সাক্ষ্য আইনে সাক্ষীদের জবানবন্দি ও জেরা: আইনি বিধান ও পদ্ধতি

সাক্ষী পরীক্ষার ভূমিকা ও গুরুত্ব
আদালতে বিচার প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সাক্ষীদের পরীক্ষা বা Examination of Witnesses। একটি মামলার রায় অনেকাংশেই নির্ভর করে সাক্ষীদের প্রদত্ত সাক্ষ্যের ওপর। বাংলাদেশের সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ (The Evidence Act, 1872)-এর একাদশ অধ্যায়ে সাক্ষীদের কীভাবে উপস্থাপন করা হবে এবং তাদের কীভাবে জেরা বা জবানবন্দি করা হবে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট বিধান দেওয়া রয়েছে। মামলার সত্যতা উদ্ঘাটন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিতে সাক্ষীদের জবানবন্দি, জেরা এবং পুনঃজবানবন্দি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
সাক্ষ্য দেওয়ার যোগ্যতা (Competency of Witnesses)
মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে জেনে রাখা ভালো, সাক্ষ্য আইনের ১১৮ ধারা অনুযায়ী, এমন প্রতিটি ব্যক্তি সাক্ষ্য দেওয়ার যোগ্য যাকে আদালত প্রশ্ন বুঝতে সক্ষম এবং যৌক্তিক উত্তর দিতে সক্ষম বলে মনে করেন। বয়স, শারীরিক বা মানসিক অবস্থা যদি প্রশ্ন বুঝতে ও উত্তর দিতে বাধা না দেয়, তবে যে কেউই সাক্ষী হতে পারেন।
সাক্ষী পরীক্ষার পর্যায়সমূহ (Stages of Examination)
সাক্ষ্য আইনের ১৩৭ এবং ১৩৮ ধারা অনুযায়ী আদালতে একজন সাক্ষীকে তিনটি প্রধান ধাপে পরীক্ষা করা হয়। এই পর্যায়গুলো একটি নির্দিষ্ট ক্রমানুসারে পরিচালিত হয়:
১. জবানবন্দি (Examination-in-Chief)
১৩৭ ধারা অনুযায়ী, যে পক্ষ সাক্ষীকে আদালতে তলব করে, সেই পক্ষ কর্তৃক সাক্ষীর যে পরীক্ষা নেওয়া হয় তাকে জবানবন্দি বা Examination-in-Chief বলা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মামলার প্রাসঙ্গিক ঘটনাগুলো সাক্ষীর মাধ্যমে আদালতের সামনে তুলে ধরা।
২. জেরা (Cross-Examination)
জবানবন্দির পর বিরোধী পক্ষ বা প্রতিপক্ষ সাক্ষীকে যে পরীক্ষা করে, তাকে জেরা বা Cross-Examination বলে (১৩৭ ধারা)। জেরার মূল উদ্দেশ্য হলো সাক্ষীর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা এবং তার দেওয়া তথ্যের দুর্বলতা বা অসঙ্গতি বের করা। এটি মামলার সত্য উদ্ঘাটনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।
- জেরার পরিধি (১৩৮ ধারা): জেরা অবশ্যই মামলার প্রাসঙ্গিক বিষয়ের (Relevant Facts) মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। তবে জবানবন্দিতে সাক্ষী যেটুকু বলেছেন, জেরার পরিধি কেবল তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
- দলিল দাখিলকারী ব্যক্তির জেরা (১৩৯ ধারা): যদি কোনো ব্যক্তিকে শুধুমাত্র কোনো দলিল বা ডকুমেন্ট আদালতে দাখিল করার জন্য ডাকা হয়, তবে তিনি কেবল দলিল দাখিল করার কারণেই সাক্ষী হয়ে যান না। তাকে জেরা করা যাবে না, যতক্ষণ না তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষী হিসেবে ডাকা হয়।
- ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন বা Leading Questions (১৪৩ ধারা): জবানবন্দিতে ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন করা সাধারণত নিষেধ থাকলেও, জেরার সময় প্রতিপক্ষ নির্দ্বিধায় ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন করতে পারে।
- পূর্ববর্তী লিখিত বিবৃতির ভিত্তিতে জেরা (১৪৫ ধারা): কোনো সাক্ষী যদি আগে কোনো লিখিত বিবৃতি দিয়ে থাকেন, তবে সেই বিবৃতির সাথে বর্তমান সাক্ষ্যের অমিল বা অসঙ্গতি দেখানোর জন্য তাকে জেরা করা যায়।
৩. পুনঃজবানবন্দি (Re-Examination)
জেরা সম্পন্ন হওয়ার পর সাক্ষীকে যিনি ডেকেছেন, সেই পক্ষ যদি জেরার ফলে সৃষ্ট কোনো অস্পষ্টতা দূর করার জন্য সাক্ষীকে পুনরায় পরীক্ষা করেন, তাকে পুনঃজবানবন্দি বলে। ১৩৮ ধারা অনুযায়ী পুনঃজবানবন্দি কেবল জেরায় উত্থাপিত নতুন কোনো বিষয়ের ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্যই করা যায়। আদালতের অনুমতি ছাড়া এখানে নতুন কোনো বিষয় উত্থাপন করা যায় না।
জেরায় আইনসম্মত প্রশ্নসমূহ (Questions Lawful in Cross-Examination)
সাক্ষ্য আইনের ১৪৬ ধারা অনুযায়ী, জেরা করার সময় নিচের তিনটি উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করা আইনসম্মত:
- সাক্ষীর সত্যবাদিতা (Veracity) যাচাই করার জন্য।
- সাক্ষীর পরিচয় এবং সমাজে তার অবস্থান (Position in life) জানার জন্য।
- সাক্ষীর চরিত্রে আঘাত করে তার বিশ্বাসযোগ্যতা (Credit) ক্ষুণ্ন করার জন্য।
বৈরী সাক্ষী বা Hostile Witness (১৫৪ ধারা)
সাক্ষ্য আইনে সরাসরি “Hostile Witness” শব্দটি সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। তবে আইনি পরিভাষায়, যখন কোনো সাক্ষী আদালতে এসে তাকে যে পক্ষ ডেকেছে সেই পক্ষের বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দেন বা সত্য গোপন করার চেষ্টা করেন, তখন তাকে বৈরী বা প্রতিকূল সাক্ষী বলা হয়।
- বৈশিষ্ট্য: এই সাক্ষী আদালতের কাছে সত্য প্রকাশে ইচ্ছুক নন। অনেক সময় প্রতিপক্ষের দ্বারা প্রভাবিত বা প্ররোচিত হয়ে তারা এমনটি করেন।
- কখন বৈরী ঘোষণা করা যায়: কেবল সাক্ষী কিছু অসামঞ্জস্যপূর্ণ উত্তর দিলেই তাকে বৈরী বলা যাবে না। আদালতকে নিশ্চিত হতে হবে যে সাক্ষী ইচ্ছা করেই সত্য গোপন করছেন। তখন আদালত সাক্ষীকে ডাকা পক্ষকে অনুমতি দিতে পারেন নিজের সাক্ষীকে জেরা করার।
- সাক্ষ্যগত মূল্য (Evidentiary Value): বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের বিভিন্ন নজির অনুযায়ী, একজন সাক্ষী বৈরী হয়ে গেলেই তার সম্পূর্ণ সাক্ষ্য বাতিল বা অগ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না (Not wholly rejected)। তার দেওয়া সাক্ষ্যের যে অংশটুকু বিশ্বাসযোগ্য এবং মামলার অন্য প্রমাণের সাথে মিলে যায়, আদালত চাইলে সেই অংশটুকু প্রমাণের সমর্থনে (Corroboration) ব্যবহার করতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে আদালতকে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সাবধানতা (Care & Caution) অবলম্বন করতে হয়।
সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করা (Impeaching Credit of Witness)
সাক্ষ্য আইনের ১৫৫ ধারা অনুযায়ী, প্রতিপক্ষ অথবা আদালতের অনুমতিক্রমে সাক্ষীকে আহ্বানকারী পক্ষ নিচের উপায়গুলোর মাধ্যমে একজন সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা ধ্বংস বা ক্ষুণ্ন করতে পারে:
- যদি প্রমাণ করা যায় যে সাক্ষীকে ঘুষ দেওয়া হয়েছে, তিনি ঘুষের প্রস্তাব গ্রহণ করেছেন, অথবা অন্য কোনো দুর্নীতির মাধ্যমে প্ররোচিত হয়েছেন।
- সাক্ষীর পূর্ববর্তী কোনো বক্তব্যের সাথে তার বর্তমান সাক্ষ্যের যদি ঘোরতর অসঙ্গতি (Inconsistent statements) থাকে।
- অন্য কোনো ব্যক্তির সাক্ষ্যের মাধ্যমে যদি প্রমাণ করা যায় যে, উক্ত সাক্ষী মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নন।
স্মৃতি পুনরুজ্জীবিত বা সতেজ করা (Refreshing Memory)
সাক্ষ্য দেওয়ার সময় অনেক দিন আগের ঘটনা সাক্ষীর হুবহু মনে না-ও থাকতে পারে। এজন্য সাক্ষ্য আইনের ১৫৯ থেকে ১৬১ ধারা পর্যন্ত স্মৃতি পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
কীভাবে স্মৃতি সতেজ করা যায়? (১৫৯ ধারা)
একজন সাক্ষী আদালতে পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে নিজের স্মৃতি সতেজ করতে পারেন নিচের উপায়গুলোতে:
- ঘটনা ঘটার সময় বা তার ঠিক পরপরই নিজের লেখা কোনো নোট বা দলিল দেখে।
- ঘটনার সময় অন্য কোনো ব্যক্তির লেখা ডকুমেন্ট দেখে (যদি তিনি জানেন যে সেটি সঠিক)।
- আদালতের অনুমতিক্রমে মূল দলিলের কোনো কপি বা ফটোকপি দেখে।
- একজন বিশেষজ্ঞ (Expert) তার পেশাগত বই বা জার্নাল দেখে স্মৃতি সতেজ করতে পারেন।
উদাহরণ: পুলিশ অফিসারের তদন্ত ডায়েরি, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট, ডাক্তারি সনদ, হিসাবের খাতা, পঞ্চনামা, এমনকি কোনো পুরনো খবরের কাগজ বা জন্মকুণ্ডলী (Horoscope) দেখেও স্মৃতি সতেজ করা যায়। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে দলিলটি দেখে স্মৃতি সতেজ করা হচ্ছে, সেটি নিজে সাক্ষ্য হিসেবে আদালতে গ্রহণযোগ্য (Admissible in evidence) না হলেও চলবে।
স্মৃতি সতেজ না হলেও দলিলের ভিত্তিতে সাক্ষ্য (১৬০ ধারা)
অনেক সময় কোনো পুরোনো হিসাবের খাতা বা দলিল দেখার পরও সাক্ষীর ঘটনার বিস্তারিত মনে পড়ে না। তবে তিনি যদি নিশ্চিত থাকেন যে ওই দলিলে যা লেখা আছে তা সঠিক এবং তিনি নিজেই তা সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তবে তিনি ওই দলিলের বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে সাক্ষ্য দিতে পারবেন। ১৫৯ ধারার সাথে এর মূল পার্থক্য হলো, ১৬০ ধারায় ব্যবহৃত দলিলটি নিজেই সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রতিপক্ষের অধিকার (১৬১ ধারা)
সাক্ষী যদি আদালতে তার স্মৃতি সতেজ করার জন্য কোনো ডকুমেন্ট বা লেখা ব্যবহার করেন, তবে প্রতিপক্ষের অধিকার রয়েছে সেই লেখাটি দেখার। শুধু তাই নয়, প্রতিপক্ষ চাইলে ওই লেখার ওপর ভিত্তি করে সাক্ষীকে জেরা (Cross-examination) করতে পারবে। এর ফলে স্মৃতি সতেজ করার নামে কোনো ভুয়া বা বানোয়াট তথ্য উপস্থাপন করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হয়।
উপসংহার
সাক্ষ্য আইনে সাক্ষীদের পরীক্ষা করা একটি শিল্প ও কৌশলগত প্রক্রিয়া। জবানবন্দি দিয়ে একটি মামলার ভিত্তি তৈরি হয়, আর জেরার মাধ্যমে তার সত্যতা যাচাই হয়ে আসল চিত্র বেরিয়ে আসে। একজন আইনজীবীর দক্ষতা সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় জেরার সময়। অন্যদিকে, বৈরী সাক্ষী এবং স্মৃতি পুনরুজ্জীবিত করার মতো বিধানগুলো নিশ্চিত করে যে, মানুষের স্বাভাবিক ভুলে যাওয়া বা কোনো পক্ষের কারচুপির কারণে যেন ন্যায়বিচার ব্যাহত না হয়। বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় এই ধারাগুলোর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা হয়।


