৩৭ বছর পর আদালতের আপস ডিক্রিকে জালিয়াতি দাবি তামাদিতে বারিত: হাইকোর্টের নজিরবিহীন রায়
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক গুরুত্বপূর্ণ দেওয়ানী রায়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন যে, দেওয়ানী আদালতের কোনো আপস ডিক্রি (Compromise / Solenama Decree) বা বিচারিক আদেশকে প্রতারণামূলক (Fraudulent) বা জাল দাবি করতে হলে দেওয়ানী কার্যবিধির ৬ আদেশের ৪ বিধি (Order 6 Rule 4 CPC) অনুযায়ী আরজিতে প্রতারণার সুনির্দিষ্ট উপাদান ও বিস্তারিত বিবরণ আবশ্যক। ঢালাওভাবে প্রতারণার অভিযোগ তুলে দীর্ঘ ৩৭ বছর পর সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭-এর ৩৯ ধারা অনুযায়ী রদের প্রার্থনা ছাড়া নিছক স্বত্ব ঘোষণার মামলা দায়ের করা তামাদি আইন ও আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অচল। উপরন্তু কবলা দলিলের মোট জমির একাংশ দাবি করে অবশিষ্ট জমির ব্যাখ্যা না দিলে এবং জমিতে বেদখলের হুমকি থাকা সত্ত্বেও ফলপ্রসূ প্রতিকার (Consequential Relief) হিসেবে দখল সাব্যস্ত বা স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা না চাইলে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারার শর্তানুসারে মামলাটি সরাসরি বাতিলযোগ্য।
আলোচ্য মামলাটির উৎপত্তি যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার এসএ ২০৩ নম্বর দাগের জমি নিয়ে। বাদী শ্রী রতন কুমার বিশ্বাস ও অন্যজন চৌগাছা সহকারী জজ আদালতে ২০১১ সালের ১৮ অক্টোবর স্বত্ব মোকদ্দমা নং ৭৮/২০১১ (Title Suit No. 78 of 2011) দায়ের করেন। পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ২৯ জুন আরজি সংশোধন করে ১৯৭৪ সালের ১২ মার্চ তারিখে একটি অগ্রক্রয় (Pre-emption) মামলায় প্রদত্ত আপস আদেশ বেআইনি ও জালিয়াতি ঘোষণার আর্তি যোগ করেন।
মামলার মূল প্রেক্ষাপট নিম্নরূপ:
- জমির আদি মালিকানা ও ১৯৭৩ সালের কবলা: নালিশি এসএ ২০৩ দাগের মোট জমির আদি মালিক ছিলেন ননীবালা, অন্নপূর্ণা ও স্বর্ণবালা। বাদীপক্ষের দাবি, ১৯৬৪ সালে ননীবালা ও অন্নপূর্ণা তাদের অংশ স্বর্ণবালার নিকট ৮৫ টাকায় মৌখিকভাবে বিক্রি করেন (যেহেতু পণ ১০০ টাকার কম ছিল, সেহেতু তৎকালীন আইনে রেজিস্ট্রেশন আবশ্যক ছিল না)। পরবর্তীতে স্বর্ণবালা ১৯৭৩ সালের ৪ এপ্রিল তারিখে ৩১১৯ নম্বর রেজিস্ট্রিকৃত কবলা মূলে উক্ত ২০৩ দাগ থেকে মোট ৪৯ শতক জমি বর্তমান বাদীদের নিকট বিক্রি করেন।
- ১৯৭৩ সালের অগ্রক্রয় মোকদ্দমা ও ১৯৭৪ সালের সোলেহনামা: উক্ত দলিলের বিরুদ্ধে ননীবালা গং ১৯৭৩ সালের ১৪ নভেম্বর তারিখে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ আইনের ৯৬ ধারায় অগ্রক্রয়ের দাবি তুলে বিবিধ মোকদ্দমা নং ৩৩২/১৯৭৩ (Misc. Case No. 332 of 1973) দায়ের করেন। ১৯৭৪ সালের ১২ মার্চ উক্ত মামলায় উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে একটি আপসনামা (Compromise Petition) দাখিল হয়। আপসনামা অনুসারে বাদীরা আদালতে জমা করা অগ্রক্রয়ের টাকা উত্তোলন করেন এবং তিন মাসের মধ্যে ২৮.৫০ শতক জমি বিবাদীদের অনুকূলে দলিল করে দেওয়ার শর্তে সম্মত হন; ব্যর্থতায় পুরো ৪৯ শতক জমি অগ্রক্রয় সূত্রে বিবাদীদের ওপর বর্তাবে বলে রায় হয়।
- দীর্ঘ ৩৭ বছর পর নতুন স্বত্ব মোকদ্দমা: ১৯৭৪ সালের উক্ত আপস ডিক্রির পর আরএস রেকর্ডে বিবাদী দিলীপ গংদের নাম চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়। দীর্ঘ ৩৭ বছর নিরব থাকার পর ২০১১ সালে এসে বাদীরা দাবি করেন যে উক্ত আপস ডিক্রি ছিল জালিয়াতিপূর্ণ এবং তারা ৪৯ শতকের মধ্যে পশ্চিম পাশের ২০ শতক জমির স্বত্ব দাবি করে মোকদ্দমা করেন, অথচ অবশিষ্ট ২৯ শতক জমি কেন বাদ দেওয়া হলো তার কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
📜 বাদীপক্ষের বক্তব্য ও আইনি দাবি
- ১৯৭৩ সালের রেজিস্ট্রি কবলা ও নিরবচ্ছিন্ন দখল: বাদীরা স্বর্ণবালার নিকট থেকে রেজিস্ট্রি কবলামূলে ৪৯ শতক জমি খরিদ করে ৩৫ বছরের অধিককাল ধরে শান্তিপূর্ণ ভোগদখলে আছেন।
- ১৯৭৪ সালের আপস আদেশ জালিয়াতি: বিবিধ মোকদ্দমা নং ৩৩২/১৯৭৩-এর আপস আদেশটি সম্পূর্ণ জাল ও যোগসাজশী, যা বাদীদের ওপর কোনোভাবেই বাধ্যকর নয়।
- আপসনামার মূল নথি প্রমাণের দায়িত্ব বিবাদীদের: বিবাদীরা আপসনামার মূল নথি তলব করে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় সেই আপসের ওপর নির্ভর করা বেআইনি।
🏛️ বিবাদী দিলীপ গংদের জবাব ও যুক্তি
- আপসের সুবিধা গ্রহণ ও ৩৭ বছরের তামাদি: বাদীরা নিজেরাই ১৯৭৪ সালে আদালতের অগ্রক্রয়ের টাকা তুলে নিয়ে আপসনামায় স্বাক্ষর করেছিলেন। দীর্ঘ ৩৭ বছর পর আপস ডিক্রি চ্যালেঞ্জ করা তামাদি আইনে চরমভাবে বারিত।
- জমির অস্পষ্টতা (Order 7 Rule 3): কবলায় ৪৯ শতক কিন্তু মামলায় ২০ শতক দাবি করা হয়েছে, যার কোনো সুনির্দিষ্ট দাগ-খতিয়ান বা নকশা নেই।
- সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারা বারিত: বিবাদীদের বৈধ দখল ও আরএস রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও বাদীরা দখলের কোনো ফলপ্রসূ প্রতিকার না চেয়ে কেবল স্বত্ব চেয়েছেন, যা বাতিলযোগ্য।
- বিচারিক আদালত (সহকারী জজ আদালত, চৌগাছা – ২০১৭):
২০১৭ সালের ২৭ জুলাই বিজ্ঞ সহকারী জজ আদালত বাদীদের স্বত্ব মোকদ্দমাটি সরাসরি খারিজ করে দেন। আদালত দেখতে পান যে বাদীরা কোনো অবস্থাতেই জমিতে দখল প্রমাণ করতে পারেননি। তাছাড়া আপস ডিক্রির ৩৭ বছর পর মোকদ্দমা তামাদিতে বারিত এবং ৪৯ শতক দলিলের মধ্যে ২০ শতকের অস্পষ্ট দাবি আইনসঙ্গত নয়। - আপিল আদালত (৩য় অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত, যশোর – ২০২৩):
বাদীদের দায়েরকৃত দেওয়ানী আপিল নং ৬৫/২০১৭-এ ২০২৩ সালের ২৪ জুলাই বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত আপিলটি খারিজ করে সহকারী জজের রায় ও ডিক্রি সম্পূর্ণরূপে বহাল রাখেন।
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের বিজ্ঞ বিচারপতি মো: আলী রেজা রিভিশন শুনানিকালে দেওয়ানী আইনের মৌলিক বিধানসমূহ বিশ্লেষণ করে নিম্নোক্ত যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন:
হাইকোর্ট উল্লেখ করেন যে, দেওয়ানী কার্যবিধির ৬ আদেশের ২ বিধি অনুযায়ী প্রত্যেক আরজিতে মূল বিষয়বস্তু থাকতে হয় এবং ৬ আদেশের ৪ বিধি অনুসারে যদি প্রতারণা বা যোগসাজশের অভিযোগ করা হয়, তবে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ আরজিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
- বাদীর আরজিতে কে প্রতারণা করেছে, কখন করেছে, কীভাবে আপসনামা জালিয়াতি হলো— তার কোনো সুনির্দিষ্ট উপাদান নেই। কেবল ঢালাওভাবে ‘প্রতারণামূলক’ বললে কোনো আদালতের চূড়ান্ত ডিক্রি বাতিল করা যায় না।
বিবাদীপক্ষ আদালতের আদেশ ও আপসনামার জাবেদা নকল (Certified Copy – Exhibits Ka, Ga, Ga(1)) দাখিল করেছে। সাক্ষ্য আইনের ১১৪(ই) ধারা অনুসারে আদালতের সকল বিচারিক ও দাপ্তরিক কার্যপদ্ধতি আইনসঙ্গত ও নিয়মিতভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে আদালত অনুমান করবে। এই অনুমানের বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ দেওয়ার দায় বাদীর ওপর ছিল (Sections 101-103 Evidence Act), যা বাদী দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
যেহেতু বাদীরা নিজেরাই ১৯৭৪ সালের আপস মোকদ্দমায় পক্ষভুক্ত ছিলেন, সেহেতু তারা উক্ত আপস আদেশ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত ছিলেন। উক্ত আদেশ বাতিল করতে হলে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩৯ ধারায় ৩ বছরের মধ্যে দলিল/ডিক্রি রদের মামলা করতে হতো। দীর্ঘ ৩৭ বছর পর স্বত্ব মোকদ্দমা এনে আপস ডিক্রিকে পাশ কাটানোর চেষ্টা তামাদি আইনে চরমভাবে বারিত।
হাইকোর্টে বাদীপক্ষ আরজি সংশোধন (Order 6 Rule 17) এবং মামলা রিমান্ডে (Order 41 Rule 23) পাঠানোর আবেদন জানায়। হাইকোর্ট উভয় আবেদন সরাসরি খারিজ করে রায় দেন যে: দুই আদালতে হেরে যাওয়ার পর মামলার মৌলিক ত্রুটি ও প্রমাণের ফাঁকফোকর ঢাকতে রিভিশন পর্যায়ে আরজি সংশোধন বা রিমান্ড চাওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই।
🏆 মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত রায় ও নির্দেশনাবলী
সার্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ, আইন ও নজির পর্যালোচনা শেষে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ নিম্নোক্ত চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন:
- ১. আরজি সংশোধন ও রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর: বাদীপক্ষের দায়েরকৃত আরজি সংশোধন ও রিমান্ডের উভয় আবেদন আইনগত ভিত্তিহীন হওয়ায় সরাসরি খারিজ করা হলো।
- ২. রুল খারিজ (Rule Discharged): দেওয়ানী রিভিশন নং ৫১৫৮/২০২৩-এর রুলটি কোনো খরচ ছাড়াই খারিজ করা হলো।
- ৩. স্থগিতাদেশ ও স্থিতাবস্থা প্রত্যাহার: ইতিপূর্বে হাইকোর্ট কর্তৃক জারিকৃত স্থিতাবস্থার অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হলো।
- ৪. অধস্তন আদালতের রায় বহাল: চৌগাছা সহকারী জজ আদালত ও যশোরের ৩য় অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের মামলা খারিজের অভিন্ন রায় ও ডিক্রি চূড়ান্তভাবে বহাল রাখা হলো।
- আদালতের চূড়ান্ত আদেশের পবিত্রতা: ১৯৭৪ সালের একটি আপস আদেশের সুবিধা গ্রহণ করার পর ৩৭ বছর পর কোনো উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া সেই আপসকে জালিয়াতি বলা বিচার ব্যবস্থার চরম অবমাননা।
- প্লেডিংসের কঠোর নিয়ম: প্রতারণার সুনির্দিষ্ট তারিখ, সময়, ব্যক্তি ও ধরন উল্লেখ ছাড়া আদালত কোনো অভিযোগ আমলে নেবে না।
- ফলপ্রসূ প্রতিকারহীন স্বত্ব মামলা অচল: জমিতে প্রতিপক্ষের স্পষ্ট দখল ও হুমকি থাকলে কেবল স্বত্ব ঘোষণা চেয়ে মামলা করলে তা সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৪২ ধারার শর্তে বাতিল হতে বাধ্য।
আদালতে কোনো আপস সম্পাদন করলে তার শর্তাবলী যথাযথভাবে পালন করুন। শর্তভঙ্গ হলে ডিক্রি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যায়।
যদি কোনো আপস জালিয়াতির মাধ্যমে হয়, তবে জানার ৩ বছরের মধ্যে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ৩৯ ধারায় বাতিল চাইতে হবে; যুগ যুগ পর মামলা করলে তামাদিতে খারিজ হবে।
জমির দখল নিয়ে বিতর্ক বা খতিয়ানে অন্যের নাম থাকলে শুধু ঘোষণার মামলা না করে দখল বহাল বা স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার ফলপ্রসূ প্রতিকার প্রার্থনা করতে হবে।
দলিলের ৪৯ শতকের মধ্যে ২০ শতক দাবি করলে অবশ্যই দাগের বিভাজন, চৌহদ্দি ও নকশা আদালতে দাখিল করতে হবে।
বিচারিক ও আপিল আদালতে হেরে যাওয়ার পর হাইকোর্টে আরজি সংশোধন বা রিমান্ড আবেদন সাধারণত প্রত্যাখ্যাত হয়।

