ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি (Willful Defaulter) চিহ্নিতকরণ ও সিআইবি তালিকাভুক্তিতে নোটিশ ও শুনানির বাধ্যবাধকতা: হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত: ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (Bank Company Act, 1991)-এর সংশোধিত ধারা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি (BRPD) মাস্টার সার্কুলার অনুযায়ী কোনো ঋণগ্রহীতা বা প্রতিষ্ঠানকে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ (Willful Defaulter) হিসেবে চিহ্নিত করে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (CIB)-তে তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতি (Principles of Natural Justice) অলঙ্ঘনীয় শর্ত। ব্যাংক স্বপ্রণোদিতভাবে একতরফা তদন্ত করে গ্রাহককে কারণ দর্শানোর নোটিশ (Show Cause Notice) এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে চূড়ান্ত তালিকাভুক্ত করতে পারে না। ইচ্ছাকৃত খেলাপি চিহ্নিতকরণে আইন ও সার্কুলার নির্দেশিত দ্বি-স্তর বিশিষ্ট কমিটি ও আপিল প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ৩১ ও ৪০-এর সরাসরি লঙ্ঘন।
মামলার বিবরণে জানা যায়, রিট আবেদনকারী ডেল্টা কম্পোজিট মিলস লিমিটেড একটি ১০০% রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা। প্রতিষ্ঠানটি রূপালী ব্যাংক পিএলসি থেকে চলতি মূলধন ও এলসি ঋণ গ্রহণ করে আসছিল। করোনা মহামারী ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে কারখানার রপ্তানি আদেশ ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় তাদের ঋণের কিছু কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতা দেখা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুসারে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের (Rescheduling) আবেদন জানায়।
কিন্তু রূপালী ব্যাংক কোনোপ্রকার পূর্ব নোটিশ বা শুনানির সুযোগ না দিয়েই ডেল্টা কম্পোজিট মিলস এবং এর ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ব্যাংক কোম্পানি আইনের ধারা ২৭ককক এবং বিআরপিডি সার্কুলারের অধীনে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ হিসেবে চিহ্নিত করে সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি ডেটাবেজে তালিকাভুক্ত করে। ফলস্বরূপ পরিচালকদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা, পাসপোর্ট নবায়নে বাধা, ট্রেড লাইসেন্স বাতিল এবং অন্য ব্যাংকে এলসি খোলা স্থগিত হয়ে যায়। সংক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিষ্ঠানটি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে।
👤 রিট আবেদনকারীর আইনি যুক্তি
আবেদনকারীর বিজ্ঞ সিনিয়র অ্যাডভোকেট যুক্তি দেন যে, সাধারণ ঋণখেলাপি এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির মধ্যে মৌলিক আইনি পার্থক্য রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি অনুযায়ী ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঘোষণার জন্য গঠিত বিশেষ ইউনিট কর্তৃক অভিযোগ গঠন, ১৪ দিনের নোটিশ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের আপিল কমিটি দ্বারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিধান বাধ্যতামূলক। রূপালী ব্যাংক কোনো প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় পুরো পদক্ষেপ বাতিলযোগ্য।
👥 ব্যাংকের যুক্তি
ব্যাংকের বিজ্ঞ কৌঁসুলি দাবি করেন যে, অডিট রিপোর্টে অর্থ পাচার ও ফান্ড স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়ায় গ্রাহককে ইচ্ছাকৃত খেলাপি চিহ্নিত করা হয়েছে এবং পাবলিক মানি সুরক্ষার স্বার্থে ব্যাংক দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য ছিল।
হাইকোর্ট বিভাগ বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা সার্কুলারসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে দেখতে পান যে, ইচ্ছাকৃত খেলাপি চিহ্নিতকরণের জন্য প্রত্যেক ব্যাংকে উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নেতৃত্বে একটি ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি সনাক্তকরণ ইউনিট’ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নেতৃত্বে একটি ‘আপিল ইউনিট’ গঠনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ রয়েছে। রূপালী ব্যাংক আবেদনকারীকে কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়নি এবং তাদের জবাব দেওয়ার অধিকার থেকে সরাসরি বঞ্চিত করেছে, যা প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার নামান্তর।
মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপil বিভাগের ঐতিহাসিক নজির 50 DLR (AD) 161 এবং ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের ল্যান্ডমার্ক মামলা State Bank of India vs. Jah Developers (P) Ltd. (2019) 6 SCC 787 বিশ্লেষণ করে অভিমত দেন: “Declaration of a borrower as a willful defaulter visits him with extreme civil and penal consequences, affecting his fundamental right to carry on trade and business under Article 40 of the Constitution. Therefore, the requirement of giving a reasoned show cause notice, providing copies of relevant inspection reports, and affording a personal hearing before final classification are imperative and non-negotiable.”
চূড়ান্ত রায়: রিট পিটিশনটি মঞ্জুর করা হয়। রূপালী ব্যাংক কর্তৃক রিট আবেদনকারীকে ‘ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি’ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রদত্ত আদেশ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি ডেটাবেজে তালিকাভুক্তির কার্যক্রম সম্পূর্ণ বেআইনি ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হয়। আগামী ৭ দিনের মধ্যে সিআইবি থেকে আবেদনকারী কোম্পানির উক্ত ইচ্ছাকৃত খেলাপি স্ট্যাটাস অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে ব্যাংক ইচ্ছা করলে আইন ও সার্কুলারের বিধানাবলি যথাযথভাবে অনুসরণপূর্বক নতুন করে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে।
- স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের অপরিহার্যতা: কাউকে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঘোষণার পূর্বে কারণ দর্শানোর নোটিশ ও পর্যালোচনার সুযোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক।
- মৌলিক অধিকার সুরক্ষা: বাণিজ্যিক সুনাম ও স্বাধীন ব্যবসা পরিচালনার সাংবিধানিক অধিকার (অনুচ্ছেদ ৪০) ক্ষুণ্নকারী যেকোনো পদক্ষেপে যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া মানতে হবে।
- সার্কুলারের বাধ্যবাধকতা: বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি মাস্টার সার্কুলারের প্রতিটি ধাপ ব্যাংকের জন্য বাধ্যতামূলক এবং তা অমান্য করলে গৃহীত ব্যবস্থা বাতিল হবে।
- ইচ্ছাকৃত খেলাপি নোটিশের দ্রুত জবাব: ব্যাংকের সনাক্তকরণ কমিটি থেকে চিঠি পেলে সময় নষ্ট না করে অডিট রিপোর্ট ও প্রমাণ সহকারে নির্ধারিত ১৪ দিনের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিন।
- ব্যবসায়িক মন্দা বনাম ইচ্ছাকৃত আত্মসাৎ: ঋণের অর্থ সঠিক খাতে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং ক্ষতির কারণ বহিরাগত তা দালিলিক রসিদ ও এলসি নথি দিয়ে প্রমাণ করুন।
- আপিল কমিটির শরণাপন্ন হওয়া: প্রাথমিক কমিটি ইচ্ছাকৃত খেলাপি সিদ্ধান্ত নিলে ৩০ দিনের মধ্যে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের আপিল কমিটির নিকট আবেদন করুন।
- রিট পিটিশনের মাধ্যমে প্রতিকার: ব্যাংক প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে একতরফা সিআইবি রিপোর্ট পাঠালে হাইকোর্টে রিট দায়ের করে স্থগিতাদেশ গ্রহণ করুন।
- ব্যাংক কর্মকর্তাদের সতর্কতা: গ্রাহকের ওপর ক্ষোভ বা তড়িঘড়ি করে নোটিশহীনভাবে ইচ্ছাকৃত খেলাপি তালিকাভুক্ত করলে হাইকোর্টে ব্যাংককে ভর্ৎসনা ও জরিমানা হতে পারে।

