চুক্তি প্রবলের মামলায় তৃতীয় পক্ষ সংযোজন (Addition of Party) বৈধ | হাইকোর্ট

চুক্তি প্রবলের (Specific Performance) মামলায় তৃতীয় পক্ষকে বিবাদী হিসেবে সংযোজন বৈধ: সুপ্রিম কোর্ট
সারসংক্ষেপ: দেওয়ানী কার্যবিধির ১ আদেশের ১০ বিধি (Order 1 Rule 10 of CPC) অনুযায়ী, চুক্তি প্রবলের (Specific performance of contract) মামলায় সাধারণ আইনি নীতি হলো— কেবল চুক্তির পক্ষরাই মামলার প্রয়োজনীয় পক্ষ (Necessary parties), এখানে তৃতীয় পক্ষের কোনো কাজ নেই। তবে, একই জমির ওপর যদি একাধিক বায়নাপত্র এবং পাওয়ার অব অ্যাটর্নির দাবি থাকে, তবে প্রকৃত বিরোধ নিষ্পত্তি এবং একাধিক মামলার জটিলতা (Multiplicity of suits) এড়াতে তৃতীয় পক্ষকে মামলায় বিবাদী হিসেবে যুক্ত করা আইনসম্মত।
বিচারপতি: বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী এবং বিচারপতি মুরাদ-এ-মওলা সোহেল, হাইকোর্ট বিভাগ
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক রায়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, কোনো জমিতে একাধিক ব্যক্তির স্বার্থ জড়িত থাকলে এবং পূর্বের চুক্তির দাবি উঠলে, একটিমাত্র মামলার মাধ্যমে সব পক্ষের উপস্থিতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি করাই ন্যায়বিচারের দাবি। এতে করে অহেতুক নতুন নতুন মামলার সৃষ্টি হয় না।
১. মামলার ফ্যাক্ট বা ঘটনা
মামলাটি ঢাকার একটি জমির চুক্তি প্রবল বা স্পেসিফিক পারফরম্যান্স (Specific Performance) মামলা।
- বাদীর দাবি: মূল মালিক আব্দুল মালেক ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল বাদীর সাথে ৬০ কোটি টাকার বিনিময়ে একটি বায়নাপত্র সম্পাদন করেন। বাদী ৫৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধ করলেও আব্দুল মালেক মূল কবলা দলিল রেজিস্ট্রি করে দেননি, তাই বাধ্য হয়ে বাদী মামলা দায়ের করেন।
- তৃতীয় পক্ষের (৩নং প্রতিপক্ষ) দাবি: মামলা চলাকালে তৃতীয় এক ব্যক্তি (সৈয়দ আল ফারুক) দেওয়ানী কার্যবিধির ১ আদেশের ১০ বিধি অনুযায়ী মামলায় নিজেকে বিবাদী হিসেবে যুক্ত করার আবেদন করেন। তার দাবি, আব্দুল মালেক এর অনেক আগে ১৯৯৬ সালের ৭ ডিসেম্বর তার সাথে ওই একই জমির বায়নাপত্র করেছিলেন এবং তাকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়েছিলেন। তিনি জমির দখল পেয়ে রাজউক থেকে নকশা অনুমোদন করে ভবনের কাজও শুরু করেছিলেন। তাই এই মামলায় তাকে বিবাদী হিসেবে না রাখলে তিনি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
২. নিম্ন আদালত যা বলেছে
- বিচারিক আদালত (Trial Court – ২০২৪): ঢাকার ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালত শুনানি শেষে তৃতীয় পক্ষকে মামলায় বিবাদী হিসেবে যুক্ত করার (Addition of party) আবেদনটি মঞ্জুর করেন। বিচারিক আদালতের এই আদেশের বিরুদ্ধে বাদী হাইকোর্টে রিভিশন দায়ের করেন।
৩. হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও আইনি বিশ্লেষণ
হাইকোর্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে বিচারিক আদালতের সিদ্ধান্ত সঠিক বলে মত দেন এবং আইনি বিষয়গুলো স্পষ্ট করেন:
- সাধারণ আইনি নীতি: হাইকোর্ট জানান, চুক্তি প্রবলের মামলায় সাধারণ আইনি নীতি হলো, কেবল চুক্তির পক্ষরাই মামলার প্রয়োজনীয় পক্ষ। চুক্তির বাইরের কোনো তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি এই ধরনের মামলায় সাধারণত প্রয়োজন হয় না।
- ব্যতিক্রম ও বর্তমান প্রেক্ষাপট: এই মামলার পরিস্থিতি ভিন্ন। একই জমির ওপর আব্দুল মালেকের করা দুটি আলাদা বায়নাপত্রের দাবি উঠেছে (১৯৯৬ এবং ২০১২ সাল)। এছাড়া, আগের একটি রিভিশনে দেখা গেছে এই জমি নিয়ে একাধিক ‘আব্দুল মালেক’-এর অস্তিত্বেরও দাবি রয়েছে।
- বহুবিধ মামলা এড়ানো (Avoid multiplicity of suits): যেহেতু তৃতীয় পক্ষের দাবিটি বাদীর দাবির অনেক আগের (১৯৯৬ সালের) এবং তিনি পাওয়ার অব অ্যাটর্নিমূলে দাবি করছেন, তাই এই বিরোধের চূড়ান্ত ও সুষ্ঠু নিষ্পত্তির জন্য তৃতীয় পক্ষের উপস্থিতি আবশ্যক। অন্যথায় ভবিষ্যতে একই বিষয় নিয়ে আরও অনেক মামলার জন্ম হবে।
৪. হাইকোর্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
হাইকোর্ট বাদীর (আবেদনকারীর) রিভিশন রুলটির ওপর নিচের সিদ্ধান্ত দিয়েছেন:
- আবেদনকারীর রুলটি খারিজ (Discharged) করা হলো।
- ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতের দেওয়া তৃতীয় পক্ষকে বিবাদী হিসেবে যুক্ত করার আদেশটি বহাল (Affirmed) রাখা হলো।
- বিচারিক আদালতকে আগামী ৬ (ছয়) মাসের মধ্যে মূল মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হলো।
মামলার শিরোনাম: আলহাজ্ব মিজানুর রহমান বনাম মো: আব্দুল আলী ও অন্যান্য।
দেওয়ানী রিভিশন নং: ৫৭৭০ / ২০২৪
রায় প্রদানের তারিখ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫
