রপ্তানি খাতের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি (Back-to-Back L/C) ফোর্সড লোনে রূপান্তর করে ব্যাংকের একতরফা চক্রবৃদ্ধি সুদ আরোপ ও অর্থ ঋণ মামলা স্থগিত: হাইকোর্টের রায়
⚖️ মামলার সারসংক্ষেপ ও চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ল্যান্ডমার্ক রায়: শতভাগ রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পের অনুকূলে খোলা মাস্টার এলসির বিপরীতে ইস্যুকৃত ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র (Back-to-Back Letter of Credit)-এর অর্থ বিদেশি ক্রেতা বা সংশ্লিষ্ট এলসি ওপেনিং ব্যাংক কর্তৃক পরিশোধে বিলম্ব বা ব্যর্থতা ঘটলে তা স্থানীয় রপ্তানিকারক গ্রাহকের ব্যক্তিগত খেলাপ বা দোষ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা এবং ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগ (BRPD) কর্তৃক জারিকৃত সার্কুলার লঙ্ঘন করে রপ্তানিকারকের অগোচরে উক্ত দায়কে একতরফাভাবে ‘ফোর্সড লোন’ (Forced Loan / PAD / LTR) এ রূপান্তর করে বাণিজ্যিক হারে চক্রবৃদ্ধি ও পেনাল সুদ আরোপ করা আইনত অবৈধ। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক ঋণপত্রের ইউনিফর্ম কাস্টমস অ্যান্ড প্র্যাকটিস (UCP 600) অনুযায়ী বিদেশি ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধারে পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ ঋণ আদালতে মামলা দায়ের এবং ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। হাইকোর্ট অর্থ ঋণ আদালতের মামলা কার্যক্রম স্থগিত করে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিস্তারিত নিরীক্ষার নির্দেশ প্রদান করেন।
মামলার বিবরণে প্রকাশ, গাজীপুরের কোনাবাড়িস্থ শতভাগ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা মেসার্স মেঘনা গার্মেন্টস লিমিটেড ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত একটি খ্যাতনামা ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ৫০ লাখ মার্কিন ডলারের তৈরি পোশাকের রপ্তানি আদেশ লাভ করে। উক্ত রপ্তানি আদেশের অনুকূলে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি, প্রিন্সিপাল শাখার মাধ্যমে সুতা ও কাপড় আমদানির জন্য ১৫ কোটি টাকা সমমূল্যের ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলা হয়।
মেঘনা গার্মেন্টস যথাসময়ে পণ্য উৎপাদন সম্পন্ন করে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে জাহাজী দলিল (Shipping Documents) প্রেরণ করে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং বিদেশি বায়ার ব্যাংকের দেউলিয়া হওয়ার অজুহাতে এলসির প্রসিড প্রত্যাবাসনে অস্বাভাবিক বিলম্ব ঘটে। ইস্টার্ন ব্যাংক বিদেশি ব্যাংকের বিরুদ্ধে UCP 600 ও আইসিসি বিধিমালার আওতায় কোনো দাবি উত্থাপন না করে মেঘনা গার্মেন্টসের রপ্তানি বিলের দায়কে সরাসরি একটি অননুমোদিত ‘ফোর্সড লোন’-এ রূপান্তর করে।
অতঃপর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সাধারণ বাণিজ্যিক সুদের চেয়েও দ্বিগুণ হারে চক্রবৃদ্ধি সুদ ও দণ্ড সুদ চাপিয়ে উক্ত ১৫ কোটি টাকার দায়কে মাত্র আড়াই বছরে ৩৫ কোটি টাকায় উন্নীত করে। এরপর ব্যাংক ঢাকার অর্থ ঋণ আদালত নং ২-এ মেঘনা গার্মেন্টস ও তার পরিচালকদের বিরুদ্ধে ৩৫ কোটি টাকা আদায়ের মামলা দায়ের করে এবং তাদের রপ্তানি একাউন্ট ব্লক করে দেয়। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা প্রদান অসম্ভব হয়ে পড়লে সংক্ষুব্ধ প্রতিষ্ঠান মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে এই রিট পিটিশন দায়ের করে।
👤 রিটকারী রপ্তানিকারকের আইনি যুক্তি
- ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি হলো মাস্টার এলসির অধীন একটি শর্তাধীন ব্যবস্থা; বিদেশি ক্রেতার ব্যর্থতার দায় সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় রপ্তানিকারকের ওপর চাপানো যায় না।
- বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী ফোর্সড লোনে একতরফা চক্রবৃদ্ধি সুদ আরোপ করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও দণ্ডনীয়।
- ব্যাংক UCP 600 অনুযায়ী আন্তর্জাতিক আদালতে বায়ার ব্যাংকের বিরুদ্ধে দাবি না করে স্থানীয় রপ্তানিকারককে বলিদান করেছে।
- হিসাব অবরুদ্ধ করার ফলে হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের খাত হুমকির মুখে পড়েছে।
👥 ঋণদাতা ইস্টার্ন ব্যাংকের যুক্তি
- গ্রাহকের আবেদনের প্রেক্ষিতেই ব্যাংক ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে বিদেশি সরবরাহকারীকে পেমেন্ট পরিশোধ করেছে।
- রপ্তানি মূল্য নির্ধারিত সময়ে দেশে না আসায় ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল আটকে গেছে, যা সমন্বয় করতে ফোর্সড লোন সৃষ্টি করা প্রচলিত ব্যাংকিং প্র্যাকটিস।
- অর্থ ঋণ আদালতে বিচারাধীন মামলায় আইনগত বিষয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ প্রয়োজন, যা রিট আদালতে নিষ্পত্তিযোগ্য নয়।
- ব্যাংকের পাওনা অর্থ আদায়ে মামলা করার সাংবিধানিক অধিকার বিদ্যমান।
মহামান্য হাইকোর্টের সামনে আইনি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়: বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কি বাংলাদেশ ব্যাংকের বাধ্যতামূলক প্রজ্ঞাপন উপেক্ষা করে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির দেনাকে ফোর্সড লোনে রূপান্তর করে অন্যায্য চক্রবৃদ্ধি সুদ আরোপ করতে পারে? এর ফলে একটি জাতীয় স্বার্থবাহী রপ্তানি শিল্পকে পঙ্গু করে মামলা পরিচালনা আইনসংগত কি না?
বাংলাদেশ ব্যাংক আদালতে অভিমত প্রদান করে যে ফোর্সড লোনের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর একতরফা সুদ আরোপ সার্কুলারের বরখেলাপ এবং কোনো অবস্থাতেই মূলধনের চেয়ে অতিরিক্ত অন্যায্য সুদ দাবি করা যাবে না।
মহামান্য বিচারপতি জে. বি. এম. হাসান ও বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রখ্যাত সিদ্ধান্ত Bangladesh Bank v. M/S. Eastern Hardwares Ltd. (55 DLR (AD) 35) এবং 59 DLR 512 উদ্ধৃত করেন। হাইকোর্ট দ্ব্যর্থহীনভাবে নীতি নির্ধারণ করেন:
হাইকোর্ট আরও উল্লেখ করেন যে দেশের রপ্তানি অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং শ্রমিকদের জীবিকা সুরক্ষায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে মুনাফালোভী মানসিকতা পরিহার করে আইনি সুরক্ষার মধ্যে কাজ করতে হবে।
চূড়ান্ত রায়: মহামান্য হাইকোর্ট রিট পিটিশনটি সরাসরি মঞ্জুর (Rule Absolute) ঘোষণা করেন। ইস্টার্ন ব্যাংক কর্তৃক রিটকারী মেঘনা গার্মেন্টসের ওপর আরোপিত সকল প্রকার অবৈধ চক্রবৃদ্ধি ও পেনাল সুদ বাতিল ঘোষণা করা হলো। ঢাকার অর্থ ঋণ আদালত নং ২-এ বিচারাধীন অর্থ ঋণ মামলা নং ১২৮/২০২৩ এর সকল কার্যক্রম আগামী এক বছরের জন্য স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটিকে আগামী ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে উক্ত ফোর্সড লোনের প্রকৃত হিসাব ও ইউসিপি ৬০০ অনুযায়ী বিদেশি ক্রেতার দায় নির্ধারণ করে একটি অডিট রিপোর্ট দাখিলের নির্দেশ প্রদান করা হলো। মেঘনা গার্মেন্টসের অবরুদ্ধ ব্যাংক হিসাবগুলো কারখানা পরিচালনা ও শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের স্বার্থে অবিলম্বে চালু করার নির্দেশ দেওয়া হলো।
- একতরফা ফোর্সড লোন অবৈধ: রপ্তানি বিলের বিপরীতে গ্রাহকের সম্মতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া ফোর্সড লোন সৃষ্টি বেআইনি।
- চক্রবৃদ্ধি সুদ নিষিদ্ধ: রপ্তানি খাতের বিরোধপূর্ণ এলসিতে অতিরিক্ত ও দণ্ড সুদ আরোপ আইনের সরাসরি লঙ্ঘন।
- ইউসিপি ৬০০ এর বাধ্যবাধকতা: ব্যাংককে অবশ্যই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিধি অনুযায়ী বিদেশি বায়ার ব্যাংকের বিরুদ্ধে সক্রিয় হতে হবে।
- শিল্প সুরক্ষা: কারখানা বন্ধ বা হাজারো শ্রমিকের চাকরি ঝুঁকিতে ফেলে ব্যাংক হিসাব একতরফা ব্লক করা যাবে না।
- জাহাজীকরণের প্রমাণাদি সংরক্ষণ: বিল অব লেডিং (B/L), ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট ও ব্যাংক জমা রসিদের পূর্ণাঙ্গ কপি ডিজিটাল ও ফিজিক্যাল ফাইলে রাখুন।
- ফোর্সড লোনের নোটিশ পাওয়া মাত্র প্রতিবাদ: ব্যাংক হিসাব বিবরণীতে ফোর্সড লোন বা পিএডি দেখা মাত্রই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলার উল্লেখ করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ পাঠান।
- বাংলাদেশ ব্যাংকে অভিযোগ দায়ের: বাণিজ্যিক ব্যাংক অন্যায্য সুদ যোগ করলে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন বিভাগে দ্রুত আবেদন করুন।
- অর্থ ঋণ মামলার আগেই রিট প্রতিকার: হিসাব ব্লক বা মামলা দায়েরের উপক্রম হলে হাইকোর্টে জরুরি রিট পিটিশন দাখিল করে হিসাব চালু রাখুন।
- আইনজীবীদের জন্য কৌশল: আপিল বিভাগের ৫৫ ডিএলআর (এডি) ৩৫ ও ইউসিপি ৬০০ এর ধারা ১৪/১৫ উদ্ধৃত করে ব্যাংকের একতরফা দায় সৃষ্টির ভিত্তি ভেঙে দিন।
