পৌরসভার প্যানেল চেয়ারম্যানের স্বাক্ষরে আপিল ও পরবর্তী অনুসমর্থন (Ratification): দেওয়ানী কার্যবিধির ৪১ আদেশে হাইকোর্টের রায়
📌 সংক্ষিপ্ত আইনি সারসংক্ষেপ (Legal Summary)
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এক তাৎপর্যপূর্ণ রায়ে ঘোষণা করেছেন যে, দেওয়ানী কার্যবিধির ৪১ আদেশের ১ ও ৩ বিধির (Order XLI Rules 1 & 3 CPC) আওতায় আপিলের স্মারকলিপি (Memorandum of Appeal) দাখিলের প্রাথমিক পর্যায়ে যদি স্বাক্ষর বা ক্ষমতাদানের ক্ষেত্রে কোনো আনুষ্ঠানিক ত্রুটি ঘটে, তবে তা একটি নিরাময়যোগ্য কার্যপ্রণালীগত বিচ্যুতি (Curable procedural irregularity), যা কোনোভাবেই আপিলকে বাতিল বা এখতিয়ারবিহীন করে দেয় না। আদালত সুপ্রতিষ্ঠিত আইনি নীতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে—কার্যপ্রণালী আইন সুবিচারের সেবক, কোনো প্রতিবন্ধক নয় (Procedural law is the handmaid of justice, not to obstruct it)। পৌরসভা বা কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের স্বার্থ রক্ষার্থে যদি নির্বাচিত চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে প্যানেল চেয়ারম্যান বা কমিশনার আপিল দায়ের ও ওকালতনামায় স্বাক্ষর করেন এবং পরবর্তীতে নির্বাচিত মূল চেয়ারম্যান আদালতে হাজির হয়ে উক্ত আপিল দায়েরকে লিখিতভাবে স্বীকার ও অনুসমর্থন (Ratification) করেন, তবে প্রতিনিধিত্বের নীতি অনুযায়ী প্রাথমিক ত্রুটি ভূতাপেক্ষভাবে নিরাময় হয়ে যায়। নিছক কারিগরি বা প্রক্রিয়াগত ত্রুটির কারণে আপিল নাকচ না করে মেধা ও গুণাগুণের ভিত্তিতে বিচার নিষ্পত্তি করাই আইনের সঠিক লক্ষ্য।
১. মামলার পটভূমি ও বিরোধের উৎপত্তি (Background of the Dispute)
আলোচ্য মামলার সূচনা কক্সবাজার জেলার সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে ১৯৯১ সালে দায়েরকৃত অপর মোকদ্দমা নং ১২০/১৯৯১ (Other Suit No. 120 of 1991) থেকে। মোকদ্দমাটি দায়ের করেছিলেন আবদুল খালেক চৌধুরী (দরখাস্তকারী-বাদী) কক্সবাজার পৌরসভাসহ অন্যান্য বিবাদীগণের বিরুদ্ধে নালিশি ভূমিতে স্বত্ব ঘোষণা ও দখল বহালের প্রার্থনায়।
বাদীর দাবি ছিল, বিরোধীয় নালিশি জমিটি মূলত চেনহা সওদাগর (একজন উপজাতীয় ব্যক্তি) নামক ব্যক্তির মালিকানাধীন ছিল, যিনি সেখানে ঘরবাড়ি তৈরি করে একচ্ছত্র ভোগদখলে ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর উক্ত ভূমির মালিকানা তাঁর পুত্র চামং সওদাগরের নিকট বর্তায়। পরবর্তীতে চামং সওদাগর বিগত ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৯০ তারিখে ৬০,০০০/- (ষাট হাজার) টাকা মূল্যে রেজিস্ট্রিকৃত বিক্রয় দলিলের মাধ্যমে জমিটি বাদীর নিকট বিক্রয় করে দখল হস্তান্তর করেন। কিন্তু পরবর্তীকালে এম.আর.আর এবং বি.এস জরিপকালে ভুলবশত নালিশি ভূমির অংশবিশেষ ৫৬১ দাগের পরিবর্তে ২৪৪৬ দাগে কক্সবাজার পৌরসভার নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। উক্ত ভুল রেকর্ডের সুযোগ নিয়ে পৌর কর্তৃপক্ষ সম্পত্তিতে বেআইনি দাবি তোলায় বাদী স্বত্বের মামলা করতে বাধ্য হন।
সিনিয়র সহকারী জজ আদালত বিচার শেষে বাদীর দাখিলকৃত দলিলাদির ভিত্তিতে মামলাটি প্রতিদ্বন্দ্বী বিবাদী কক্সবাজার পৌরসভার বিরুদ্ধে দোতরফাসূত্রে ডিক্রি প্রদান করেন। উক্ত রায়ে ক্ষুব্ধ হয়ে কক্সবাজার পৌরসভার পক্ষে সিরাজুল হক নামক এক ব্যক্তি চেয়ারম্যান পদবি ব্যবহার করে জেলা জজ আদালত, কক্সবাজারে অপর আপিল নং ০২/১৯৯৮ (Other Appeal No. 2 of 1998) দায়ের করেন, যা পরবর্তীতে ১ম অধস্তন জজ (বর্তমানে যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালত) আদালতে শুনানির জন্য বদলি হয়।
২. পক্ষগণের বিপরীতমুখী দাবি ও প্রতিদ্বন্দ্বী বক্তব্য (Pleadings of the Parties)
আপিল আদালতে বাদী/রেসপনডেন্ট দেওয়ানী কার্যবিধির ৪১ আদেশের ৩(১) বিধি মোতাবেক আপিলের মেমোরেন্ডাম সরাসরি খারিজ বা বাতিলের জন্য একটি দরখাস্ত দাখিল করেন। উক্ত দরখাস্তকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষ তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী আইনি অবস্থান গ্রহণ করেন।
🏛️ দরখাস্তকারী-বাদীর বক্তব্য ও আইনি আপত্তি
- অননুমোদিত ব্যক্তির স্বাক্ষর: আপিলের মেমোরেন্ডাম ও ওকালতনামায় স্বাক্ষরকারী সিরাজুল হক কখনোই কক্সবাজার পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন না।
- আসল মেয়রের ক্ষমতার অভাব: তৎকালীন বৈধ নির্বাচিত চেয়ারম্যান জনাব নুরুল আবছার আপিল দায়ের করেননি বা কোনো ওকালতনামা সম্পাদন করেননি।
- ৪১ আদেশের ১ ও ৩ বিধির লঙ্ঘন: যথাযথ ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা আইনজীবী ব্যতীত আপিল পেশ করা হলে ৪১ আদেশের ৩(১) বিধিমতে মেমোটি বাতিলযোগ্য।
- আইনি নজির (AIR 1920 Pat 581): পাটনা হাইকোর্টের নজির মতে ওকালতনামা ছাড়া বা ক্ষমতাহীন ব্যক্তির আপিল পেশ আইনত অবৈধ ও এখতিয়ারবিহীন।
- বেআইনি আপিল বাতিল: ক্ষমতাহীন ব্যক্তির দায়েরকৃত আপিল কার্যধারা অব্যাহত রাখা দেওয়ানী বিচার প্রক্রিয়ার গুরুতর লঙ্ঘন বিধায় তা সরাসরি অগ্রাহ্য করা আবশ্যক।
🛡️ পৌরসভা-আপিলকারীর লিখিত জবাব ও প্রতিরক্ষা যুক্তি
- প্যানেল চেয়ারম্যানের সরল বিশ্বাস: সিরাজুল হক ছিলেন নির্বাচিত ওয়ার্ড কমিশনার ও তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্যানেল চেয়ারম্যান; সরল বিশ্বাসে ‘ভারপ্রাপ্ত’ কথাটি লিখতে বাদ পড়েছিল।
- পৌরসভার সরকারি স্বার্থ রক্ষা: সরকারি সম্পত্তি ও জনগণের তহবিল রক্ষার্থেই জরুরি ভিত্তিতে আপিল দায়ের ও প্যানেল আইনজীবী নিযুক্ত করা হয়েছিল।
- নির্বাচিত মেয়রের পূর্ণ অনুসমর্থন: মূল চেয়ারম্যান জনাব নুরুল আবছার পরবর্তীতে লিখিত আপত্তি দাখিল করে প্যানেল চেয়ারম্যানের সকল কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন ও অনুমোদন করেছেন।
- নিরাময়যোগ্য ত্রুটি: ওকালতনামার পদবি সংক্রান্ত ভুল একটি নিরাময়যোগ্য অসাবধানতা (Curable bona fide mistake), যা পরবর্তী অনুমোদনে সম্পূর্ণরূপে বৈধতা পেয়েছে।
- স্বার্থবান পক্ষের অধিকার: ৫৪ ডিএলআর ৪৯৪ নজির অনুযায়ী সংক্ষুব্ধ যেকোনো কর্তৃপক্ষ বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থে আপিল চালু রাখার অধিকারী।
৩. আপিল আদালতের কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত (Appellate Court Proceedings)
১ম সাবঅর্ডিনেট জজ (যুগ্ম জেলা জজ), কক্সবাজার উভয় পক্ষের বক্তব্য ও পৌর কর্তৃপক্ষের নথিপত্র পর্যালোচনা করেন। কক্সবাজার পৌরসভার তৎকালীন নির্বাচিত চেয়ারম্যান জনাব নুরুল আবছার আদালতে দাখিলকৃত লিখিত আপত্তির ১১ ও ১২ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে—”কক্সবাজার পৌরসভার পক্ষ হইতে অত্র আপিল মামলাটি তাহাদের নিযুক্তীয় আইনজীবী কর্তৃক দায়ের করা হইয়াছে। ফলে প্যানেল চেয়ারম্যান সিরাজুল হক কর্তৃক অত্র আপিল মোকদ্দমাটি দায়ের করার জন্য ওকালতনামায় স্বাক্ষর করার সময় ‘প্যানেল’ কথাটি বা ‘পক্ষে’ কথাটি লিপিবদ্ধ না করা একটি সরল বিশ্বাসমূলক ভুল (Bona fide mistake)।”
বিজ্ঞ অধস্তন জজ বিগত ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০০১ তারিখে ৩০ নম্বর আদেশে বাদীর আবেদনটি খারিজ করে দেন। আদালত অভিমত দেন যে, সিরাজুল হক কোনো ভুয়া বা অস্তিত্বহীন ব্যক্তি নন, তিনি তৎকালীন প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরবর্তীতে নির্বাচিত চেয়ারম্যান স্বয়ং এসে উক্ত আপিল কার্যধারা গ্রহণ ও অনুমোদন করেছেন। সুতরাং কারিগরি কারণে আপিল বাতিল করা যাবে না। উক্ত আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে আবদুল খালেক চৌধুরী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে সিভিল রিভিশন মোকদ্দমা নং ২৭১২/২০০১ দায়ের করেন এবং আপিল কার্যধারার ওপর স্থগিতাদেশ লাভ করেন।
৪. মহামান্য হাইকোর্টে পর্যালোচিত আইনি প্রশ্নসমূহ (Framed Legal Issues)
মাননীয় একক বেঞ্চের শুনানিতে নিম্নোক্ত তাৎপর্যপূর্ণ আইনি প্রশ্নসমূহের ওপর চূড়ান্ত শুনানি গ্রহণ করা হয়:
- আপিল মেমোরেন্ডামের স্বাক্ষর ত্রুটির পরিণতি: দেওয়ানী কার্যবিধির ৪১ আদেশের ১ বিধি অনুযায়ী আপিল মেমোতে কোনো সংবিধিবদ্ধ সংস্থার ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধির স্বাক্ষরে পদবিগত ভুল থাকলে ৪১ আদেশের ৩ বিধির আওতায় মেমোটি সরাসরি বাতিলযোগ্য, নাকি তা সংশোধনযোগ্য নিরাময়যোগ্য ত্রুটি?
- পরবর্তী অনুসমর্থনের আইনি প্রভাব (Doctrine of Ratification): কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকর্তার প্রাথমিক অননুমোদিত বা ভুল পদবির কার্যক্রমকে পরবর্তীকালে মূল ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রধান কর্মকর্তা লিখিতভাবে গ্রহণ ও অনুমোদন (Ratify) করলে তা আইনের দৃষ্টিতে মূল ক্ষমতা হিসেবে কার্যকর হয় কি না?
- কার্যপ্রণালী আইনের সীমা ও অন্তর্নিহিত ক্ষমতা: দেওয়ানী কার্যবিধির ১৫১ ধারার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা প্রয়োগ করে নিছক আনুষ্ঠানিক ভুলের কারণে জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো সরকারি বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আপিল নাকচ না করে গুণাগুণের ভিত্তিতে বিচার করার সিদ্ধান্ত আইনসংগত কি না?
৫. আদালতে বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দের যুক্তিতর্ক (Submissions & Citations)
দরখাস্তকারী পক্ষে বিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জনাব এ.কে.এম রাশেদুল হক (Mr. A.K.M. Rashedul Huq) এবং জনাব মো: কামাল পারভেজ নিবেদন করেন যে, দেওয়ানী কার্যবিধির ৪১ আদেশের ১ বিধির বিধান অত্যন্ত স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক। আপিল অবশ্যই আপিলকারী বা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত কৌঁসুলি কর্তৃক স্বাক্ষরিত ও উপস্থাপিত হতে হবে। যদি তা যথাযথভাবে না হয়, তবে ৪১ আদেশের ৩(১) বিধি অনুযায়ী আদালত তা হয় নাকচ করবে অথবা ফেরত দেবে। এখানে ক্ষমতাহীন ব্যক্তি সিরাজুল হক নিজেকে চেয়ারম্যান দাবি করে স্বাক্ষর করেছেন, অথচ তিনি চেয়ারম্যান ছিলেন না। বিজ্ঞ আইনজীবী Sheikh Palat Vs. Sarwan Sahu (AIR 1920 Patna 581) নজিরের ওপর নির্ভর করে বলেন যে, বৈধ ওকালতনামা বা ক্ষমতা ছাড়া আপিল দাখিল করা হলে তা সম্পূর্ণ অবৈধ ও বাতিল এবং আদালত তাতে কোনো এখতিয়ার অর্জন করে না।
বিপরীতে রাষ্ট্রপক্ষে বিজ্ঞ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জনাব মো: জহিরুল ইসলাম (Mr. Md. Zahirul Islam) এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল জনাব মো: ফেরদৌস সরকার যুক্তি দেখান যে, সিরাজুল হক কোনো বহিরাগত বা পরিচয়হীন ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি ছিলেন নির্বাচিত কমিশনার ও প্যানেল চেয়ারম্যান। পৌরসভার মূল্যবান জমি যখন বেসরকারি ব্যক্তির অনুকূলে ডিক্রি হয়, তখন জনগণের স্বার্থ রক্ষার মহৎ উদ্দেশ্যে তিনি প্যানেল আইনজীবীকে ক্ষমতা দিয়ে আপিলটি দাখিল করেছিলেন। পরবর্তীতে নির্বাচিত মূল চেয়ারম্যান আদালতে লিখিত আবেদন দিয়ে সেই আপিল গ্রহণ করেছেন এবং নিজস্ব প্যানেল আইনজীবী দিয়ে মোকদ্দমা পরিচালনার ব্যবস্থা করেছেন।
বিজ্ঞ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ঐতিহাসিক নজির Md. Delwar Hossain Vs. Government of the People’s Republic of Bangladesh (54 DLR 494) উল্লেখ করে বলেন, আপিলের অধিকার কেবল মূল মামলার আনুষ্ঠানিক পক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; যে কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ যার প্রত্যক্ষ আইনি স্বার্থ রয়েছে, তিনি আপিল বজায় রাখতে পারেন। এছাড়া পাটনা হাইকোর্টের ১৯২০ সালের নজিরটি এখানে অপ্রযোজ্য, কারণ সেখানে ওকালতনামাই ছিল না, অথচ বর্তমান মামলায় বৈধ ওকালতনামায় কেবল পদবির ভুল ছিল যা পরবর্তী অনুসমর্থনে সম্পূর্ণ নিরাময় হয়েছে।
৬. সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যবেক্ষণ ও আইনি অনুসিদ্ধান্ত (Judicial Analysis & Precedents)
মাননীয় বিচারপতি আবদুর রহমান মামলার নথিপত্র এবং দেওয়ানী কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট বিধানাবলি বিস্তারিত পর্যালোচনা করে সুদূরপ্রসারী আইনগত সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ করেন:
(ক) কার্যপ্রণালী আইন সুবিচারের সেবক, বাধা নয় (Handmaid of Justice):
আদালত দ্ব্যর্থহীনভাবে অভিমত ব্যক্ত করেন যে, কার্যপ্রণালীগত নিয়মকানুন তৈরি করা হয়েছে ন্যায়বিচার প্রশাসনকে সহজতর করার জন্য, কোনো অবস্থাতেই সুবিচারকে রুদ্ধ বা ধ্বংস করার জন্য নয়। যে পর্যন্ত কোনো কার্যপ্রণালীগত ত্রুটি আদালতের মৌলিক এখতিয়ারের মূলে আঘাত না হানে বা প্রতিপক্ষের অপূরণীয় ক্ষতি না করে, সে পর্যন্ত আদালত কারিগরি অজুহাতে মামলা শেষ না করে ত্রুটি সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নেবে।
(খ) পরবর্তী অনুসমর্থনের বৈধতা (Doctrine of Subsequent Ratification):
নথিতে প্রমাণিত যে আপিলের ওকালতনামায় স্বাক্ষরকারী সিরাজুল হক তৎকালীন সময়ে পৌরসভার প্যানেল চেয়ারম্যান ছিলেন। পরবর্তীতে মূল নির্বাচিত চেয়ারম্যান জনাব নুরুল আবছার আপিল আদালতে স্বয়ং উপস্থিত হয়ে ও লিখিত আপত্তি দিয়ে উক্ত আপিল গ্রহণ ও সমর্থন করেছেন। আইনশাস্ত্রের প্রাচীন অনুসমর্থন নীতি অনুযায়ী—অননুমোদিত কোনো প্রতিনিধির কাজকে মূল কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে অনুমোদন করলে তা গোড়া থেকেই বৈধ আদেশ হিসেবে গণ্য হয় (Omnis ratihabitio retrotrahitur et mandato priori aequiparatur)। দেওয়ানী কার্যবিধির ১৫১ ধারার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিজ্ঞ অধস্তন আদালত এই সংশোধন ও ধারাবাহিকতা গ্রহণ করে সম্পূর্ণ সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
(গ) পাটনা নজিরের পৃথকীকরণ (Distinguishing AIR 1920 Pat 581):
দরখাস্তকারী পক্ষের উদ্ধৃত পাটনা নজিরটি বর্তমান মামলার ঘটনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পাটনা মামলায় আইনজীবী কোনো ওকালতনামা ছাড়াই আপিল দাখিল করেছিলেন, যা ছিল স্পষ্ট এখতিয়ারহীনতা। কিন্তু বর্তমান মোকদ্দমায় যথাযথ ওকালতনামা ছিল এবং আপিলটি পৌরসভার নিযুক্ত প্যানেল আইনজীবী কামরুল হাসান আদালতে উপস্থাপন করেছিলেন। বিরোধটি কেবল ওকালতনামায় স্বাক্ষরকারী প্রতিনিধির পদবি নিয়ে ছিল, যা কোনো মৌলিক এখতিয়ারগত শূন্যতা নয় বরং একটি নিরাময়যোগ্য অসাবধানতা মাত্র।
৭. হাইকোর্টের চূড়ান্ত রায় ও দিকনির্দেশনা (Final Decision & Directions)
মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সার্বিক পর্যালোচনায় অধস্তন আপিল আদালতের ৩০ নম্বর আদেশে কোনো আইনগত ভুল, অনিয়ম বা এখতিয়ারগত ত্রুটি খুঁজে পাননি।
- রিভিশন রুল খারিজ: দেওয়ানী রিভিশন রুল নং ২৭১২/২০০১-এর কোনো সারবত্তা না থাকায় তা সরাসরি খারিজ (Discharged) করা হলো।
- স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার: এই আদালত কর্তৃক পূর্বে প্রদত্ত আপিল কার্যধারার স্থগিতাদেশ অবিলম্বে প্রত্যাহার ও বাতিল করা হলো।
- আপিল আদালতের আদেশ বহাল: কক্সবাজারের সাবঅর্ডিনেট জজ ১ম আদালত কর্তৃক অপর আপিল নং ০২/১৯৯৮-এ বিগত ০৬.০২.২০০১ তারিখে প্রদত্ত ৩০ নম্বর আদেশ বহাল রাখা হলো।
- মেধার ভিত্তিতে দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ: যেহেতু আপিলটি অত্যন্ত প্রাচীন (১৯৯৮ সালের), সেহেতু সংশ্লিষ্ট আপিল আদালতকে উভয় পক্ষকে শুনানির পূর্ণ সুযোগ প্রদান করে অবিলম্বে মেধা ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মূল আপিলটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হলো।
- নথি অবিলম্বে প্রেরণের নির্দেশ: অধস্তন আদালতের নথি (Subordinate Courts Record) অনতিবিলম্বে সংশ্লিষ্ট আদালতে ফেরত পাঠানোর আদেশ দেওয়া হলো; কোনো পক্ষের ওপর খরচের আদেশ দেওয়া হয়নি।
৮. মামলার রেফারেন্স ও বিচারিক তথ্যাদি (Case Summary Table)
আইনি গবেষক ও বিজ্ঞ আইনজীবীদের সুবিধার্থে এই ঐতিহাসিক রায়ের সমস্ত প্রশাসনিক ও বিচারিক রেফারেন্স নিচে সন্নিবেশিত করা হলো:
| বিষয়বস্তু | মামলার বিস্তারিত তথ্য |
|---|---|
| উচ্চ আদালত ও বেঞ্চ | বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগ (দেওয়ানী রিভিশন এখতিয়ার) মাননীয় বিচারপতি আবদুর রহমান (Mr. Justice Abdur Rahman) |
| মামলা নম্বর ও শ্রেণি | দেওয়ানী রিভিশন মোকদ্দমা নং ২৭১২ / ২০০১ (Civil Revision Case No. 2712 of 2001) |
| পক্ষগণের নাম | আবদুল খালেক চৌধুরী (দরখাস্তকারী/বাদী) বনাম কক্সবাজার পৌরসভা, পক্ষে চেয়ারম্যান এবং অন্যান্য (প্রতিপক্ষ/বিবাদী) |
| বিজ্ঞ আইনজীবীবৃন্দ | দরখাস্তকারী পক্ষে: জনাব এ.কে.এম রাশেদুল হক এবং জনাব মো: কামাল পারভেজ, অ্যাডভোকেট প্রতিপক্ষ পক্ষে: জনাব মো: জহিরুল ইসলাম, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং জনাব মো: ফেরদৌস সরকার, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল |
| উৎস ও বিচারিক আদালত | ১ম সাবঅর্ডিনেট জজ আদালত (যুগ্ম জেলা জজ), কক্সবাজার (অপর আপিল নং ০২/১৯৯৮, আদেশ নং ৩০ তারিখ: ০৬.০২.২০০১) সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, কক্সবাজার (অপর মোকদ্দমা নং ১২০/১৯৯১) |
| শুনানি ও রায় ঘোষণার তারিখ | শুনানি: ১৬ ও ১৭ জুন ২০২৬ চূড়ান্ত রায়: ১৮ জুন ২০২৬ (৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ) |
| মূল আইনি আলোচ্য ধারা ও নজির | Code of Civil Procedure, 1908 (Order XLI Rules 1 & 3, Section 151, Section 115(1)) নজির: 54 DLR 494 (Md. Delwar Hossain Vs. Bangladesh), AIR 1920 Pat 581 (Distinguished) |
| অফিসিয়াল রায় ও পোর্টাল লিংক |
📥 অফিসিয়াল জাজমেন্ট PDF ডাউনলোড 🌐 সুপ্রিম কোর্ট পোর্টাল |

