বলে গণ্য হবে।
বিচারপতি: বিচারপতি মনোজ মিশ্র এবং বিচারপতি মনমোহন (ভারত সুপ্রিম কোর্ট)
ভারত সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদন (Specific Performance) ডিক্রির ক্ষেত্রে টাকা জমা দেওয়ার সময়সীমা বৃদ্ধি এবং চুক্তি বাতিল সংক্রান্ত আইনি নীতিগুলো স্পষ্ট করেছেন। আদালত জানিয়েছেন, বিচারিক আদালতগুলোর অতিরিক্ত যান্ত্রিক বা টেকনিক্যাল (Hyper-technical) দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে ন্যায়পরায়ণতার (Equity) ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা
মামলাটি একটি জমি বিক্রির চুক্তি এবং এর সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদন (Specific Performance) সংক্রান্ত।
- চুক্তি ও ডিক্রি: ২০১১ সালে ৩.৭৫ একর জমি প্রতি একর ১৬ লাখ টাকা মূল্যে বিক্রির চুক্তি হয়। বিচারিক আদালত ২০১৭ সালের ৩ মার্চ ক্রেতার পক্ষে সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের ডিক্রি দেন এবং ক্রেতাকে ১ মাসের মধ্যে বাকি ৫৭.৫ লাখ টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
- টাকা জমায় বিলম্ব: ক্রেতা সময়মতো নোটিশ দিলেও, শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর এক্সিকিউশন আদালতের (Execution Court) নির্দেশে টাকা জমা দেন।
২. নিম্ন আদালত ও হাইকোর্ট যা বলেছে
- এক্সিকিউশন আদালত (Execution Court): নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে টাকা জমা দেওয়ার কারণে এক্সিকিউশন আদালত ডিক্রি জারীর মামলাটি খারিজ করে দেয়।
- হাইকোর্ট (High Court): মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টও বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে এবং ক্রেতার আবেদন খারিজ করে দেয়। এরপর ক্রেতা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন।
৩. সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ (৭টি নীতি)
সুপ্রিম কোর্ট মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের রায়ে ত্রুটি খুঁজে পান। আদালত বলেন, মাঝে কোভিড-১৯ লকডাউন ছিল এবং বিক্রেতার নিজের আপিলও ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিচারাধীন ছিল। সুপ্রিম কোর্ট সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ২৮ ধারা অনুযায়ী ৭টি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন:
- ১. এখতিয়ার: সুনির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের ডিক্রি মূলত একটি প্রাথমিক ডিক্রি (Preliminary decree)। দলিল রেজিস্ট্রি না হওয়া পর্যন্ত চুক্তি বাতিল বা টাকা দেওয়ার সময় বাড়ানোর পূর্ণ এখতিয়ার ডিক্রি প্রদানকারী আদালতের হাতে থাকে।
- ২. স্বয়ংক্রিয় বাতিল নয়: নির্ধারিত সময়ে টাকা না দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে চুক্তি বাতিল হয় না, আবার সময়ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ে না। তবে ডিক্রিতে যদি স্পষ্টভাবে বলা থাকে যে “টাকা না দিলে ডিক্রি বাতিল হবে”, তখন এটি আর কার্যকর করা যায় না।
- ৩. আবেদনের সময়: টাকা জমা দেওয়ার সময় বাড়ানোর আবেদন নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেও করা যায়, আবার পরেও করা যায়।
- ৪. আবেদনের ধরন: সময় বাড়ানোর আবেদনের কোনো নির্দিষ্ট আইনি ফর্ম বা ফরম্যাট নেই। মৌখিক আবেদন বা দেরিতে টাকা জমা দেওয়ার অনুমতি চাওয়াকেও ‘সময় বাড়ানোর আবেদন’ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। তবে এটি মূল আদালতের কাছেই করতে হবে।
- ৫. সাম্য ও ন্যায়বিচার (Equity): সময় বাড়ানোর ক্ষেত্রে আদালতকে দেখতে হবে পক্ষগুলোর আচরণ কেমন ছিল এবং অতিরিক্ত শর্ত বা ক্ষতিপূরণ দিয়ে বিক্রেতার ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব কি না।
- ৬. ইচ্ছাকৃত অবহেলা (Willful Negligence): তামাদি আইনের ৫ ধারার মতো এখানে ‘প্রতিদিনের বিলম্বের’ ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আদালতকে দেখতে হবে ক্রেতার সদিচ্ছা ছিল কি না। যদি দেখা যায় ক্রেতা ইচ্ছাকৃত অবহেলা করেছেন এবং চুক্তি শেষ করতে চাননি, তবেই আদালত চুক্তি বাতিল করতে পারেন।
- ৭. সময় নির্ধারণ বাধ্যতামূলক: দেওয়ানী কার্যবিধির (CPC) ২০ আদেশের ১২ক বিধি অনুযায়ী, আদালতকে অবশ্যই টাকা জমা দেওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিতে হবে। সময় বেঁধে না দিলে তা একটি ‘যৌক্তিক সময়ের’ (Reasonable period) মধ্যে পালন করতে হবে, যা মামলার ঘটনা অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
৪. সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
সুপ্রিম কোর্ট ক্রেতার (আপিলকারী) আপিলটি মঞ্জুর (Allowed) করেছেন এবং নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:
- মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট ও এক্সিকিউশন আদালতের দেওয়া ডিক্রি বাতিলের আদেশ রদ (Set aside) করা হলো। ক্রেতা বিলম্ব সত্ত্বেও ডিক্রির সুবিধা পাবেন।
মামলার শিরোনাম: আনন্দ নারায়ণ শুক্লা বনাম জগতধারী (Anand Narayan Shukla v Jagat Dhari)।
সাইটেশন (Citation): 2026 LiveLaw (SC) 477
রায় প্রদানের তারিখ: ৯ মে ২০২৬

